কী দারুণই না হতো, আর কোনো মহামারি যদি আমাদের মোকাবিলা করতে না হতো। গত বছরের কথা ভাবলেই যে কথাটা আমাদের মনে আসে, তা হলো ‘আর না’। আরও একটা বছর প্রাণহানি, লকডাউন আর চাকরি হারানোর বেদনা আমরা সইতে পারব না।

অথচ একটি ব্যাপারে কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার, ভবিষ্যতে আরেকটি মহামারি আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। ২০১৮ সালে একটা ভাষণ আমি দিয়েছিলাম: চীনে শূকরের কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হন এক কৃষক। নিজ সম্প্রদায়কে সংক্রমিত করে তিনি বিমানে করে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। এই চিত্রের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে, এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া, মানুষের শেষ আশ্রয় অ্যান্টিবায়োটিককেও যা উপেক্ষা করতে পারে, আমাদের মধ্যেই বিরাজ করছে। এরাই হতে পারে ভবিষ্যৎ মহামারির উৎস।

অথবা পরবর্তী মহামারির কারণ হবে প্রাণী থেকে মানবদেহে চলে আসা কোনো ভাইরাস। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার শিকার হওয়া প্রথম মানুষগুলো কিন্তু রাশিয়ার একটা হাঁস–মুরগির খামার থেকেই আক্রান্ত হয়েছিল। ঝুঁকির কত কাছে আমরা আছি, এটা তার সামান্য নিদর্শন। যখনই কোনো ভাইরাস কোনো প্রাণীর মধ্যে বিস্তার লাভ করে, তাদের মানুষকে সংক্রমিত করার একটা ঝুঁকি থেকেই যায়।

পরবর্তী মহামারি যেখান থেকেই আসুক, তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একটা জোরালো রেসপন্স–ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারগুলোকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় কাজে লাগবে, এমন অনেক কাঠামোই বিগত সময়ে যুক্তরাজ্য গড়ে তুলছে। তবে প্রকৃত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও অনেক কিছু করা দরকার।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগের এখনই সময়। আর এটা করেই শুধু সত্যিকার অর্থে পরবর্তী মহামারির জন্য আমরা প্রস্তুত থাকব

বাণিজ্য ও ভ্রমণ দেশগুলোকে যুক্ত করেছে আর সৃষ্টি করেছে রোগ বিস্তারের নতুন নতুন সুযোগ। রোগঝুঁকি শনাক্তে তাই দরকার বৈশ্বিক নজরদারি। আমাদের যেমন আবহাওয়া সার্ভিস আছে, সরকারগুলোর উচিত বিশ্বজুড়ে তেমনি করে ভাইরাস নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এই নেটওয়ার্কের কাজ হবে শঙ্কাজনক রোগজীবাণুর খোঁজখবর রাখা আর পশুপাখির ভাইরাস শনাক্ত করা, মানবসমাজে সেগুলোর বিস্তারের ঝুঁকি লাঘব করা।

আর এ জন্যই নতুন ধরন শনাক্তে আর টিকার বুস্টার শট দরকার কি না, জানতে দেশে দেশে সিকোয়েন্সিং সুবিধা থাকাটা জরুরি। সব দেশের সিকোয়েন্সিং সুবিধা নেই। অন্য দেশগুলোও যেন দ্রুত নতুন ভাইরাসের ধরন শনাক্ত ও সিকোয়েন্সিং করতে পারে, তার জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে অর্থ সহায়তা করা আমাদের অবশ্যকর্তব্য হওয়া উচিত। দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে বিশ্বব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উচিত এগুলো গড়ে তুলতে কারিগরি সহায়তা দেওয়া।

বিনিয়োগের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে টিকা। কোভিড-১৯–এর টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে দ্রুততার সঙ্গে হয়েছে; আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পরেরবার আমাদের আরও তুরন্ত হতে হবে। টিকা আবিষ্কার তো আসলে অর্ধেক যুদ্ধজয়। টিকা নিয়ে সাম্প্রতিক টানাহেঁচড়া আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, এদের উৎপাদনসক্ষমতা নিয়েও দেশগুলোকে গভীরভাবে ভাবতে হবে, গণটিকা উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সরকারগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

একাধিক টিকা আবিষ্কার, কোভিড-১৯–এর চিকিৎসাসহ গত কয়েক বছরে বৈজ্ঞানিক যে উল্লম্ফন ঘটেছে, সেটাকে মনে হতে পারে জাদু। বহু বছরের গবেষণা আর পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের কাজের ফসল এ অগ্রগতি। ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন, ১৯৬১ সালে পোলিওর টিকা আর ১৯৬৩ সালে এমএমআর টিকার মতো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে বহু বিজ্ঞানী, রসায়নিক, ভাইরোলজিস্ট, জিনতত্ত্ববিদ, প্রকৌশলী আর গণিতবিদের কল্যাণে।

কোভিড-১৯–এর ব্যাপারেও একই কথা। বিজ্ঞানের গুরুত্ব এত প্রবলভাবে আর কখনো অনুভূত হয়নি। প্রত্যাহারের বদলে সরকারগুলোর উচিত এ খাতে আরও বেশি করে অর্থ ঢালা। যুক্তরাজ্যের গবেষণা তহবিলের বাজেট খর্ব করতে যাচ্ছে সরকার, এমন একটা খবর খুবই উদ্বেগজনক। বিজ্ঞানের জন্য এটা হবে বড় আঘাত। বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগের এখনই সময়। আর এটা করেই শুধু সত্যিকার অর্থে পরবর্তী মহামারির জন্য আমরা প্রস্তুত থাকব।

গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

অধ্যাপক দেবী শ্রীধর সভাপতি, গ্লোবাল পাবলিক হেলথ, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন