বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে ৫–৬ বছর বয়সের শিশুদের ৫১-৫২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হিসাব পাওয়া যায়; এখন সেটি ৯৮–এ উন্নীত হয়েছে। তখন প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল শতকরা ৪০ ভাগের ওপর, এখন সেটি ২০ ভাগের নিচে।

সুতরাং সংখ্যার দিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপুল উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু এখনো প্রায়ই শোনা যায় ‘শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে’। কথাটি শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং-এ পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে নয়; মাধ্যমিক, এমনকি প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও মানের এই অধোগতির ‘প্রমাণ’ হাজির করা হয়। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ পাস করার রেকর্ড আছে, সেখানে দুই বছর অন্তর তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে ২০১৫ ও ২০১৭ সালের ফলাফলে দেখা যায়, গড়ে মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করেছে। যোগ্যতা অর্জনে এরূপ নিম্ন হার দেখে তো শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে চিন্তিতই হতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা প্রমাণ মাপকাঠি দিয়ে মেপে বলি, ওরা যোগ্যতা অর্জন করেনি, আমরাই আবার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় কী দিয়ে মেপে বললাম, অধিকাংশ পাস করেছে?

মাপকাঠির এ সমস্যা শুধু কচি শিক্ষার্থীদের বিদ্যা ও যোগ্যতা মাপতে নয়, প্রায় সর্বত্রই আমাদের মাপে ভুল হচ্ছে! সুতরাং মাপকাঠি ঠিক করে মাপটা আগে ঠিক করে নেওয়া জরুরি। সঠিক মাপে যোগ্য লোকদের যথাযোগ্য স্থানে বসিয়ে তাদের হাতেও ‘প্রমাণ কাঠি’ ধরিয়ে দিয়ে সবকিছু ঠিকভাবে মাপার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশ অঞ্চলে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাস্তর চতুর্থ শ্রেণিতে শেষ হতো; ১৯৫৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন তার ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর পঞ্চম থেকে অষ্টমে উন্নীত করার সুপারিশ করে। দেশের পরবর্তী সব শিক্ষা কমিশন এবং কমিটি এই প্রস্তাব বহাল রেখেছে। তাহলে কি শিল্পের ফরোয়ার্ড লিংকেজের মতো আমরা প্রাথমিক শিক্ষাস্তর যত ওপরে তুলতে পারব, এই স্তরের শিক্ষায় ততই উন্নতি হবে?

বিশ্বের ১৮২টি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক (৮৭টি) দেশে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ছয় বছর। অধিকাংশ উন্নত দেশ, এমনকি এশিয়ার উন্নত দেশ জাপান, চীন, কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সব কটিতে প্রাথমিক শিক্ষা ষষ্ঠ শ্রেণিতে শেষ হয়। সুতরাং সামর্থ্য তৈরি করতে পারলে আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ এক বছর বাড়াতে পারি, এর বেশি বাড়ানোর কোনো দরকার হবে না।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির প্রস্তুতিপর্বে ‘শিশু শ্রেণি’ বা ‘ছোট ওয়ান’ নামে একটি শ্রেণি সব সময়ই ঐচ্ছিক হিসেবে ছিল। স্বাধীন দেশে কয়েক বছরের মধ্যেই জার্মানির ফ্রেডরিক ফ্রয়েবল-প্রবর্তিত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার আদলে ‘কেজি স্কুল’ শিক্ষার স্ফুরণ ঘটে। কেজি স্কুলগুলোতে প্লে গ্রুপ বা নার্সারি, কেজি-১ ও ২ নামে তিন শ্রেণির প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলিত আছে। কিন্তু ‘শিশু শ্রেণি’ বা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার কোনোটাই এতকাল দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এ প্রথমবারের মতো দুই শ্রেণির আনুষ্ঠানিক প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের নীতি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম অনুসারে এক বছরের প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা ২০১৫ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাক্‌-প্রাথমিক দুই শ্রেণির করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাহলে কি শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মতো প্রাক্‌-প্রাথমিক দুই শ্রেণির বা আরও পেছনে গেলে প্রাথমিক শিক্ষার বেশি উন্নয়ন হবে? প্রস্তুতি ভালো হলে, একটু উন্নয়ন তো ঘটতেই পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, অনেক উন্নত দেশে এখনো প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয় শিক্ষাক্রমের বাইরে ঐচ্ছিক হিসেবে বিদ্যমান; আমরা কেন শিশুদের হাতেখড়ির কাজটি মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কচিশিশুদের মায়ার বাঁধন হালকা করে ঠেলে স্কুলে পাঠাতে চাইছি? এটা কি কেজি স্কুলের অনুকরণ?

জাতীয় শিক্ষাক্রমের আওতায় দুই শ্রেণির প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নও হবে দুরূহ। যেকোনো পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন ক্ষেত্রের সামর্থ্য বিবেচনায় নিতে হয়। সামর্থ্য ও প্রস্তুতির অভাবে অনেক উৎকৃষ্ট পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়।

বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা এখনো মাত্র তিনটি করে। এসব স্কুলের এক বছরের প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠের ব্যবস্থা দুই শিফটে করা হয়। সব স্কুলে অন্তত চারটি শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না করে দুই শ্রেণির প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করলেও, তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড—কোনোটাই এখনো এক বছরের প্রাক্‌-প্রাথমিককে যথাসময়ে বাস্তবায়নের যোগ্যতা অর্জন করেনি; করলে এটি ২০১৩ সাল থেকে বাস্তবায়ন না করে ২০১৫ সালে শুরু করতে হলো কেন? এবারও কেন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ধারাক্রম লঙ্ঘন করে প্রাক্‌-প্রাথমিক বাদ দিয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে? ২০২২ সালের পাইলটিং-এ প্রাক্‌-প্রাথমিক বাদ দিয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করা কীসের লক্ষণ?

অনেকেই বলছেন, শিক্ষানীতি ২০১০-এর পর্যালোচনা ও পরিমার্জন দরকার। নীতি পরিমার্জনের ওই স্তরেই প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়ভাবে এক শ্রেণির রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আমরা যখন প্রতিটি স্কুলে অন্তত চারটি শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারব, তখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ষষ্ঠ শ্রেণিতে উন্নীত করা প্রাক্‌-প্রাথমিকের বাড়তি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের চেয়ে অগ্রাধিকার পেতে পারে।

বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন ১৯৭২-৭৪–এর মূলনীতির অনুসরণে দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয় ১৯৭৬-৭৮ সালে। এই শিক্ষাক্রম প্রাথমিক স্তরে বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। দ্বিতীয় আবর্তনের প্রাথমিক শিক্ষাক্রম পরিমার্জন ১৯৯১ সালে শেষ করে বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯২ সালে অর্থাৎ প্রথমটির ১৫ বছর পর। প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের তৃতীয় আবর্তনে পরিমার্জন ২০০২ সালে শেষ করে ২০০৩ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা হয়, অর্থাৎ দ্বিতীয়বারের ১১ বছর পর। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ আবর্তনের শিক্ষাক্রম ২০১২ সালে পরিমার্জন করে তৃতীয় আবর্তনের ১০ বছর পর ২০১৩ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কিন্তু এবার মাত্র সাত বছর পর পঞ্চম আবর্তনের প্রাথমিক শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ শুরু করা হয়েছিল ২০১৯ সালে; তবে করোনা অতিমারি এবং মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের ঢিমেতালে অগ্রসরমাণ পরিমার্জন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে এখন তা চতুর্থ আবর্তনের নয় বছর পর সমাপ্তির দিকে যাচ্ছে। এবার শিক্ষাক্রম একটু আগে পরিমার্জন প্রচেষ্টার অবশ্য দুটি প্রধান উদ্দেশ্য আছে: ১. জাতিসংঘ-ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (২০১৬-২০৩০) বিধৃত শিক্ষাবিষয়ক লক্ষ্যগুলো (এসডিজি-৪) অর্জনের চেষ্টা এবং ২. বিশ্বব্যাপী স্কুল শিক্ষাকে যোগ্যতাভিত্তিক করার ঢেউকে ধারণ করা।

বাংলাদেশে চলমান প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে সব শ্রেণিতেই আট-নয়টি বিষয় বা শিখনক্ষেত্র নির্ধারিত আছে। এগুলো হচ্ছে—জাতীয় ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি, গণিত, ধর্ম, পরিবেশ (প্রাকৃতিক ও সামাজিক), শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা এবং সংগীত। প্রতিটি শিখনক্ষেত্রের জন্য পৃথক শিক্ষক নির্দেশিকাও লেখা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্তৃত এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার পাঠ্যপুস্তক প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য মাত্র তিনটি (বাংলা, ইংরেজি ও গণিত) করে। তৃতীয় শ্রেণি থেকে হঠাৎ পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা হয় ছয়টি। সেখানে ধর্ম ও ‘পরিবেশ পরিচিতি’র জন্য বিজ্ঞান ও সমাজ (নতুন নাম ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’) বিষয়ের পৃথক পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের পাঠ্য। পাঠ্যপুস্তক ছাড়া শুধু শিক্ষক নির্দেশিকা দিয়ে যেসব বিষয় পড়ানোর কথা, সেগুলোতে শিক্ষাক্রমের প্রত্যাশা কতটা মেটে তাতে সন্দেহের অবকাশ আছে; বিষয়টি প্রধানত শিক্ষকের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। প্রথম শ্রেণিতে ভাষা, বিশেষত বাংলা সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করে, তা দিয়ে সহজেই বাংলায় লিখিত পরিবেশসম্পর্কিত ভাব নিয়ে একটি সমন্বিত পাঠ্যপুস্তক দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাঠ্য করা যায়। তাতে দুটি প্রধান কাজ হয়। ১. শিক্ষাক্রমের কেন্দ্র বা নিচ থেকে ওপরের শ্রেণিতে বিষয়বস্তুর ক্রমে বৃদ্ধির নীতি অনুসরণ করা হয়, ২. শিক্ষার্থীদের পরিবেশ শিক্ষার জন্য শুধু শিক্ষকের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয় না।

একই শিক্ষাস্তরে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন অবশ্যই সর্বনিম্ন শ্রেণি থেকে শুরু করতে হয়। দেশে প্রাক্‌-প্রাথমিক, ‘শূন্য শ্রেণি’ বা ‘শিশু শ্রেণি’কে জাতীয় শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করায় এখন প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন সেখান থেকেই শুরু করতে হবে, প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে বাস্তবায়ন শুরু করা হবে অযৌক্তিক। ২০২২ সালের পাইলটিং শিশু শ্রেণির পরিবর্তে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করলেও প্রকৃত বাস্তবায়ন যখন (২০২৩ সালে?) শুরু হবে, তখন শুরুটা যেন অবশ্যই প্রাক্‌-প্রাথমিক বা শিশু শ্রেণি থেকে করা হয়। সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা দরকার, শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতি গঠনের কাজ, এটা কোনো খেলাধুলার বিষয় নয়।

ড. আবদুস সাত্তার মোল্লা শিক্ষাগবেষক এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। [email protected] com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন