মে মাসের শেষের দিকে, অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে দেশে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে, যার মূল চালিকা শক্তি ভারতীয় ডেলটা ভেরিয়েন্ট। ভারতীয় অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট, ডেলটা ভেরিয়েন্ট অনেক বেশি সংক্রামক এবং এর দ্বারা মৃত্যুর হারও অপেক্ষাকৃত বেশি, যা ইতিমধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
গত ৮ মে বাংলাদেশে ডেলটা ভেরিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হলেও ইতিমধ্যেই এর ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ ঘটে গেছে। প্রথমে ভারতীয় সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় ধরা পড়লেও বর্তমানে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আইসিডিডিআরবির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ৬৮ শতাংশ ডেলটা ভেরিয়েন্ট দ্বারা সংক্রমিত। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা থেকে ৮০ শতাংশ ভাইরাস ডেলটা ভেরিয়েন্ট বলে চিহ্নিত হয়েছে (প্রথম আলো, ১৮ জুন ২০২১)। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের বর্তমান উৎসস্থল গ্রাম, অতীতের মতো মহানগর নয়। এটি এখন সুস্পষ্ট, বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ ঝুঁকির সম্মুখীন, যা থেকে উত্তরণের জন্য অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর গত ১৫ মাসে আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। গত বছরের শুরুতে চীনের উহান শহরে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের বিস্তার ঘটতে দেখে অনেকেরই মনে হয়েছে, উহান বাংলাদেশে থেকে বহুদূরে এবং আমাদের দেশে এমন ঘটবে না। অর্থাৎ আমরা ভয়াবহ এ ভাইরাসের ঝুঁকিকে প্রথমে অনেকটা উপেক্ষা করেছি। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা যখন বাংলাদেশে শুরু হয়, তখন আমরা সারা দেশে একধরনের আতঙ্ক লক্ষ করেছি। করোনায় আক্রান্ত মাকে জঙ্গলে ফেলে ভয়ে তখন সন্তানকে পালাতে দেখেছি। দেখেছি ভর্তির জন্য হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে গিয়ে কিংবা ভেন্টিলেটরের অভাবে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটতে।
করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় এর যথাযথ চিকিৎসা, এর জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল বেড, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং টিকার জোগান, অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল সলিউশন ও বিরাট পরিমাণের অর্থ ব্যয়।
এরপর এ বছরের প্রথমে দিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে আবারও আমরা হাসপাতালে বেডের, বিশেষত আইসিইউ বেডের এবং নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের অভাব নিয়ে ব্যাপক উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হতে দেখেছি। এ সময় এমনকি সারাহ বেগম কবরীর মতো একজন সেলিব্রেটির জন্য আইসিইউ বেড জোগাড় করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে আপাততদৃষ্টে মনে হয়েছে, করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় এর যথাযথ চিকিৎসা, এর জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল বেড, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং টিকার জোগান, অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল সলিউশন ও বিরাট পরিমাণের অর্থ ব্যয়।
কিন্তু গত ১৫ মাসের অভিজ্ঞতার আলোকে একটু গভীরভাবে ভাবলে এটি সুস্পষ্ট হবে, করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করার জন্য শুধু চিকিৎসা ও অর্থ ব্যয়ই সঠিক সমাধান নয়। এমনকি বিত্তশালী দেশের, যাদের রয়েছে উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো এবং অনেক অর্থবিত্ত, তাদের জন্যও এটি যথার্থ নয়। উদাহরণস্বরূপ, সর্বাধিক সম্পদশালী ও অতি উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও করোনাভাইরাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক নাকানিচুবানি খাইয়েছে এবং ছয় লক্ষাধিক মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি ঘটিয়েছে। অঢেল অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও অনেক পশ্চিমা দেশ দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর টিকা আবিষ্কারে সফল হয়নি।
