default-image

পুরো বিশ্বে গণতন্ত্র এখন ক্রমে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে জায়গা নিচ্ছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধে ভরপুর শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্র শব্দটি এখন শাসকদের মুখোশে পরিণত হচ্ছে। তার পেছনে থাকছে ‘এটা করা যাবে না’ বা ‘ওটা বলা যাবে না’। অবস্থা এমন হচ্ছে যে ন্যাপথলিনের মতো গণতন্ত্রের ‘গণ’ উবে যাচ্ছে। পড়ে থাকছে শুধু ‘তন্ত্র’ বা শাসন এবং সেটি আক্ষরিক অর্থে শাসনই হয়ে থাকছে।

চলতি মাসের শুরুতে বৈশ্বিক এমন কিছু ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারে যেমন ক্ষমতার পেছনে থাকা আর পোষাচ্ছিল না সে দেশের সেনাবাহিনীর। ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ঘটানো হলো সেনা অভ্যুত্থান। এরপর যা হয়—রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা হলো এবং নানা মামলা দিয়ে সেই আটককে আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা শুরু করল তথাকথিত নতুন সরকার। মিয়ানমারে বিক্ষোভ অবশ্য হচ্ছে, সেই সঙ্গে চলছে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে ধর-পাকড়ও।

মিয়ানমার একটি উদাহরণ মাত্র। পুরো পৃথিবীতেই এখন গণতন্ত্র থেকে জনগণকে উপড়ে ফেলার কাজ চলছে। অথচ গণতন্ত্রের মূলই হলো জনগণ। এই শাসনব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিকদের কাছেই থাকে মূল ক্ষমতা কাঠামোর চাবি। সেই চাবি এখন চুরি করে নেওয়ার চল চালু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০০৬ সাল থেকে গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে আসছে। ২০২০ সালের সূচকটিও সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এ সূচকে স্থান পেয়েছে ১৬৭টি দেশ। তাতে দেখা গেছে, পুরো বিশ্বের মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বর্তমানে পূর্ণ গণতন্ত্র উপভোগ করছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অঞ্চল আছে একনায়ক শাসনে। অদ্যাবধি যতগুলো বছর পর্যালোচনা করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, তার মধ্যে এবারই গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় স্কোর সবচেয়ে কম হয়েছে।

অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের প্রভাব এখন ক্ষয়িষ্ণু। মিয়ানমারের মতো অনেক দেশই ঝুঁকছে অন্য শাসনব্যবস্থায়। আবার অনেক দেশে নামে গণতন্ত্র থাকলেও, রূপে আছে ভিন্নতা। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সেখানে পাত্তা পায় না। বরং নাগরিকদের কল্যাণে নিয়োজিত সরকার ব্যবস্থা ‘রাজ্য শাসন’ করায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এবং অনুমিতভাবেই এমন একটি ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা আগেকার দিনের রাজা-রানি-অমাত্যদের হুবহু নকল মাত্র।

বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার মূল কারণ আসলে কী? নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা ফ্রিডম হাউস গত অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশে দেশে সরকারগুলো রোগ নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপের সুযোগ পেয়েছে। জনগণও মহামারি পরিস্থিতিতে তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। অযাচিত ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া সরকারগুলো এখন সেই বিশেষ অবস্থাকেই নিয়মে পরিণত করতে চাইছে। এর প্রভাব পড়ছে গণতন্ত্রে। নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকার তাই হুমকিতে পড়েছে।

গণতন্ত্র এখন সংকটে আছে। ‘গণ’ এখন ধীরে ধীরে ‘কর্তৃত্বে’ বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কারণে কোনো দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে এই প্রবণতায় অনাক্রান্ত থাকা সহজ হবে না। গণের তন্ত্র প্রকৃত রূপে ফের ফিরে আসতে পারে কি না, তা-ই এখন দেখার।

অবশ্য নাগরিকদের স্বাধীনতায় লাগাম টানার এ প্রবণতা চার-পাঁচ বছর ধরেই চলছে। ফ্রিডম হাউসের দেওয়া উপাত্তে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকেই ১০০টির বেশি দেশে ধীরে ধীরে এমন লক্ষণ দেখা দেয়। এসবের পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি বা সি চিন পিংয়ের মতো জনতুষ্টিবাদী রাষ্ট্রনায়কদের উত্থানকেও বড় কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। আর তাই আলেক্সেই নাভালনির মতো বিরোধী রাজনীতিকদের স্রেফ সমালোচনা করার কারণে কারাগারে যেতে হয়।

আমাদের দেশও গণতন্ত্রের সূচকে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। হয়তো অবস্থানের বিচারে অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা’ বিভাগেই রয়েছে বাংলাদেশ। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা’ বলতে এমন ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে প্রায়ই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দল ও বিরোধী প্রার্থীদের ওপর সরকারের চাপ সেখানে নিয়মিত ব্যাপার। এ ছাড়া দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ও দুর্বল আইনের শাসন এ ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য; নাগরিক সমাজও থাকে দুর্বল। এ ছাড়া বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয় এবং সাংবাদিকদের হয়রানি ও চাপ দেওয়া হয়।

তো, এসব বৈশিষ্ট্য কি এ দেশে নেই? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ হিসাবে নিয়ে যত নিঃশঙ্কচিত্তে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন, বুঝতে হবে, এ দেশে গণতন্ত্রের অবস্থাটা ঠিক তেমনই। সেই বোঝাপড়াটা না হয় পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া যাক।


বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই রূপ বদলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষই। নিপীড়নের শিকার তাদেরই হতে হচ্ছে। উন্নত গণতন্ত্রের সবক দিয়ে বেড়ানো যুক্তরাষ্ট্রও সাবেক প্রেসিডেন্টের কীর্তিকলাপে আর পরামর্শ দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবশ্য বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলছেন। বৈশ্বিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে তিনি কতটুকু কী ভূমিকা পালন করতে পারবেন তা দেখার জন্য আমাদের আপেক্ষা করতে হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, গণতন্ত্র এখন সংকটে আছে। ‘গণ’ এখন ধীরে ধীরে ‘কর্তৃত্বে’ বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কারণে কোনো দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে এই প্রবণতায় অনাক্রান্ত থাকা সহজ হবে না। গণের তন্ত্র প্রকৃত রূপে ফের ফিরে আসতে পারে কি না, তা-ই এখন দেখার।

অর্ণব সান্যাল লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন