default-image

এই ছবিটা দেখুন। প্রথম আলো কার্যালয়ে এটা আমার ডেস্ক। আনিসুজ্জামান স্যারের এই ছবিটা তুলেছেন আমাদের সহকর্মী মিজানুর রহমান খান। ১ জুলাই ২০২০ সেই ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন: ‘আনিসুজ্জামান স্যার একদিন আনিস ভাইয়ের টেবিলে বসে নিজের লেখা সংশোধন করছিলেন। বললাম, স্যার, আমি এখন আলোকচিত্রী। আপনাকে একটা পোজ দিতে হবে। আপনি আমার দিকে তাকান।’

ফারাজের ফ্রেমটা যাতে ভালোভাবে ফোটে, সেটা মনে রেখেছিলাম খুব।

লতিফুর রহমান সাহেবের নয়নের মণি ছিলেন ফারাজ। কী আশ্চর্য, পৃথিবীকে বিদায় জানাতে পরম প্রিয় নাতির মৃত্যুদিনটিকেই বেছে নিলেন তিনি।

‘উই আর ফারাজ’

—উইথ আনিসুল হক।

বিজ্ঞাপন

আমি এই ছবিটা বের করে মাঝেমধ্যে দেখি। আনিসুজ্জামান স্যার প্রথম আলোয় এলে আমাদের ফ্লোরেই আসতে হতো তাঁকে। ‘আমার অভিধান’ বেরোত নিয়মিত, শুক্রবারের ‘অন্য আলো’ পাতায়, কিংবা বিশেষ দিনগুলোয় তাঁকে অনুরোধ করে লেখানো হতো বিশেষ লেখা। সেই লেখাগুলোর প্রুফ দেখতে নিজে চলে আসতেন কারওয়ান বাজারে। কাউকে ব্যতিব্যস্ত করতে চাইতেন না, কোনো একটা টেবিলে বসে আপন মনে প্রুফ দেখে নীরবে প্রস্থান করতে চাইতেন। কিন্তু আমরাই তাঁকে ব্যস্ত করে তুলতাম। তাঁর স্নেহ আর সেন্স অব হিউমারের সুধার লোভে আমরা তাঁর পাশে ঘুরঘুর করতাম। কালো এক কাপ কফি নিয়ে দৌড়ে হাজির হতাম তাঁর পাশে। তিনি পকেট থেকে সুইটেনার বের করে চামচ নাড়তে নাড়তে কোনো সত্যিকারের হাসির ঘটনা বলতেন। আর সেই গল্পের চরিত্র অবশ্যই কোনো বিখ্যাত মানুষ। ‘আনিসুল হক!’

‘স্যার!’

‘ট্র্যাজেডি আর কমেডির পার্থক্য জানো?’

‘স্যার!’

‘একদিন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ রেডিওর অমুককে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে জিগ্যেস করলেন, ট্র্যাজেডি আর কমেডির পার্থক্য কী? তিনি বললেন, এখন যদি কলার খোসায় পিছলে আমি পড়ে যাই, এটা হবে কমেডি। আর যদি আপনি পড়ে যান, তাহলে তা হবে ট্র্যাজেডি। কারণ ট্র্যাজেডি হলো মহতের পতন।’

আহা! আমাদের আনিসুজ্জামান স্যার। কত যে বিরক্ত করতাম এই অসাধারণ অসামান্য মানুষটাকে। এই শহরে আনিসুজ্জামান স্যার নেই, এটা ভাবলেই আমি বুকে ব্যথা অনুভব করি। মিজানুর রহমান খানের এই লেখাটা যাঁদের নিয়ে, তাঁদের কেউই তো নেই। গত বছরই আমরা হারালাম অসামান্য ব্যক্তিত্ব, অমায়িক মানুষ শিল্পপতি লতিফুর রহমানকে। মিজানুর রহমান খান একদম সত্য কথাটা বলেছেন, ফারাজ ছিল লতিফুর রহমান সাহেবের সবচেয়ে প্রিয় নাতি। ফারাজের চলে যাওয়ার আঘাতটাই ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত করেছিল লতিফুর রহমানকে। তবে তিনি সব সময়ই ফারাজের অতিমানবিক বীরত্ব নিয়ে গর্ব করতেন। ফারাজ যে মৃত্যুর মুখেও বন্ধুদের ছেড়ে যায়নি, স্বার্থপরের মতো একা একা বাঁচতে চায়নি, এই কথাটা ভেবে তিনি সাহস আর সান্ত্বনা পেতে চাইতেন। আর দেখুন, আশ্চর্য নয় যে আমাদের সহকর্মী মিজানুর রহমান খানও ঘোষণা দিলেন, আমরা সবাই ফারাজ। মিজানুর রহমান খানও বীরত্ব দেখিয়েছেন। তা না হলে এই করোনার কালে কেউ একজন শিশুর চিকিৎসাবঞ্চনা আর মৃত্যুর খবর সংগ্রহের জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে থাকে, পড়ে থাকে! করোনার মধ্যে কতজন করোনা বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছিলেন!

এই ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কেউই আর বেঁচে নেই। একমাত্র আছি আমি। জানি না, কবে মৃত্যু ডেকে নেবে আমাকেও। আনিসুজ্জামান স্যারের এই ছবিটা ২৫ মার্চ ২০২০-এর হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ২৬ মার্চ ২০২০ তাঁর লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায়। শিরোনাম ছিল ‘মুজিব বর্ষে স্বাধীনতা’। ২৫ মার্চ তিনি আমাদের অফিসে এলেন। এপ্রিলে মৃদু অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। ১৪ মে আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন চিরতরে। মিজানুর রহমান খান ৫ ডিসেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন, সেখান থেকেও লেখা পাঠিয়েছেন প্রথম আলোয়, জানুয়ারিতেই তিনি নেই। তাঁর শূন্য ডেস্কে বইপত্র এখনো ছড়ানো।

বিজ্ঞাপন

গত বছর ৬ এপ্রিল প্রথম আলোয় আমরা আমাদের আরেক জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর লেখা ছাপালাম। শিরোনাম ছিল ‘অভাবীদের তালিকা করে মোবাইলে টাকা পাঠান’। লেখাটা আমিই মুঠোফোনে স্যারের কাছ থেকে শুনে লিখেছিলাম। পরের দিন লেখা পড়ে স্যার আমাকে এসএমএস করে ধন্যবাদ জানালেন। ২৮ এপ্রিল সকালে শুনি, স্যার আর নেই। রাতের বেলা ঘুমিয়েছেন, সকালে আর ঘুম থেকে ওঠেননি।

কত প্রিয়জন, কত আত্মীয়স্বজন, কত গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে যে হারালাম গত ১০টা মাসে। শিল্পী মুর্তজা বশীরের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলতেন, ‘আনিস, এদিকে এসো।’ কাছে টেনে নিতেন। আমাদের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন, ১৯৫২ সালের কুশীলব, হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনে যাঁর ছবি আছে ভাষা আন্দোলনের, যিনি নিজেও লিখতেন খুব সুন্দর; তাঁর সান্নিধ্যে যেমন পেতাম উষ্ণতা, তেমনি পেতাম আলো। কামাল লোহানীকে দেখতাম দূর থেকে, শালপ্রাংশু মানুষটা সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিতে অপরূপ, আমাদের ইতিহাস-যাত্রীদের একজন তিনি, তাঁকে দেখামাত্রই সম্ভ্রম জাগত। কবি, সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাই ছিলেন মৃদুভাষী, ফোন করে বলতেন, ‘আনিসুল হক, একটা লেখা দেবেন!’ ‘জি হাসনাত ভাই, জি হাসনাত ভাই’। ওই এক ফোনেই লেখা পেয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি নেই, কালি ও কলম পত্রিকা থেকে এসএমএস আসে, একটা কি লেখা দেবেন, দেব দেব করেও দেওয়া তো হয়ে উঠল না। রশীদ হায়দার ভাই চলে গেলেন ২০ অক্টোবর, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাঁর সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিষয়ক গ্রন্থগুলো এখন আমাদের ওলটাতে হচ্ছে প্রতিদিন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে, আর বুঝতে পারছি, কী অমূল্য সম্পদই না তিনি রেখে গেছেন জাতির জন্য। আলী যাকের ভাই নেই, আমাদের নূরলদীন, আমাদের গ্যালিলিও, তিনি লিখতেন, ছবি তুলতেন, মঞ্চ-টিভি-পর্দা আলোকিত রাখতেন। নিলুফার মনজুর সানবিমসের অধ্যক্ষ এবং প্রতিষ্ঠাতা, কী যে স্নিগ্ধ এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, দেখা হলেই তাঁর ছাত্রী আমার মেয়ের কুশল জিজ্ঞাসা করতেন, আবার ছাত্রীকে পেলে নিতেন আমাদের খোঁজ। এখন লিখতে শুরু করে মনে হচ্ছে সমুদ্রের তরঙ্গ গুনতে শুরু করলাম। এত মৃত্যু এত মৃত্যু! অল্প কজনের নাম নিতে পারলাম, কত হাজার জনের নাম তো নেওয়া এই পরিসরে সম্ভবই হবে না।

গতকাল ২১ জানুয়ারি ২০২১ বাংলাদেশে প্রথম কিস্তি করোনা প্রতিরোধক টিকা বাংলাদেশে ঢুকল। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে দেশব্যাপী। এরই মধ্যে করোনায় দৈনিক মৃত্যু গড়ে ২০–এর নিচে নেমে আসে। তার মধ্যে এক দিন তা সিঙ্গেল ডিজিটে নেমেছিল। করোনার বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হব।

টিকা নেব কি নেব না, বয়স্কদের টিকা দেব কি না, এই সন্দেহে যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য পরামর্শ আছে। আমি নিজেই ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ নিয়েছি। ডাক্তারদের পরামর্শ হলো, টিকা পেলে অবশ্যই নেবেন। এবং বয়স্কদের অবশ্যই টিকা দেবেন। বিশেষ ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার আগে ডাক্তারদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া যেতে পারে। আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক চিকিৎসক রুহুল আবিদ ফেসবুকে লিখেছেন:

‘টিকা এলে, টিকা পেলে, টিকা নিন। আগে স্বাস্থ্যকর্মী, সম্মুখ কাতারের কর্মী, বয়স্কদের টিকা নিতে দিন। তারপর নিজে টিকা নিন, অন্যকে নিতে উৎসাহিত করুন।

‘না জেনে, আধা জেনে, গুজব রটাবেন না। আকারে-ইঙ্গিতে, ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে মানুষের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা করবেন না।’

আশা করছি, মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে করোনার বিপদ অনেকটাই কমে আসবে। এবং মার্চে আমরা বইমেলাও করতে পারব। আবার স্কুল-কলেজ খুলতে শুরু করে দেবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উনিশশো একাত্তর’ কবিতাটাও প্রাসঙ্গিক মনে হয়:

যে যায় সে চলে যায়, যারা আছে তারাই জেনেছে

বাঁ হাতের উল্টোপিঠে কান্না মুছে হাসি আনতে হয়।

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন