প্রশ্ন উঠেছে, কার বলে হেরে গেলেন ইমরান। দৃশ্যমান হলো বিরোধী দল তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে। কিন্তু এই দৃশ্যের বাইরেও অনেক খেলোয়াড় আছেন। এক—পাকিস্তানের রাজনৈতিক পালাবদলে আদালতকেও অতীতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে আদালত ও নির্বাহী বিভাগ মুখোমুখি ছিল। একাধিক সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আদালত কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে যে রিট হয়েছিল, হাইকোর্ট তাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ উল্টে দিয়ে গভর্নর জেনারেলের সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেছিলেন।

ক্রিকেট মাঠের তারকা ইমরানের রাজনীতিতে আসা ‘এলাম, দেখলাম ও জয় করলাম’ ছিল না’ প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল কোনো আসন পায়নি। দ্বিতীয় নির্বাচনে ইমরান জয়ী হলেও দলের অবস্থান নাজুক ছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে মুসলিম লীগ নওয়াজ ও পিপলস পার্টির বৈরিতা ইমরানের ভাগ্য যেমন খুলে দিয়েছিল, তেমনি এই দুই দলের সাম্প্রতিক ঐক্য ও সমঝোতা তাঁর বিপর্যয় ডেকে আনে।

২.

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী বরাবরই হস্তক্ষেপ করে আসছে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সেনাশাসন জারি করেন। প্রথমে তিনি ঢাল হিসেবে ইসকান্দার মির্জাকে নিয়েছিলেন। তিন সপ্তাহের মাথায় তাঁকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেন। এর আগে বারবার সরকার পতন ও প্রধানমন্ত্রী বদলেও সেনাবাহিনী নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যেখানে সেনাবাহিনীর প্রধান বেসামরিক মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। একাত্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাদ সাধে সেনাবাহিনী। সে সময় পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখতে। পরে তিনি ইয়াহিয়া খানকে হটিয়ে সেনাবাহিনীর একাংশের সমর্থনে প্রথমে প্রেসিডেন্ট ও পরে প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক তাঁকে পদচ্যুত করেন। পরবর্তীকালে একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেনজির ভুট্টো ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু দুই বছরের মাথায় তাঁকে হটিয়ে নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতায় আনা হয়। তিনি মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। একটি নির্বাচনে পিপিপিকে হারানোর জন্য কীভাবে মুসলিম লীগসহ ডানপন্থী দলগুলোকে আইএসআই টাকা দিয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ আছে সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান আসগর খানের বইয়ে। তিনি আইএসআইর বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলে।

৩.

২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান খানের ক্ষমতায় আসার পেছনেও সেনাবাহিনীর সমর্থন ও ভূমিকা ছিল বলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন আছে। আড়াই বছরের মাথায় তিনি কেন সেনাবাহিনীর বিরাগভাজন হলেন, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। পাকিস্তানে যে নেতা বা দল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাকে সরানোর জন্য নানা অপকৌশল নিয়ে থাকে নেপথ্য শক্তি। খবরে প্রকাশ, পাকিস্তানে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ বলে পরিচিত আইএসআইর প্রধান পদে ফাইজ হামিদকে বহাল রাখতে চেয়েছিলেন ইমরান। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই আইএসআই প্রধানই পাকিস্তানের পরবর্তী সেনাপ্রধান হবেন। কিন্তু বর্তমান সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া রাজি হননি। পরে সেনাপ্রধানের মনোনীত নাদিম আঞ্জুমকেই আইএসআইর প্রধান পদে নিয়োগ দিলেও সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে ইমরানের চাপান-উতোর থেকেই যায়। পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব কখনোই চায় না, রাজনৈতিক সরকার শক্তিশালী হোক।

ক্রিকেট মাঠের তারকা ইমরানের রাজনীতিতে আসা ‘এলাম, দেখলাম ও জয় করলাম’ ছিল না’ প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল কোনো আসন পায়নি। দ্বিতীয় নির্বাচনে ইমরান জয়ী হলেও দলের অবস্থান নাজুক ছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে মুসলিম লীগ নওয়াজ ও পিপলস পার্টির বৈরিতা ইমরানের ভাগ্য যেমন খুলে দিয়েছিল, তেমনি এই দুই দলের সাম্প্রতিক ঐক্য ও সমঝোতা তাঁর বিপর্যয় ডেকে আনে।

৪.

সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাব আনার পরপরই ইমরান খান এর পেছনে বিদেশি শক্তির হাত আছে বলে দাবি করেন। প্রথমে তিনি সেই শক্তির নাম না বললেও পরে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। ইমরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে সরিয়ে পাকিস্তানে পুতুল সরকার বসাতে চায়। ঘটনার সূত্রপাত ইমরানের মস্কো সফরে। যেদিন রাশিয়া ইউক্রেন হামলা করে, সেদিনই ক্রেমলিনে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ইমরান খানকে বৈঠক করতে দেখা যায়। বিষয়টিকে ওয়াশিংটন সুনজরে দেখেনি। এ নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের কাছে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। যদিও ওয়াশিংটন দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেনি। পাকিস্তানের জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে, সেখানে কী ধরনের সরকার আসবে।

৫.

ইমরান খান দুর্নীতি উচ্ছেদ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি বলতেন, পাকিস্তানে যে কায়েমি স্বার্থ ও দুর্নীতিবাজ চক্র জনগণের রক্ত শুষে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম জারি থাকবে। ইমরান খান সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও তাঁর বিরুদ্ধে কেউ দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারেননি। ডন–এর সম্পাদকীয়তে ইমরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচনা করলেও কোভিড মহামারি মোকাবিলা, বহুমুখী ইহসাস কর্মসূচি, নতুন জনস্বাস্থ্য ইনস্যুরেন্স প্রকল্পের প্রশংসা করা হয়েছে। অন্তত তাঁর সহযোগীদের কাউকে মি. টেন পার্সেন্ট কিংবা ধনকুবের খেতাব দিতে পারেনি।

৬.

ক্ষমতা হারালেও ইমরান পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন না। পরিবারতন্ত্র ও কায়েমি স্বার্থবাদের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর সংগ্রাম কতটা শাণিত করতে পারেন, দেশবাসীর কাছে কত জোরালোভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবেন, তার ওপরই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বিরোধীদের গালমন্দ নয়, আত্মসমালোচনাই হতে পারে তাঁর রাজনীতির বড় শক্তি।

ক্রিকেটকে সবচেয়ে অনিশ্চিত খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজনীতি যে তার চেয়েও অনিশ্চিত, সেটাই সাবেক এই ক্রিকেট তারকা আরেকবার প্রমাণ করলেন। যেসব রাজনীতিবিদেরা ভাবেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী, তাঁদের জন্যও এটা শিক্ষা হতে পারে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]