তবে এই মুহূর্তে বিশ্বের অনেক দেশই হয় ঋণ বিপর্যয় কিংবা ঋণের সংকটে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের ঋণ সংকট নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যাল্পাস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বব্যাংক ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী একটি ‘মানব বিপর্যয়ের’ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। একদিকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানি শক্তির মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া ঋণ সংকট যেন একটি ‘সংকটের মধ্যেই সংকট’ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো মহামারি মোকাবিলায় প্রচুর বিদেশি ঋণ নিয়েছে, যা তাদের শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিপর্যয় তারই বার্তা বহন করছে। সেই রেশ ধরে বাংলাদেশেও আলোচনা হচ্ছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশটি কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারের উচ্চপর্যায়, নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বশীল সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশি ঋণ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের নয়, বরং পুরোপুরি নিরাপদ। তাঁরা মনে করেন, যেখানে কোনো দেশের জিডিপির ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ঝুঁকিমুক্ত, সেখানে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ জিডিপির মাত্র ৪১ শতাংশ। সুতরাং ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কিন্তু এরপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, বাংলাদেশ কি আসলেই ঝুঁকিমুক্ত?

বিদেশি ঋণ নিয়ে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এখনই দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঋণের বোঝা কমানোর কৌশল গ্রহণ এবং প্রয়োজনে সহজ শর্তে রেয়াতি ঋণের দিকে বেশি মনযোগ দেওয়া উচিত। অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আস্থার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে না পারলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এ জন্য দেশে যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

প্রথমত, সরকারের কথায় যদি ধরি যে জিডিপির ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ঝুঁকিমুক্ত এবং দেশের জিডিপির মাত্র ৪১ শতাংশ ঋণ আছে। যে প্রশ্নটি এখানে প্রাসঙ্গিক তা হলো, একটি প্রবল দুর্নীতি এবং গণতন্ত্রহীনতার দেশে জিডিপির পরিমাপ কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? প্রতিবছর আমরা দেখি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাক্কলিত জিডিপি হারের লক্ষণীয় তারতম্য। এমনকি সরকারের একাধিক মন্ত্রী দেশের কৃষি উৎপাদনের পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, একটি স্বৈরতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বাৎসরিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় ৩৫ শতাংশ অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অতিরঞ্জিত করার প্রণোদনা যত বেশি হবে এবং এটি করার বাধাগুলো যেখানে যত দুর্বল হবে, সেখানে অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা তত বেশি হবে। গবেষণাটিতে আরও বো হয়েছে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে যেখানে একটি কার্যকর বিরোধী দল থাকে, মিডিয়া থাকে, বিচার বিভাগ থাকে, সচেতন নাগরিক সমাজ থাকে, সেখানে অতিরঞ্জিত করা সরকারের পক্ষে দুরূহ। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, বাংলাদেশের জিডিপি অতিরঞ্জিত এবং গবেষণার এই হিসাবে জিডিপির অতিরঞ্জিত অংশটুকু সমন্বয় করলে দেশের বিদেশি ঋণ জিডিপির ৫৫ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে, যা একটি দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

জিডিপির অতিরঞ্জিতের বিষয়টি আরও সামনে আসে বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহের অতি নিম্নহার বিবেচনায় আনলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার সমসময় ১০ শতাংশের নিচে, যেখানে উন্নয়নশীল এশীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটি গড়ে ২৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায়, শ্রীলঙ্কার গড় রাজস্ব সংগ্রহ ১২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ভারতে ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং নেপালে ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ। অনেক কাঠামোগত কারণের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রমী নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের পেছনে অতিরঞ্জিত জিডিপি দায়ী হওয়ার সম্ভাবনা অমূলক নয়।

দ্বিতীয়ত, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণ পরিষেবার অনুপাত একটি দেশের টেকসই বিদেশি ঋণ পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যা ‘ঋণ পরিষেবা-রপ্তানি আয় অনুপাত’ হিসাবে এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সূচকটি রপ্তানি রাজস্বের মাধ্যমে বিদেশি ঋণ পরিশোধে একটি দেশের সক্ষমতা প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশ গড়ে রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশের বেশি বিদেশি ঋণের দায় হিসেবে পরিশোধ করে থাকে। যদিও এটি ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার নিচে, তবে লক্ষণীয় যে এই ঋণ পরিষেবার অনুপাত ক্রমাগত বৃদ্ধি সম্ভাব্য ঋণ সংকটের সংকেত প্রদান করে।

এ ছাড়া অত্যধিক বিদেশি ঋণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিকভাবে সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ করার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ, তাদের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) অনুসারে, বিদেশি ঋণ পরিষেবা এবং রাজস্ব অনুপাত ২০২০-এ ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এখনো সহনীয় মাত্রার মধ্যে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি রাজস্ব থেকে ঋণ পরিষেবা প্রদানের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এ ছাড়া মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া বৈদেশিক ঋণের পরিশোধ শুরু হলে পাঁচ থেকে ছয় বছর পর এই পরিমাণ আরও বাড়বে। এটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ সরকারি রাজস্বের একটি বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হলে শিক্ষা, অবকাঠামো বা স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের উন্নয়ন ক্রমান্বয়ে ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য সুখকর নয়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হলে উন্নয়ন সংস্থার রেয়াতি ঋণ ব্যবস্থা থেকে অনেকখানি বঞ্চিত হবে এবং বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ নিতে হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্তের ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। এই ঋণের সুদের হার তুলনামূলক বেশি এবং অর্থ পরিশোধের সময়সীমাও কম। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্যারিস ক্লাব নামে পরিচিত পশ্চিমা ঋণদাতাদের বাইরে যেমন চীন থেকেও এখন ঋণ নিচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চীনের ঋণগুলো কঠিন শর্তের এবং জামানতের বিপরীতে হয় অর্থাৎ চীন বন্দর বা প্রাকৃতিক কোনো সম্পদের বিপরীতে ঋণ দিয়ে থাকে।

তাই, বিদেশি ঋণ নিয়ে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এখনই দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঋণের বোঝা কমানোর কৌশল গ্রহণ এবং প্রয়োজনে সহজ শর্তে রেয়াতি ঋণের দিকে বেশি মনযোগ দেওয়া উচিত। অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আস্থার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে না পারলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এ জন্য দেশে যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

ড. ফরিদ খান অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন