default-image

জো বাইডেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তিত মার্কিন নীতির এক সন্ধিক্ষণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন এবং এটা প্রতিষ্ঠিত যে চীন-মার্কিন দ্বৈরথে চীন ও ভরতের কৌশলগত প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে চিত্রিত হবে।

১৯৭১ সালের পর যতবারই ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, ততবার আমরা বেশি আশাবাদী হয়েছি। ভেবেছি, ডেমোক্র্যাট-দলীয় সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির (টেড কেনেডি হিসেবেও পরিচিত) নীতি অনুসরণ করে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি দেবে আমেরিকা। অবশ্য এটা ছিল নাগরিক ভাবনা। যখন বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেছে, তখন সাহায্যের কথাটিই হয়তো প্রাধান্য পেয়েছে। রাজনৈতিক দর-কষাকষির জায়গায় বাংলাদেশ সেভাবে ছিল না। আজ সময় বদলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ এখন একটি মর্যাদাসম্পন্ন দেশ। তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যথেষ্ট সমীহ করে থাকে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানের মতো দেশগুলো মনে করে, বাংলাদেশ তাদের জন্য বিবিধ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতীয়মান হয়, তারা বুঝতে পারবে যে বাংলাদেশকে অযথা চাপ দিয়ে কোনো দিকে বেশি ঠেলে দিলেই সেটা তার পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সহজ না-ও হতে পারে। সুতরাং তাকে মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকতে দেওয়াটাই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর স্বার্থের জন্য হয়তো অপেক্ষাকৃত উত্তম বিকল্প।

বিজ্ঞাপন

এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তার দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে একটা কৌশলগত পরিবর্তন আনলো বলেই প্রতীয়মান হলো। এটা তাদের নয়া উপলব্ধিজাত সুচিন্তিত পদক্ষেপের অংশ বলেই মনে হয়। অবশ্য আমি যখন কূটনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় সক্রিয়, তখনকার একটি পরিবর্তনের কথা মনে করতে পারি। অনেক নতুন আশাবাদ তৈরি করে বিল ক্লিনটন ১৯৯৩ সালে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক কোনো সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছিল না। ক্লিনটন সেটা তৈরি করলেন। কেউ ভাবলেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই ওয়াশিংটনের রাডারের মধ্যে থাকবে। কিন্তু চাইলেই তো হলো না। দেশগুলোকেও প্রস্তুত থাকতে হবে। সেটা হয়তো সেভাবে ছিল না। তাই পদ সৃষ্টির পরও ব্যাপারটা আর এমন থাকল না। আর ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর টানা দীর্ঘকাল বিন লাদেন আর আফগানিস্তানই সব মনোযোগ খেয়ে নিল।

চীনের ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড ওয়ান রোড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি দেখতে দেখতে বিরাট ইস্যুতে পরিণত হওয়ার মধ্যে পাকিস্তান তার গুরুত্ব অনেক হারিয়েছে। তারপরও সবার স্মৃতিতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে এই উপমহাদেশ বলতে এখনো ভারত-পাকিস্তান। একটা দীর্ঘ সময় বিশ্বের নেতারা দিল্লি ও ইসলামাবাদ সফর করেই এই অঞ্চল দেখার তৃপ্তি নিতেন। সেটা বদলেছে। এই অঞ্চলের কদর বাড়ছে। গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারত, শ্রিলংকা ও মালদ্বীপে ওই ওই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে (টু প্লাস টু) বৈঠক সারলেন। বাংলাদেশের সঙ্গেও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অল্প সময়ের ব্যবধানে ঢাকা-ওয়াশিংটন এভিয়েশন চুক্তি সই, আমাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (প্রধানমন্ত্রী) কাছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসপার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওর টেলিফোন এবং তার পরপরই মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগনের ঢাকা সফর হলো। সম্প্রতি এই অঞ্চলের সবচেয়ে কাছের বড় মার্কিন ঘাঁটির একটা সিদ্ধান্ত দেখলাম। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সব বিভাগই (সেনা, নৌ, বিমান) বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগ্রহী। এভাবে আমরা দেখি, শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বাংলাদেশের প্রতিও মার্কিন নীতিতে একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। এটা ধরাধরি বা তদবিরনির্ভর নয়। মনে পড়ে, বাংলাদেশের সরকার প্রধানদের কেউ কেউ গেছেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে, ব্রেকফাস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ করে নিয়েছেন। সেই ছবি শীর্ষ বৈঠক হিসেবে ছাপিয়ে গোটা জাতিকে লজ্জিত করেছেন। বাংলাদেশ নেতৃত্ব অবশ্যই সেই দিনকে পেছনে ফেলেছে।

এখন গোড়ার কথায় ফিরে আসি। জো বাইডেন তাঁর দক্ষিণ এশিয়া নীতিতেও ট্রাম্পের ধারা ধরে রাখবেন। বাইডেন হয়তো আরও বেশি মনোযোগ দেবেন। কারণ, মার্কিন কৌশলগত স্বার্থ ছাড়াও দক্ষিণ এশীয় মানুষ এবং এই অঞ্চলের বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা যুগ যুগ ধরে প্রধানত ডেমোক্র্যাট সমর্থক। আর তাঁর রানিং মেট হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা তো আমাদেরই (তামিল নাড়ু তাঁর মায়ের আদি নিবাস) উত্তরাধিকার বইছেন।

গণহত্যা বিষয়ে জো বাইডেনের একটি নির্দিষ্ট মন্তব্য আমাকে এই নিবন্ধ লিখতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমরা আর্মেনীয় গণহত্যার কথা স্মরণ করছি। আমি যদি নির্বাচিত হই, আমি অঙ্গীকার করছি যে আর্মেনীয় (১৫ লাখ) গণহত্যাকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকার করে আনা রেজল্যুশন পাসে আমার সমর্থন থাকবে এবং আমি আমার প্রশাসনে সর্বজনীন মানবাধিকারকে শীর্ষ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখব।’

বিজ্ঞাপন

১৯১৫-২৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যে ঘটেছিল আর্মেনীয় গণহত্যা। তুরস্ক আজও এই গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে ফিকে হওয়া পাকিস্তানও প্রস্তুত নয়। ১৯৭১ সালে তাদের সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা তারা একদম ভাবে না। হয়তো এর অন্যতম কারণ তারা ধর্মের নামে গণহত্যা করেছিল। সেই ধর্মীয় (অপ)ব্যাখ্যাদাতা শক্তি পাকিস্তানে আজও শক্তিশালী। আরকটি বড় কারণ, তাদের তৎকালীন মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্র (ট্রাম্পের পূর্বসূরি রিপাবলিকান নিক্সন শাসিত) ও চীনকে বাদ দিয়ে তাদের এটা স্বীকার করতে সমস্যা হয়।

আমরা অবশ্যই আশা করি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য মুসলিম শক্তি—যারা একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা নয়, অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছিল বলে মনে করে—তাদের অবস্থান বদলাবে। প্রশ্ন হলো, জো বাইডেনের বিজয় থেকে আমরা বাংলাদেশিরা সরাসরি কী পাব? যেখানে আমরা আগে খুব আশাবাদী হতে পারিনি। যেমন ক্লিনটন নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সাভারের স্মৃতিসৌধে গেলেন না। আর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরোক্ষভাবে সামান্য অনুশোচনা করলেন। একাত্তরের গণহত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, বিশেষ করে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পাকিস্তানকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি কোনো আগ্রহ দেখালেন না।

মার্কিন জনগণের তরফে বাংলাদেশি জনগণের কাছে সেই দায় স্বীকারের কাজটিই বাকি রয়ে গেছে। একাত্তরের গণহত্যা ‘পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এই যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র আঁকড়ে ধরে আছে, তার বিসর্জন হোক পোটোম্যাকে। বাইডেন মানবেন যে বাঙালি গণহত্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলে আর্মেনীয় গণহত্যা অটোমান শাসনের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মতো মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেছে। সেই সংবাদমাধ্যমগুলোর আর্কাইভ থেকেই বাইডেন জানতে পারবেন, কেন বাঙালি গণহত্যার বিষয়ে রেজল্যুশন পাস করার উদ্যোগ তাঁর নেওয়া উচিত। নিউইয়র্ক টাইমসে টমাস এল ফ্রিডম্যানের সঙ্গে আমরা একমত যে জয়পরাজয় যা-ই হোক, নির্বাচনে ইতিমধ্যে হেরেছে আমেরিকা। কারণ, তিনি কোনো পক্ষের ভোটের প্রচারণায় ‘মোরাল ওয়েভ’ দেখতে পাননি। বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায় কোনো দেওয়া–নেওয়ার বিষয় নয়, বাংলাদেশ দাবি করুক বা না করুক, এটা যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

দেশে দেশে ‘উগ্র জাতীয়তাবাদীদের’ উত্থানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিশ্বের জন্য দরকার নৈতিক তরঙ্গের উদ্বোধন। বাঙালি গণহত্যার নিন্দা জানালে বাইডেন চীনকে নৈতিকতায় পেছনে ফেলতে পারবেন। কারণ, চীনের শক্তিশালী পুঁজিকাঠামো কোনো গণহত্যার নিন্দা জানানোর সামর্থ্য কম রাখে।

বাইডেনের উচিত বিশ্বের সামনে সবার আগে একটি পরিচ্ছন্ন, মানবাধিকারবান্ধব ভাবমূর্তির যুক্তরাষ্ট্র উপহার দেওয়া। গণহত্যা প্রশ্নে ক্লিনটনকে ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিব্রত না হতে দিতে সতর্ক ছিল সেদিনের শেখ হাসিনা প্রশাসন। আশা করি, ক্লিনটন যা পারেননি, বাইডেন তা পারবেন। নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করে বাইডেন সাভারে যাবেন। একাত্তরের গণহত্যায় মার্কিন সহায়তা ও ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবেন।

মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

mrkhanbd@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0