গত ১৫ মাসের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা হলো, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অবশ্যই ‘মিটিগেশন’ কার্যক্রম তথা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে, যদিও এখন পর্যন্ত এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত চিকিৎসা নেই। বিজ্ঞানীরা এখনো এ নিয়ে গবেষণা করছেন এবং শিখছেন। টিকা আবিষ্কারের জন্য বিত্তশালী দেশগুলোর বিনিয়োগও আবশ্যক। এ ছাড়া করোনাভাইরাস সহজে যাবে বলে মনে হয় না। তাই আমাদের করোনাসহনীয় হতে হবে। তবে সবার জন্যই সর্বাধিক জরুরি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোÑ সংক্রমণের চেইন চিহ্নিত করা, যাতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। কারণ, প্রত্যেক রোগীই অসংখ্য ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে পারেন, যাঁদের অনেকের মধ্যেই এর কোনো উপসর্গ থাকে না; যদিও এই উপসর্গহীন ব্যক্তিরাও অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। অর্থাৎ করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির উত্তম পন্থা হলো ‘প্রিভেনশন’ বা এর সংক্রমণ প্রতিহত করা, যাতে রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হাসপাতালে লাইন বন্ধ করা যায়। যেসব দেশ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পেরেছে, তারাই রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এবং মৃত্যুর সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পেরেছে।
ডেলটা ভেরিয়েন্ট প্রতিরোধে এমনই আরেকটি অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু করেছেন সাংসদ ডা. সমিলউদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাঁর নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ রয়েছে। এগুলো হলো ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’; জনগণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা; পর্যাপ্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগী শনাক্ত করা এবং রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া ও আইসোলেশনে রাখা; রোগীর সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিনে রাখা; মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি। একই সঙ্গে টিকা পাওয়া গেলে জনগণকে, অন্তত ৭০ শতাংশ জনগণকে দ্রুততার সঙ্গে টিকার আওতায় আনা, যাতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ সৃষ্টি হয়। লকডাউন দীর্ঘমেয়াদিভাবে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নয়, কারণ এতে প্রতিরোধমূলক কোনো সক্রিয় উদ্যোগ অনুপস্থিত।
উল্লেখ্য, টিকা কেনার খরচ বাদ দিলে অন্য সব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়সাশ্রয়ী। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এবং তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করা গেলে—যার জন্য সুচিন্তিত ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা আবশ্যক—এর থেকে অনেক দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায়। যেমন হাত ধোয়া ডায়রিয়া প্রতিরোধ করতে পারে। একইভাবে মাস্ক পরলে অনেক বায়ুদূষণজনিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘রিস্ক কমিউনিকেশন ও কমিউনিটি এনগেজমেন্ট’ শিরোনামের একটি টেকনিক্যাল গাইডলাইন রয়েছে, যা কাজে লাগিয়ে এরই মধ্যে হাঙ্গার প্রজেক্ট ‘করোনাভাইরাস-সহনীয় গ্রাম’ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে এখন সরকারও আগ্রহ দেখাচ্ছে। উপরিউক্ত গাইডলাইনকে চারটি ভাগে—কমিউনিটিকে সম্পৃক্তকরণ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক অভিঘাত প্রশমন—বিভক্ত করে ১ হাজার ২০০ গ্রামে একটি কম্প্রিহেনসিভ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যার অংশ ছিল একটি থ্রি ডব্লিউ ক্যাম্পেইন—হাত ধোয়া, মাস্ক পরা ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, তথা অভ্যাস পরিবর্তন। আমরা দেখেছি, স্বেচ্ছাব্রতীদের নেতৃত্বে, কমিউনিটিচালিত এ উদ্যোগের ফলে আমাদের কর্ম এলাকায় মাস্ক পরার হার প্রায় দ্বিগুণ এবং সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।
ডেলটা ভেরিয়েন্ট প্রতিরোধে এমনই আরেকটি অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু করেছেন সাংসদ ডা. সমিলউদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাঁর নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে জেলায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাইফ্লো নাজাল ক্যানুলাসহ ৭২টি শয্যার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি নিজেও রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দিয়েছেন।
এ অসাধারণ উদ্যোগের ফলে সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে শিবগঞ্জে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার ৬৬ শতাংশ থেকে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ উদ্যোগের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো ডা. সমিলউদ্দিন নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা, সমর্থন ও সহায়তা নিজের আন্তরিকতা দিয়ে অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এখন সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থা এবং জনগণকে নিয়ে অন্য সাংসদেরা এমন উদ্যোগ নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস।
● ড. বদিউল আলম মজুমদার গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট