বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কার্যত মার্কিন নেতৃত্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক রহস্যময় লড়াইয়ের নাম হচ্ছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ। আইএস, আল-কায়েদা, বোকো হারাম, আল শাবাবের ক্ষমতার উৎস কী, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কোথা থেকে আসে, ঝাঁ-চকচকে শত শত গাড়ি নিয়ে কীভাবে সিরিয়ায় একের পর এক শহর দখল করে—এসব নিয়ে প্রশ্ন করার খুব বেশি সুযোগ ছিল না। বরং শেষবিচারের দিনের মতো সবাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে যোগ দিয়ে নিজের আমলনামা নিশ্চিত করতেই ব্যস্ত ছিল। গোয়েন্দা ব্যর্থতা যেমন এই যুদ্ধের সূচনা করেছিল, আবার এই লড়াইয়ের শেষ পরিণতিও হচ্ছে আরেকটি মার্কিন গোয়েন্দা ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই।

সর্বজনবিদিত ধারণা হচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দারা বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও তীক্ষ্ণ ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু এই সুপ্রশিক্ষিত গোয়েন্দারা বিশ্বের পরিবর্তন, বিপ্লব, হামলা বা আঘাতের তথ্য পূর্বাহ্ণেই অনুমান করতে পারেন না অনেক ক্ষেত্রে। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার আক্রমণ সম্পর্কে গোয়েন্দারা মার্কিন সরকারকে সতর্ক করতে পারেননি। সম্প্রতি তালেবানদের কাবুল দখল নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের আগাম ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রথমে মার্কিন গোয়েন্দাদের বরাতে সংবাদমাধ্যমে আমরা জেনেছি, মার্কিন সেনা কাবুল ত্যাগের ছয় মাসের মধ্যে তালেবানরা দখল করবে। এরপর বলা হলো, তিন মাসের মধ্যে কাবুল তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মার্কিন গোয়েন্দাদের পূর্বাভাসে ওপর যাঁরা আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের জন্য নিদারুণ এক চমক অপেক্ষা করছিল। শেষ অবধি দেখা গেল মার্কিন সৈন্যরা কাবুল বিমানবন্দরে থাকা অবস্থায়ই তালেবানরা কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ২০১২ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ১০টি বড় ধরনের ব্যর্থতার তালিকা প্রকাশ করে। ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনা তালিকায় ৯ নম্বরে ছিল। মার্কিন গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার শুরু পার্ল হারবারে জাপানের হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৬১ সালে কিউবাতেও মার্কিন গোয়েন্দারা হার মানেন। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধও মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণার মধ্যে ছিল না। ১৯৭৯ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হতে পারে, এমন ধারণা মার্কিনদের ভাবনারও নাকি বাইরে ছিল। ওই সময় মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন, ইরানে বিপ্লব বা বিপ্লব-পূর্ব পরিস্থিতি নেই।

একই বছর আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিষয়টি মার্কিন গোয়েন্দারা আগে থেকেই ধরতে পারেননি। যে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এত এত পরিকল্পনা, প্রচারণা, সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনও নাকি মার্কিন গোয়েন্দারা আগাম অনুধাবন করতে পারেননি। ৯/১১-এর পর ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কেও ভয়াবহ ভুল ধারণা দিয়েছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত রয়েছে। কিন্তু ইরাককে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার পর দেখা গেল সবই ভুল। তত দিনে ইরাকে রক্তের হোলিখেলা সম্পন্ন হয়েছে। বরং বিষফোড়ার মতো আইসিসের উদ্ভব ঘটে।

তালেবানদের দ্রুততম সময়ে আফগানিস্তান দখল মার্কিন গোয়েন্দা-ব্যর্থতার তালিকায় নতুন সংযোজন হবে কি, তা বলা মুশকিল। তবে মার্কিন সৈন্য চলে গেলে তালেবানরা তাৎক্ষণিকভাবে কাবুল দখল করবে, এটা সবাই কমবেশি বুঝতে পেরেছিল। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই মনে হয় বুঝতে পারেনি। আর যদি আগাম তথ্য পেয়েও মার্কিনরা চেপে যায়, তবে এটা হবে বিরাট এক ধাপ্পাবাজি। তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে এক পবিত্র ধর্মযুদ্ধে পরিণত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যযুগে নিজেদের সাহসী, ধর্মপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী প্রমাণের জন্য ক্রুসেডে যোগ দেওয়া অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। তেমনি সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যোগ দেওয়া সব রাষ্ট্রের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোন দেশে কোন ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় থাকবে, সেটাও এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সম্পৃক্ততা ঠিক করে দিত। অনেক দেশের রাজনৈতিক নেতারা এর সুবিধাও নিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিয়েছে ফ্যাসিবাদ, কর্তৃত্ববাদী শাসন।

টুইন টাওয়ারে হামলা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসনে নিউ কনজারভেটিভরা জায়গা পাওয়ার পরপরই। পেন্টাগন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট হোয়াইট হাউসে তখন নিউ কনজারভেটিভ ও পলিটিক্যাল রিয়েলিস্টদের রমরমা অবস্থা। কনজারভেটিভ ও পলিটিক্যাল রিয়েলিস্টরা আমেরিকার নতুন শতাব্দী নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর। তাঁদের লক্ষ্য ছিল স্নায়ুযুদ্ধোত্তর যুগে আমেরিকার একক সামরিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। টুইন টাওয়ারে হামলা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন শতাব্দীতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত সুযোগ করে দেয়। যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল আল-কায়েদা ও তালেবানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এরপর এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। আফগানিস্তানে হামলার পর তালেবানরা দুই মাসের মতো টিকে ছিল।

তালেবানরা একপর্যায়ে কাবুল ত্যাগ করে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যায়নি। ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট বুশ স্টেট অব ইউনিয়ন বক্তৃতায় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা জানিয়ে দেন। তিনি শয়তানের অক্ষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় ও সহায়তাদান এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করেন। বুশের অভিযুক্ত শয়তানের অক্ষে ছিল ইরাক, ইরান, উত্তর কোরিয়া, কিউবা। তবে অন্য দেশে হামলা না করে বুশ ইরাকে হামলা করেন।

আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলার পরপরই আইএসের বিস্তার ঘটতে থাকে। ইরাক ও সিরিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছিল আইএস। সিরিয়া ও ইরাকে কথিত খিলাফতের পতনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন আইএসের তৎপরতা থেমে গেছে। কিন্তু তেমনটা হয়নি। বরং নতুন নতুন দেশে আইএসের উপস্থিতি দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আইএস বিভিন্ন নামে আফ্রিকা ও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সক্রিয় হয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ মার্কিন গোয়েন্দা-ব্যর্থতা নতুন নতুন যুদ্ধের শুরু করেছে অথবা নিদেনপক্ষে মার্কিনদের নতুন ঘাঁটি তৈরির সুযোগ করেছে। সব যুদ্ধে যে মার্কিনরা বিজয়ী হয়েছে, এমন নয়। বরং ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যদের নিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় চারটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধেই ব্যর্থ হয়েছে।

বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়ে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেছে মার্কিনরা। লিবিয়ায় মার্কিনদের ব্যর্থতা পুরো আফ্রিকায় সন্ত্রাসবাদের ছায়ায় ঢেকে দিয়েছে। বিশেষ করে সাহারা অঞ্চলে আল শাবাব, বোকো হারামের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। এদিকে আমরাও খুব বেশি স্বস্তিতে নেই। দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর নড়াচড়া লক্ষ করা যায়। দক্ষিণ থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতেও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দারা সতর্ক করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বড় বড় হামলার বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দারা পূর্বানুমান করতে না পারলেও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারেন।

এসব ক্ষেত্রে তাঁদের পূর্বানুমান মিলেও যায়। যেমন কাবুলে সম্প্রতি আইএস হামলা করতে পারে বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা বারবার সতর্ক করেছে। শেষ পর্যন্ত আইএস-কে নামে নতুন এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কাবুল বিমানবন্দরে হামলাও করেছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ৯/১১ হামলার ২০ বছর পর সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বৈশ্বিক প্রভাব হচ্ছে আইএস, বোকো হারাম, আল শাবাব বা আইএস-কের মতো নতুন নতুন গোষ্ঠীর বিস্তার এবং জনসাধারণের রাজনৈতিক অধিকার আরও সংকুচিত হওয়া।

সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ নামের অন্যায্য যুদ্ধ সন্ত্রাসবাদকে রুখতে পারেনি, বরং এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ফ্যাসিবাদ, কর্তৃত্ববাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে কখনো জেতা যায় না, সফল হওয়া যায় না। তাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধও সফল হয়নি। উপরন্তু আফগানিস্তানে আবার তালেবানদেরই ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠাতে এই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বরং সন্ত্রাসী তকমা লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে উদার গণতান্ত্রিক বিশ্বের যে সম্ভাবনা ছিল, তা আটকে দিয়েছে এই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন