বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ কিছু মানুষের জন্য স্বর্গ, সন্দেহ নেই। মন্ত্রী, এমপি, সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু ব্যবসায়ী, সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মী, এমনকি সমর্থকদের জন্যও বাস্তবতা বোঝা কঠিন। আর তাই করোনা মহামারির সময় দাঁড়িয়েও এমন দাবি তাঁরা করতে পারেন। বাংলাদেশ ধনী রাষ্ট্র ছিল না কখনোই, কিন্তু করোনা যেভাবে অনেক মানুষকে পথে বসিয়েছে, তাতে গত দুই বছরে পাল্টে গেছে বহু চেনা চিত্র। সানেম, ব্র্যাক-পিপিআরসি’র হিসাব বলছে করোনার ধাক্কায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ।

এ বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন তুলেছিলাম আমি, কিন্তু অর্থমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বেসরকারি কোনো সংস্থার পরিসংখ্যানে আস্থা নেই তাঁর। এরপর আমি জানাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তথ্য। ২০২০ সালের জুন মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানিয়েছিল, ওই সময় পর্যন্ত দেশে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এরপর আর তারা নতুন কোনো জরিপ করেনি, করলে তাদের হিসাবেও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগের চেয়ে দ্বিগুণই দেখাত। মজার ব্যাপার, বিআইডিএস–এর তথ্য দিয়ে প্রশ্ন করার পরও কোনো সদুত্তর পাইনি আমি। মন্ত্রীরা মেঠো বক্তৃতার যতটা দক্ষ, জবাবদিহি নিশ্চিতে ততটা নন। তাঁরা হয় প্রশ্ন এড়ান, নয়তো ১৫ বছর আগে ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া অন্য একটি দল কী করেছে, সেই বিষয়ে বিশদ আলোচনায় জড়ান।

করোনা দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড় অংশকে যে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে নিয়ে এসেছে, তার প্রমাণ ঢাকাসহ সারা দেশে টিসিবির ন্যায্যমূল্যের পণ্যের ট্রাকের পেছনের লাইন। এসব লাইনে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা কিছুদিন আগেই মধ্যবিত্ত ছিলেন। ‘সন্তানের লজ্জা, তাই মা দাঁড়িয়েছেন সাশ্রয়ী পণ্যের জন্য’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন প্রথম আলো দেখিয়েছিল সামর্থ্যবান একটি পরিবারের দরিদ্র হয়ে পড়ার কাহিনি। ‘লজ্জার মাথা খেয়ে’ কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য টিসিবির ট্রাকের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো এমন পরিবার ভূরি ভূরি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায় আমরা প্রতিবেদন প্রকাশ হতে দেখি। নিজেও এমন ট্রাকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি অনেক মানুষ, যাঁদের চেহারা এবং বেশভূষায় মধ্যবিত্তের ছাপ স্পষ্ট। করোনার কারণে হঠাৎ দারিদ্র্যের কবলে পড়া এসব মানুষের অসহায়ত্বের কথা পৌঁছতে পারে না উঁচুতলার এই মানুষগুলোর কাছে।

শুধু করোনার সময়েই নয়, করোনার আগেও দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ছিল ভীষণই নাজুক। করোনার আগে ২০১৯ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে করা এক সমীক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছিল, শহরের ৮ শতাংশ দরিদ্র পরিবার না খেয়ে ঘুমাতে যায়, ১২ শতাংশের ঘরে খাবার নেই, ২১ শতাংশেরও বেশি দরিদ্র পরিবারে পর্যাপ্ত খাবার নেই, আর সারা দিনে একবেলাও খেতে পায় না প্রায় ৩ শতাংশ শহুরে দরিদ্র পরিবার। অর্থাৎ ঢাকা শহরে অন্তত ৬ লাখ মানুষ দিনে একবেলা খাবার না খেয়ে, আর অন্তত ১৬ লাখ মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায়। করোনার আগেই যদি হয় এই পরিস্থিতি, তাহলে বর্তমানে পরিস্থিতি বুঝতে খুব কষ্ট হওয়ার কথা না।

এই দেশের মানুষ ক্ষুধার প্রকটতা বুঝতে মিডিয়ায় চোখ বুলানোই যথেষ্ট। তথ্যমন্ত্রী হয়েও তাঁর চোখে মিডিয়ার এসব সংবাদ হয়তো আদৌ পড়ে না। তথাকথিত উন্নয়নের মহাসড়কে তীব্রবেগে ধাবমান বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষুধা সইতে না পেরে আত্মহত্যার সংবাদে দেশের মূলধারার পত্রিকা এবং নিউজ পোর্টাল সয়লাব হয়ে আছে। ২০২০ আর ২০২১ সালের কিছু শিরোনাম- ‘ঘরে খাবারের কষ্ট, ফ্রিল্যান্সারের আত্মহত্যা’; ‘শিশুর আত্মহত্যা খাবারের অভাবে’; ‘খাবার না পেয়ে বগুড়ায় বৃদ্ধ, সিরাজগঞ্জে শিশুর আত্মহত্যা’; ‘অভাব সইতে না পেরে দিনমজুরের আত্মহত্যা’; ‘দিরাইয়ে অভাবের কারণে ৬ সন্তানের মায়ের আত্মহত্যা’; ‘খাবারের অভাবে গলায় ফাঁস দিলেন হোটেলশ্রমিক’; ‘অভাবে ঝগড়া, কাঁঠাল গাছে ফাঁস দিলেন বৃদ্ধ’; ‘বেলকুচিতে খাবারের অভাবে কিশোরীর আত্মহত্যা’; ‘ধুনটে ঘরে খাবার না থাকায় বৃদ্ধার আত্মহত্যা’; ‘চট্টগ্রামে লকডাউনে অভাবের সংসার থেকে বিষপানে বিদায় গৃহবধূর’। এ খবরগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন খবর নয়। নিয়মিত বিরতিতেই আসে এই ধরনের খবর। ঠিক কোন অবস্থায় গেলে একজন মানুষ খাবারের অভাবে আত্মহত্যা করে, সেটি বোঝা খুব কঠিন কিছু নয়।

এমন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী কী করে বলেন মোটা চাল গরু খায়? কেজিতে কিছু টাকা কম পাওয়ার জন্য যে মানুষ ওএমএস–এর লাইনে যে দীর্ঘ সময় দাঁড়ায়, সেটা কি গরুর জন্য চাল কিনতে?

‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নাই, কিল মারার গোঁসাই’—সরকারের হয়েছে সেই অবস্থা। দেশের সাধারণ মানুষ যখন দুই বেলা দুই মুঠো খাওয়া আর মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, বিশেষ করে করোনা–পরবর্তী দিনগুলোতে, সরকারের মন্ত্রীরা তখন উপহাসে ব্যস্ত। এই উপহাস যেমন হয় তাঁদের দারিদ্র্য নিয়ে, তেমনি হয় তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারের লুণ্ঠন নিয়েও।

পেটে ভাত নেই মানুষের, মাথার ওপরেও আশ্রয় নেই অসংখ্য মানুষের। প্রতিবছর দেশের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে নদীভাঙনে আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে। পুরো দেশের কথা যদি বাদও দিই, কেবল ঢাকা শহরে ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে। এই শহরেই খোলা আকাশের নিচে, ফুটপাতে স্থায়ীভাবে ঘুমায় আরও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সারা দেশ হিসাব করলে মাথার ওপর আকাশ ছাড়া কিছু নেই—এমন মানুষের সংখ্যা হবে লাখ লাখ। হ্যাঁ, এমন দেশের তথ্যমন্ত্রীই বলেন, কুঁড়েঘর নাকি আছে কবিতায়।

বাংলাদেশে এই চিত্রের বিপরীতে আছে অন্য আরেক চিত্র। যে দেশের মাটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল মানুষ, সেখানেই এখন অর্থনৈতিক বৈষম্য পরিমাপকারী জিনি সহগের মান শূন্য দশমিক ৫–এর কাছাকাছি, যা তীব্র বৈষম্য নির্দেশ করে। অতিধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম হওয়ার ‘গৌরব’ অর্জন করেছে। অতিধনী ব্যক্তি তাঁরাই, যাঁদের সম্পদের পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকার বেশি। আর ৮ থেকে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। এই অকল্পনীয় পরিমাণ সম্পদের মালিক সবাই প্রায় সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট। এ দেশে ব্যবসা হোক কিংবা রাজনীতি, সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া যায়, সঙ্গে তৈরি হয় দেশের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে এক অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা।

‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নাই, কিল মারার গোঁসাই’—সরকারের হয়েছে সেই অবস্থা। দেশের সাধারণ মানুষ যখন দুই বেলা দুই মুঠো খাওয়া আর মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, বিশেষ করে করোনা–পরবর্তী দিনগুলোতে, সরকারের মন্ত্রীরা তখন উপহাসে ব্যস্ত। এই উপহাস যেমন হয় তাঁদের দারিদ্র্য নিয়ে, তেমনি হয় তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারের লুণ্ঠন নিয়েও। এই জানুয়ারিতেই সরকারের তিন বছর পূর্তিতে সরকারের সব মহল থেকে জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়েছে ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে তাঁদেরকে ভূমিধস বিজয় উপহার দেওয়ার জন্য। সঙ্গে শোনা গেছে, জনগণের ভোট ছাড়া যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। পাঁচ বছরে একবার অন্তত নিজেকে দেশের মালিক মনে হওয়া জনগণের সেই ন্যূনতম অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলার প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে ভয়ংকর উপহাস আর কী হতে পারে?

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। ফরাসি বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্সের রানি (রাজা ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী) ছিলেন মারি এন্টোয়েনেট। তাঁর একটি উক্তি ব্যাপক আলোচিত। কেউ একজন রাজ্যে চরম খাদ্যাভাবের বর্ণনা রানির কাছে দিয়ে জানায়, অবস্থা এতই খারাপ যে মানুষ রুটিও খেতে পারছে না। তখন তার জবাবে রানি বলেছিলেন,‘ওরা কেক খেলেই পারে’। উক্তিটি কার, সেটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও সেটা মারি এন্টোয়েনেটের নামেই প্রচারিত। এখন, সাধারণ মানুষ ও বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা রানির রুটি খেতে না পারা মানুষকে ‘কেক’ খাবার পরামর্শ কতটা গর্হিত অপরাধ, সেটাই আলোচনার দাবি রাখে।

আমাদের দেশে গত এক দশক যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের জীবন খুব সম্ভবত ফ্রান্সের সেই রানির মতোই। হাজার কোটি টাকার নিচে তাঁদের কাছে পাওয়া যায় না। আরাম-আয়েশে ভরা স্বপ্নের জীবন তাঁদের। রানির সঙ্গে অবশ্য আমাদের ক্ষমতাসীনদের বড় একটা পার্থক্য আছে। রানি যেহেতু দায়িত্বে ছিলেন না, তাই তাঁর জবাবদিহিরও প্রশ্ন ছিল না। আর আমাদের বর্তমান সরকারটি দায়িত্বে থাকলেও জবাবদিহির থোড়াই কেয়ার করে। পাঁচ বছর পরপর ভোটের জন্য মানুষের কাছে ফিরতে হলে রঙিন চশমা খুলে দেখতে হয় সবকিছু। এতে বাস্তবতা বোঝা যায়, দায়ে পড়ে হলেও মানুষের কথা ভাবতে হয়। জানতে হয় তাঁরা কেমন আছে। কষ্টে সহমর্মিতা জানাতে হয়। বন্ধ করতে হয় তাচ্ছিল্য-বিদ্রূপ-উপহাস। না হলে কেবল নিজের ‘ইকো চেম্বার’ থেকে তাকিয়ে মনে হতেই পারে অর্ধশত টাকা কেজির চাল গরুতে খায় আর কুঁড়েঘর আছে কেবল কবিতায়।

রুমিন ফারহানা বিএনপিদলীয় সাংসদ ও হুইপ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন