বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি পদের জন্য আবেদন করেছিলেন ৩৪ হাজার প্রার্থী। তাঁদের মধ্য থেকে চূড়ান্ত ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছানো প্রায় আড়াই শ জন যেসব বিভাগ থেকে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, তার মধ্যে ব্যবসায় প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ ছাড়াও অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বায়োমেডিকেল, ওয়াটার রিসোর্সেস, নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, লেদার টেকনোলজি, মেকানিক্যাল, সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, কেমিক্যাল, নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, টেক্সটাইল টেকনোলজি, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, বায়োটেকনোলজি, জিও ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড আর্থ অবজারভেশন, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি, ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স, জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং, এনভায়রনমেন্ট আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং, ফরেস্ট্রি, অ্যাগ্রো ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, আর্কিওলজি, কম্পিউটার সায়েন্স, বিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট, চারুকলা, পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, উর্দু, ফারসি ইত্যাদি।

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দুই হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে প্রতিবছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে বের হওয়া প্রায় ২৮ লাখ তরুণের যে বিশাল বহর প্রতিবছর চাকরির বাজারে নেমে পড়ে, তাদের অধিকাংশের সঙ্গে চূড়ান্ত ইন্টারভিউয়ে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের দেখা হয় না, কারণ তারা প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে যায়

দীর্ঘ এ তালিকা দেওয়া এ কারণেই যে আমাদের দেশে তথাকথিত উচ্চশিক্ষা দেওয়া হয় কেবল ডিগ্রি প্রদানের জন্যই; আহরিত ‘জ্ঞান’ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কর্মসংস্থান হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ কোনো দায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চমকপ্রদ নামে নানান ধরনের বিভাগ চালু করা হলে শিক্ষকদের কর্মসংস্থান হয় বটে, শিক্ষার্থীদের কোনো ফায়দা হয় কি না—সে বিষয়টি কখনো দেখা হয় না। প্রকৌশলী কিংবা এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে জনপ্রশাসন বিভাগে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার উদাহরণও কম নয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এসবের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মেডিকেল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, প্রকৌশল, টেক্সটাইল, সমুদ্রবিজ্ঞান, বিমান চালনা ও মহাকাশবিজ্ঞান, পশুরোগ ও প্রাণিবিজ্ঞান, ডিজিটাল, এমনকি ইসলাম ও আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ও। এগুলোর বাইরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে শতাধিক, যার অধিকাংশের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দেশের সব কটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দুই হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে প্রতিবছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে বের হওয়া প্রায় ২৮ লাখ তরুণের যে বিশাল বহর প্রতিবছর চাকরির বাজারে নেমে পড়ে, তঁাদের অধিকাংশের সঙ্গে চূড়ান্ত ইন্টারভিউয়ে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের দেখা হয় না, কারণ তাঁরা প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে যান।

দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার গ্র্যাজুয়েটের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে বিআইডিএসের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৯ সালে দেশের ৩৩ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটই ছিলেন বেকার। একই বছরের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টেও গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের এ হার এক-তৃতীয়াংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০২১ সালের জুনে প্রকাশিত বিআইডিএসের আরেক সমীক্ষায় দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে ডিগ্রিধারী যুবগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশই ‘উচ্চশিক্ষিত’ বেকার হয়ে পড়েন।

বিআইডিএসের সমীক্ষাতেও পাওয়া গেছে যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী কেবল একটা সনদের জন্য এসব কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশাল এই ‘উচ্চশিক্ষিত’ যুবগোষ্ঠীর উপযুক্ত কর্মসংস্থান সম্ভব হয় না প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, এঁদের সবাইকে সরকারি চাকরিতে ঢোকার সুযোগ দেওয়া যায় না; দ্বিতীয়ত, সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যোগ্যতর প্রার্থী হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের ব্যর্থতা। বর্তমান সময়ে জনসংখ্যায় যুবগোষ্ঠীর তুলনামূলক যে সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বাংলাদেশের ভোগ করার কথা, সেটি পরিপূর্ণ ও কার্যকরভাবে ভোগ করা যাচ্ছে না প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং যেকোনো উপায়ে সনদপ্রাপ্তির মানসিকতার কারণে।

দেশীয় জনশক্তির মধ্যে যোগ্য লোকবলের ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদেশিদের নিয়োগ দিতে হয়, যার পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক যুক্তি রয়েছে। বর্তমানে দেশে বৈধভাবে কর্মরত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার, তবে ভিন্ন সূত্রমতে জানা যায় আরও দেড় লাখের মতো বিদেশি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন। রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪ হাজার বিদেশি ২০২০ সালে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। অন্য এক তথ্যে পাওয়া যায়, বিদেশি কর্মীরা বছরে ২৬ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ আয় নিজ নিজ দেশে স্থানান্তর করেছেন। এ প্রবণতা রোধ করার জন্য বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিদেশি জনশক্তি নিয়োগের ব্যাপারে দেশীয় জনবল নিয়োগের বর্তমান অনুপাত (১:৫) বাড়িয়ে খসড়া নীতি প্রণয়ন করছে বলে খবরে প্রকাশ।

বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে কঠোরতর নিয়ম চালু করলে একদিকে যেমন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু দেশীয় প্রতিষ্ঠান যদি প্রযুক্তিতে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী স্থানীয়ভাবে না পায়, তাহলে তাদের বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকে না। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন না ঘটিয়ে কেবল বিদেশি কর্মী নিয়োগের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি করলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হবে না। সেই সঙ্গে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মসংস্কৃতিতে প্রযুক্তি দক্ষ জনবলের যে চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে, তার সঙ্গে আমাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হবে। এ নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে বর্তমান ‘উচ্চশিক্ষিত’ গ্র্যাজুয়েটদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

  • ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার

    [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন