default-image

 শীত পড়েছে বেশ। এক সেট স্যুট-কোট হলে মন্দ হয় না। লোকটা গেল একটি টেইলার্সে। কাপড় আর মজুরির দাম শুনে লোকটার চান্দি গরম হয়ে গেল।
‘কী বুইলছে লোকটা। এত টাকা লাইগবে ক্যানে?’
বাসায় ফিরে এলেন তিনি। বেশ কষ্ট করে কিছু টাকা জোগাড় করলেন। ছুটলেন মার্কেটে।
রাজশাহী রেলস্টেশনের ফুটপাতের মার্কেট। একটা কোট হলেই তার চলবে। অনেক দেখেশুনে একটা কোট পছন্দ হলো তার। দামাদামি শুরু হলো। দোকানদার সাত শ টাকায় বিক্রি করতে রাজি হলেন। দেখতে একদম নতুনের মতো। কিনে ফেললেন তিনি কোটটা। আমাদের এই ক্রেতার নাম মাসুদ রানা। কোট কিনেছিলেন ২০১০ সালে।

বিজ্ঞাপন

এত বছর পর সেই কোটের কাহিনি কেন? কারণ শীত পড়েছে, সে ঘটনা এখন প্রাসঙ্গিক। পরের দিন কোটটা পরলেন তিনি। আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। বাহ বেশ মানিয়েছে তাকে। কোট পরে শহরে ঘুরে বেড়ালেন। তাঁর বন্ধুরা বিশ্বাসই করতে চাইল না, কোটটা ফুটপাত থেকে কেনা। একদম নতুন। ঝকঝকে! হাতে ঠান্ডা লাগছে। বাড়ি ফেরার পথে কোটের পকেটে হাত ঢোকালেন। আঙুলে টের পেলেন কিছু একটা। সেটা বের করার পরই দেখলেন একটা ছোট্ট কাপড়ের টুকরা। তাঁর মনে হলো এ ধরনের কাপড় তো লন্ড্রিতে থাকে। নম্বর দেওয়া।
পরদিন কোট হাতে নিয়ে বের হলেন তিনি। শহরের লন্ড্রিগুলোতে যাচ্ছেন। পকেট থেকে কাপড়টুকু বের করে জানতে চাইছেন, ‘এটা কি আপনাদের লন্ড্রির নম্বর। কোটটা কি আপনাদের?’

সবাই বললেন, না। এটা তাদের নম্বর নয়। কী আর করা। বাড়ি ফেরাই ভালো। তখন একজন বললেন, সামনে বাঁয়ে গেলে একটা লন্ড্রি পাবেন। ওটাতে খোঁজ করতে পারেন। কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ল লন্ড্রিটা। ‘শান্তিপুরি ফেন্সি লন্ড্রি’। কোট এবং কাপড়টুকু দেখাতেই দোকানের লোকটার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ এটাই সেই কোট। যেটা আমাদের এখান থেকে চুরি হয়েছিল। বাঁচালেন ভাই। রোজই এর মালিক এসে কোটটার খোঁজ করেন।’
মাসুদ রানাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি দোকানের লোকটাকে তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে বাড়ি ফিরলেন। মাসুদ নিজেই কোটটা মালিকের হাতে তুলে দিতে চান। দুদিন বাদে ফোন এল তাঁর কাছে। মাসুদ কোটের বিস্তারিত জানালেন ভদ্রলোককে। বললেন, ‘ভাই, দয়া করে আপনার কোটটা নিয়ে যান। আপনার শখের জিনিস। আমাকে কোট কেনার টাকা দিতে হবে না।’

বিজ্ঞাপন
রাজশাহীতে শীত পড়েছে। শীত এলেই মাসুদের চোখ পড়ে কোটের ওপর।
২০২০ সাল। ১০ বছর পার। মাসুদের বিশ্বাস, লোকটা নিশ্চয়ই একদিন তাঁর কোটটা ফেরত নিতে আসবেন।

দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। লোকটা আর আসেন না।
মাসুদ যেন বিপদে পড়ে যান। কোটটা নিয়ে চলে যান প্রথম আলো রাজশাহী অফিসে। কোটটা অতি যত্নে ঝুলিয়ে রাখেন একটি কক্ষে। মালিক এলে তুলে দেবেন তাঁর হাতে। তাঁর কাণ্ড দেখে অনেকে হাসেন, আপনি নিজেই এটি ব্যবহার করুন। অসুবিধা কি?
না। অন্যের জিনিস তিনি কিছুতেই ব্যবহার করবেন না।
বলি, ‘আরেকটা কোট কিনে নিলেই পারতেন?’
মাসুদ রানার উত্তর, ‘সেই সক্ষমতা ছিল না তখন।’ কোট ছাড়াই পার করেছেন ২০১০ সাল।
রাজশাহীতে শীত পড়েছে। শীত এলেই মাসুদের চোখ পড়ে কোটের ওপর।
২০২০ সাল। ১০ বছর পার। মাসুদের বিশ্বাস, লোকটা নিশ্চয়ই একদিন তাঁর কোটটা ফেরত নিতে আসবেন।
‘এই কোট পরা যাবে না, এমন মনোভাব কেমন করে তৈরি হলো?’
মাসুদ রানার ত্বরিত উত্তর, ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা থেকে এসব শিখেছি।’
আজ ১১ নভেম্বর। বন্ধুসভার জন্মদিন। কালো কোটের সাদা মনের মাসুদ রানাকে স্যালুট জানাই।

সাইদুজ্জামান রওশন প্রথম আলোর বিশেষ কার্যক্রম সমন্বয়ক

মন্তব্য পড়ুন 0