default-image

দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং কয়েক ডজন উন্নয়নশীল দেশ কোভিড-১৯–এর ভ্যাকসিনের পেটেন্টসহ মেধাসম্পদের (আইপি) স্বত্ব উন্মুক্ত করে দিতে বলছে। এই দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী দ্রুত টিকা উৎপাদন করার স্বার্থে পেটেন্ট তুলে দিয়ে এর ফর্মুলা উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অন্যথায় বিপদ আরও বাড়বে।

তাদের বক্তব্য শতভাগ ঠিক। কোভিড-১৯–এর মোকাবিলা করতে হলে আইপি তুলে দিতেই হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে এ–সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য ও ফর্মুলা বিনিময় করতে হবে।

আইপি স্বত্ব তুলে দেওয়ার জন্য প্রায় দেড় শ জন জননেতা ও বিশেষজ্ঞ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু ভ্যাকসিন উৎপাদকদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকার ও ওষুধ কোম্পানি এবং ইউরোপিয়ান কমিশন আইপি তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে।

কোভিড-১৯–এর ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব তুলে দেওয়ার বিষয়ে এখন আর প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ, ভারতে এখন যে অবস্থা চলছে, তা বর্ণনাতীত। সেখানে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের উৎপত্তি হয়েছে, যা অন্য ধরনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বংসী। এ ছাড়া বিশ্বের সব মানুষের টিকা উৎপাদনে কোম্পানিগুলো যে সক্ষম নয়, তা বোঝা যাচ্ছে। সে কারণেই আইপি তুলে দেওয়ার যুক্তি জোরালো হয়েছে।

সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, কোভিড-১৯ অথবা যেকোনো ধরনের জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আইপি কার্যকর রাখা উচিত নয়। আরও দেশকে ভ্যাকসিন, টেস্ট কিট এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আইপিসংক্রান্ত জটিলতা সর্বসাধারণের টিকাপ্রাপ্তিকে আরও প্রলম্বিত করবে এবং এর ফলশ্রুতিতে আরও লাখ লাখ মানুষ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। আর এ সময়ের মধ্যে এ ভাইরাসের আরও রূপান্তর ঘটবে এবং নতুন নতুন ধরন তৈরি হবে। এতে ভ্যাকসিন নেওয়া ব্যক্তিও নতুন ধরনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের করপোরেট ওষুধ কোম্পানির স্বার্থকে বড় করে দেখা হচ্ছে। ভয়ংকর বিষয় হলো, এ করপোরেট কোম্পানিগুলো আইপি উন্মুক্তকরণের বিরোধিতাকে ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যেমন তারা বলছে, এমআরএনএ ভ্যাকসিন কীভাবে তৈরি হয়, তার ফর্মুলা চীন ও রাশিয়ার হাতে যাওয়া ঠেকাতেই হবে। এ বক্তব্য যেকোনো বিচারেই অনৈতিক, প্রকৃতপক্ষে তা গণহারে মানুষ মারার শামিল।

যদি আইপি তুলে দেওয়ার বিরোধিতা চীন ও রাশিয়ায় ভ্যাকসিন উৎপাদনের গতিকে মন্থর করে দেয়, তাহলে তা সরাসরি আমেরিকান, ইউরোপিয়ান ও বাকি যেকোনো দেশের মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলবে।

আইপি পণ্যের সরবরাহ ও মূল্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একটি পণ্যের পেটেন্ট সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবনকারী কোম্পানি ২০ বছর আইনগতভাবে একচেটিয়া বাজারজাত করার অধিকার পেয়ে থাকে। এতে উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে। এ মহামারিকালে আমাদের কী বেছে নিতে হবে তা একেবারে পরিষ্কার। আমরা যদি পেটেন্টের স্বত্ব তুলে দিতে না পারি, তাহলে ভ্যাকসিনে উৎপাদন বাড়ানো যাবে না এবং এর দামও মানুষের হাতের নাগালে আনা যাবে না।

টিআরআইপিএস (ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস) নামের এ–সংক্রান্ত বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনে আগে থেকেই সরকারগুলোকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিশেষ জরুরি অবস্থায় আইপি স্বত্ব বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারগুলোকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্স তলব করতে হবে। এ লাইসেন্স স্থানীয় কোম্পানিকে পেটেন্ট দ্বারা সংরক্ষিত মেধাসম্পদ ব্যবহারের অধিকার দিয়ে থাকে। কিন্তু সেই আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

ব্রাজিল, চীন, ভারত, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার এ ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সারা বিশ্বে তা সরবরাহ করার মতো ক্ষমতা রয়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও এ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ভয়ে টিআরআইপিএসের অনুমোদিত লাইসেন্স তলবের বিকল্প পথে যাচ্ছে না।

কিন্তু সব দেশ যদি একসঙ্গে মেধাস্বত্বের বাধা ভেঙে ফেলে, তাহলে বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে।

এ মেধাস্বত্ব থাকার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানি মডার্না ইতিমধ্যেই ৭৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার কামিয়েছে। অর্থাৎ এমআরএনএ উদ্ভাবনের সুফল একচেটিয়াভাবে এ কোম্পানি ভোগ করছে। এ অবস্থা থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে ও করোনা থেকে কোটি কোটি মানুষকে বাঁচাতে এমআরএনএর মেধাস্বত্ব তুলে দিতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জেফরি ডি স্যাক্স কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন