বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে হাজি সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ বলেছেন, উচ্চ আদালত তাঁকে এক মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই সময়ের আগে তাঁর বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, দণ্ডিত আসামি বিদেশে যেতে পারেন কি না। উচ্চ আদালত যেহেতু তাঁর দণ্ড বহাল রেখে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন, সেহেতু তিনি দণ্ডিত। নতুন করে আদালত কোনো নির্দেশ না দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রপতি তাঁর দণ্ড মওকুফ না করা পর্যন্ত তিনি দণ্ডিত। দ্বিতীয়ত, হাজি সেলিম যদি বিদেশে গিয়ে ফেরত না আসেন? এই প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতি সামসুদ্দীন চৌধুরীও।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, দণ্ডিত আসামি বিদেশে যেতে পারেন কি না। উচ্চ আদালত যেহেতু তাঁর দণ্ড বহাল রেখে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন, সেহেতু তিনি দণ্ডিত। নতুন করে আদালত কোনো নির্দেশ না দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রপতি তাঁর দণ্ড মওকুফ না করা পর্যন্ত তিনি দণ্ডিত। দ্বিতীয়ত, হাজি সেলিম যদি বিদেশে গিয়ে ফেরত না আসেন?

হাজি সেলিমের আইনজীবী বলেছেন, বিদেশে চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর আগেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল। এখন বিদেশে কোনো চিকিৎসক যদি এই বলে সনদ দেন যে হাজি সেলিমের বিমানযাত্রা তাঁর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তখন কী হবে? তৃতীয়ত, উচ্চ আদালতে দণ্ড বহাল থাকা এবং নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ সত্ত্বেও যদি হাজি সেলিম বিদেশে যেতে পারেন, তাহলে সেই নিয়ম বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে অনুসৃত হলো না কেন?

বিএনপির নেতারা যতবার চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বাইরে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন, ততবার আওয়ামী লীগের নেতারা, মন্ত্রীরা বলেছেন, দণ্ডিত আসামির দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে হাজি সেলিমের জন্য সেই সুযোগ কীভাবে হলো? হাজি সেলিমের আইনজীবীর ভাষ্যমতে, তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণেই বিদেশে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের একজন সাংসদ যে সুবিধা পেতে পারেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রী সেই সুবিধা পেতে পারেন না? এখানে খালেদার জন্য এক আইন আর হাজি সেলিমের জন্য অন্য আইন দেখা যাচ্ছে। যদিও নির্বাহী আদেশে সরকার খালেদা জিয়াকে জেলের বাইরে রেখেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘আমরা রায়ের সার্টিফায়েড কপি পেয়েছি। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, আজ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হাজি সেলিমকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’ হাইকোর্টে সাজা বহাল থাকার ফলে হাজি সেলিম এমপি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন বলে জানান তিনি।

গত ৯ মার্চ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় হাজি মোহাম্মদ সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছর কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় প্রকাশ করেন হাইকোর্ট বিভাগ। রায় প্রদানকারী বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়।

গত বছরের ৯ মার্চ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে হাজি মোহাম্মদ সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছর কারাদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন হাইকোর্ট বিভাগ। তবে তিন বছরের দণ্ড থেকে খালাস পান তিনি। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে তাঁকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। এ মামলায় ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল তাঁকে দুই ধারায় ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত।

২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় দুটি ধারায় বিচারিক আদালতে ১০ বছর ও তিন বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল হাজি সেলিমের। এর মধ্যে একটি ধারায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখে আরেকটি ধারায় তিন বছরের সাজা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।

রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এ টাকা পরিশোধ না করলে তাঁকে আরও এক বছর কারাভোগ করার কথা বলা হয়েছে রায়ে। তা ছাড়া এ মামলা-সংক্রান্ত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় প্রকাশের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, হাজি সেলিমের ১০ বছরের সাজার রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ-দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও কঠোর হতে বলেছেন আদালত। আপিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রায়ের নির্দেশনার আলোকে অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাঁকে জেলে যেতে হবে। জেল থেকে ওকালতনামা ও রায়ের অনুলিপি দিয়ে তিনি নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে পারবেন, জামিন চাইতে পারবেন। আদালত লিভ টু আপিল গ্রহণ করলে তিনি আপিল করতে পারবেন।’
হাইকোর্টে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে দণ্ডিত হাজি সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা বেগমের আপিলটি বাতিল করা হয়েছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় গুলশান আরা বেগমকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আইনপ্রণেতা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই কিংবা ততোধিক বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না এবং মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না।

১৪ বছর আগে বিচারিক আদালতে হাজি সেলিম দণ্ডিত হলেও এখন পর্যন্ত জেল খাটতে হয়নি। আর খালেদা জিয়ার মামলার রায় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে। বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সাংসদ হাজি সেলিম, দুজনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা হলেও এর গুণগত পার্থক্য আছে। খালেদা জিয়ার মামলা দুটি হলো জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল তহবিলের অর্থ হস্তান্তর-সংক্রান্ত। সেখানে অর্থ আত্মসাতের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু হাজি সেলিমের মামলাটি হলো অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে। নিম্ন আদালত তাঁকে ১৩ বছর কারাদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালত কমিয়ে ১০ বছর করেছেন। অন্যদিকে খালেদার মামলায় নিম্ন আদালতের দণ্ড উচ্চ আদালতে বেড়ে গেছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হাজি সেলিমকে কখনো জেলে যেতে হয়নি। নিম্ন আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর উচ্চ আদালতে রিট করে তিনি জামিন পেয়ে গেছেন। এমনকি হাইকোর্টের রায় বাতিল করেও আপিল বিভাগ পুনরায় শুনানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফা রায়েও হাজি সেলিম দণ্ডিত হয়েছেন।

উচ্চ আদালত দ্বারা দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং সরকার দলীয় সাংসদ হাজি সেলিমের প্রতি সরকারের এই ভিন্ন আচরণ একযাত্রায় ভিন্ন ফল নয় কি?

সোহরাব হাসান, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন