বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ জনমিতিক জরিপ-২০১৭ অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সফলতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অন্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে অনগ্রসর। দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৮ শতাংশ, পদ্ধতি গ্রহণে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ১৬ শতাংশ, প্রসব–পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিগ্রহীতার হার মাত্র ৪৬ শতাংশ। এই দুই অঞ্চলে কিশোরী গর্ভধারণের হার প্রতি হাজারে ২৮, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

আমাদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় হলো, বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার প্রায় ৪২ শতাংশ। ৩৭ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ করে দেয় এবং প্রতি ১০০ জন বিবাহিত দম্পতির মধ্যে ১২ শতাংশ পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইলেও বিভিন্ন কারণে তা করছেন না। ফলে এই দুটি কারণে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অনেক মা গর্ভবতী হয়ে পড়ছেন। বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরী মায়েদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ব্যবহার তুলনামূলক কম থাকার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হারও তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোতে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা শতকরা ৩১ ভাগ, যা আমাদের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের আভাস দেয়। পৃথিবীর মুষ্টিমেয় দেশের একটি হলো বাংলাদেশ, যেখানে জনমিতিক লভ্যাংশ বিদ্যমান। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই জনমিতিক লভ্যাংশ আমরা কতটুকু কাজে লাগাতে পারব, তার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পর্যায়ের অর্থনৈতিক উন্নতি আমরা করতে পারব কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করছে বিদ্যমান জনমিতিক লভ্যাংশের সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। একটি দেশের জনমিতিক চক্র একবারই আসে এবং বাংলাদেশে তা বিরাজ করবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এরপর আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা কমতে থাকবে এবং ক্রমান্বয়ে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। প্রশ্ন হলো জনমিতিক লভ্যাংশ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সচেষ্ট? সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য কৌশল প্রণয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে তাদের জন্য বিশেষ সেবাদানের ব্যবস্থা, কিশোরীদের শিক্ষা কার্যক্রমে বৃত্তিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান, কিশোরী ও তরুণীদের কারিগরি শিক্ষায় অধিক পরিমাণে অংশগ্রহণে নানাবিধ সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রম ইত্যাদি।

উল্লিখিত পদক্ষেপের কিছু সুফলও আমরা পাচ্ছি, যেমন শিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের যেতে হবে অনেক দূর। বাল্যবিবাহ নামক বিষফোড়া নিরাময়ে আমাদের সফল হতেই হবে, অন্যথায় বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোতে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা শতকরা ৩১ ভাগ, যা আমাদের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের আভাস দেয়। পৃথিবীর মুষ্টিমেয় দেশের একটি হলো বাংলাদেশ, যেখানে জনমিতিক লভ্যাংশ বিদ্যমান। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই জনমিতিক লভ্যাংশ আমরা কতটুকু কাজে লাগাতে পারব, তার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

বিডিএইচএস ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরে উপনীত হওয়ার আগেই দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরীর বিয়ে হয় এবং এক-তৃতীয়াংশ কিশোরী এক সন্তানের জননী হয়। উল্লেখ্য, ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিতদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা বেশি থাকলেও আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার খুবই কম। বাল্যবিবাহের কারণে ৮৬ শতাংশ কিশোরী স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। আমাদের আহত করে যখন জানতে পারি ৭০ শতাংশ কিশোরী বাল্যবিবাহের জাঁতাকলে পিষ্ট হয় পরিবারের ইচ্ছায়। বয়ঃসন্ধিকালীন বিবাহের অনুষঙ্গ হিসেবে আরও যে বিষয়গুলো আমাদের চিন্তিত করে—অশিক্ষা, অপুষ্টি, ভগ্ন স্বাস্থ্য ও নির্ভরশীলতা। আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিয়ে মানে একজন কিশোরীর সব সম্ভাবনার সমাপ্তি। পরিসংখ্যানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশে কিশোরীদের সার্বিক অবস্থা তাদের নিজেদের, সমাজের ও দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অনুকূল নয়।

কিশোর–কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের চলমান কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে হবে। তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধকল্পে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীবান্ধব সমাজ গঠনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার পাশাপাশি প্রয়োজন বিদ্যালয়ে বা মাদ্রাসায় স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রমের প্রচলন করা দরকার। যেসব কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে প্রয়োজন যথাযথ কার্যক্রম।

‘আঠারোর আগে বিয়ে নয়, বিশের আগে সন্তান নয়’ স্লোগান বাস্তবায়নে প্রয়োজন সবার সমন্বিত প্রয়াস। বিবাহিত কিশোরীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে বিলম্বে গর্ভধারণে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। বিশ্ব জন্মনিরোধ দিবসে সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে আমরা আমাদের এই সম্পর্কিত দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো জানব এবং সে লক্ষ্যে কাজ করব—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

মো. মাহবুব উল আলম পরিবার পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ এবং টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, ইউএসএআইডি সুখী জীবন প্রকল্প, পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন