বিজ্ঞাপন

একই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ হলো পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার ধুয়া তুলে চীনের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম নিয়ে আমাদের অঞ্চলে যাঁদের ভক্তি অনেকটা ঈশ্বরবন্দনার তুল্য, শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক কতটা গভীর, সেটা হয়তো তাঁদের জানা নেই, কিংবা জানা থাকলেও চোখ বন্ধ রাখতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন তাঁরা। ফলে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের পেছনে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের জোগান দেওয়া রসদের দিকটি কেন জানি সব সময় আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।

আপন স্বার্থে পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের সংবাদমাধ্যমকে বরাবর ব্যবহার করে আসছে। সংবাদমাধ্যমও আনন্দের সঙ্গেই সেই ভূমিকা পালন করে চলেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর কথাই ধরুন। আমাজনের মালিক জেফ বেজোস পত্রিকাটি কিনে নিয়েছেন। ব্যবসায়িক কারণে চীনের বিরুদ্ধে তাঁর খেদ রয়েছে। চীনে আমাজনের প্রবেশাধিকার নেই। বেজোস সাহেবের শকুন-চোখ বিশাল এই বাজারের দিকে তাকিয়ে আছে। যেকোনো উপায়ে চীনকে ঘায়েল করা গেলে বাজারের দুয়ার খুলে যাবে। সেই হিসাব থেকেই চীন প্রশ্নে পশ্চিমের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সখ্য। একই কথা রুপার্ট মার্ডকের মালিকানাধীন ইউরোপ-আমেরিকার কুড়িটির বেশি সংবাদমাধ্যমের বেলায়ও প্রযোজ্য। আপন স্বার্থের যেখানে এত মিল, একে অন্যকে তারা যে নানাভাবে সাহায্য করে যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

কোয়াডের সূচনা হয়েছিল ২০০৭ সালে। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তখন আনুষ্ঠানিক একটি চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা আলোচনার ডাক দিয়েছিলেন। সে বছর ডিসেম্বরে কোয়াডের চার অংশীদার বার্ষিক এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর ফোরামের বাইরে এক বৈঠকে মিলিত হয়। একই বছর চারটি দেশ ভারতের উদ্যোগে বঙ্গোপসাগরে আয়োজিত মালাবার নৌ মহড়ায় যোগ দিয়েছিল। এর মধ্যে দিয়ে কোয়াডের প্রতিশ্রুতিশীল যাত্রা শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বছর না ঘুরতেই জোটটি কার্যত ভেঙে পড়ে। এ রকম পরিণতির পেছনে একাধিক কারণ ছিল। অন্যতম হল জাপানে ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে রক্ষণশীলদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় কেভিন রাডের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির চীনকে উসকানি দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসা। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও জোটের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন। প্রায় এক দশক ধরে নামে উপস্থিতি বজায় রাখলেও কোয়াডের বাস্তব কোনো কর্মকাণ্ড একেবারেই দেখা যায়নি।

পরে চারটি দেশের ক্ষমতার পালাবদল কোয়াডকে আবারও সক্রিয় করে তোলে। ২০১২ সালের শেষ দিকে জাপানে শিনজো আবে দ্বিতীয় দফা ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তত দিনে পূর্ব চীন সাগরে জনবসতিহীন কয়েকটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীন-জাপান সম্পর্ক অবনতি হতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ায় কেভিন রাডের ক্ষমতা থেকে অপসারণ দেশটিকে আবারও দক্ষিণপন্থী নীতির দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই চীনের বিরুদ্ধে জিহাদি নীতি কার্যকর করায় সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। ভারতও তত দিনে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে চরম রক্ষণশীল নীতি অবলম্বন করতে শুরু করেন।

এই রকম অবস্থায় ২০১৭ সালের দিকে কোয়াড ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজেদের শত্রু হিসেবে রাখঢাক না করেই চীনের দিকে তর্জনী তুলতে শুরু করে। কোয়াডের এই নবজাগরণের পেছনে শিনজো আবের বড় ভূমিকা আছে। আবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলকে সম্প্রসারিত করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর আখ্যায়িত করার মধ্যে দিয়ে বিশাল এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব খর্ব করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ফলে সহজেই তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যান। অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের রক্ষণশীল সরকারও দ্রুত এতে সারা দিতে শুরু করে। বিস্তৃত সেই সমুদ্র অঞ্চলে অবাধ ও মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত মহড়া চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় চার দেশ। এরও লক্ষ্য যে চীন, কোয়াড পরিষ্কারভাবে না বললেও সবাই কিন্তু সেটাই ধরে নিচ্ছেন। এসব কারণে শুরু থেকেই চীন এই জোটকে বিশ্বজুড়ে তাদের জেগে ওঠাকে দাবিয়ে রাখার অশুভ আঁতাত হিসেবে দেখে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার হাতবদল হলেও কোয়াড নিয়ে দেশটির অনুসৃত নীতিমালায় কোনো রদবদল হয়নি। বরং জো বাইডেন তাঁর পূর্বসূরির চেয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিনের মধ্যে ১২ মার্চ প্রথমবারের মতো কোয়াড নেতাদের একটি শীর্ষ সম্মেলন ডাকেন। নিরাপত্তা প্রশ্নে চীনকে সামাল দেওয়ার উপায় নিয়ে নেতারা কথা বলেন, যদিও আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতিতে তারা চীনের নাম ঊহ্য রাখেন। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ন্যাটোর মতো একটি জোট হিসেবে এশিয়ায় কোয়াড হয়তো দাঁড়িয়ে যাবে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীনের সঙ্গে মিলে রাশিয়া হয়তো নতুন আরেকটি সামরিক বলয় তৈরি করবে। তেমনটা হলে এশিয়াজুড়ে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা হবে। এসব কারণেই চীন কোয়াডের সেই ভার্চ্যুয়াল শীর্ষ বৈঠকের সমালোচনা করে। একে স্নায়ু যুদ্ধকালীন মনমানসিকতা ধরে রাখার পাঁয়তারা হিসেবে আখ্যায়িত করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান দল ভারী করার জন্য আসিয়ান অঞ্চলে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আসিয়ানের কোনো দেশই চীনকে পাশ কাটিয়ে কোয়াডের সঙ্গে সখ্য গড়তে এখন পর্যন্ত রাজি হয়নি। নিয়মিত সামরিক মহড়া আয়োজনের বাইরে সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা অন্যান্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ কোয়াডকে এখন পর্যন্ত নিতে দেখা যায়নি। ফলে অঞ্চলের দেশগুলো কোয়াডের সামরিক চরিত্রের বাইরের অন্যান্য দিক নিয়ে সংশয়মুক্ত হতে পারছে না। ফলে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে এর কার্যকলাপের ওপর নজর রেখে যাওয়াকেই এরা অনেক বেশি যুক্তিসংগত মনে করছে।

টোকিও, ১৫ মে ২০২১

মনজুরুল হক শিক্ষক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন