বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক কালে আটলান্টিক মহাসাগর ও মেক্সিকো উপসাগরে অনেক ঘূর্ণিঝড়ের জীবনচক্রে চলার পথে অনিশ্চয়তা দেখা গেছে । ঘূর্ণিঝড়গুলোর জীবনচক্রের বিভিন্ন দশায় অনেক অনিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন অনেকটাই নিশ্চিত যে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির কারণে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের ওপর। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কালের ঘূর্ণিঝড়গুলোর উচ্চ গতিবেগ, রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত, চলার পথের মন্থর গতিবেগ, স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু জলোচ্ছ্বাস, উপকূলের কাছে এসে হঠাৎ মন্থর হয়ে যাওয়া ও হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে।

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিশালী হওয়া
আটলান্টিক মহাসাগরে গত ১৬৯ বছরের ক্যাটাগরি ৫ মানের হ্যারিকেন তৈরি হয়েছে ৩২টি, যার ৫টিই হয়েছে গত ৪ বছরে। আরব সাগরের ইতিহাসে ষষ্ঠবারের মতো ক্যাটাগরি ৪ মানের ঘূর্ণিঝড় এ মাসেই সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২০ বছরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলো ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। উল্লিখিত পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, আটলান্টিক ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হ্যারিকেন, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে টাইফুন ও ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় বিজ্ঞান গবেষণা ও ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস মডেলের উন্নয়নে ক্যারি ইমানুয়েলের অবদান অসামান্য। এমআইটির এই অধ্যাপককে বলা হয় ঘূর্ণিঝড় গবেষণার গডফাদার। অধ্যাপক ইমানুয়েলের সাম্প্রতিক গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে, বিশ্বব্যাপী অনেক বেশি হারে প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়গুলো আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম গতিতে উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই কম গতির কারণে একই মানের ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে সাম্প্রতিক কালেরগুলো থেকে বেশি পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরাও ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাসের গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে জানিয়েছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যার খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এর মূল কারণগুলোর একটি হলো বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এতে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ে। তাতে সমুদ্রের পানির বাষ্পায়ন বৃদ্ধি পায়।

সমুদ্রের পানির বাষ্পায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। পদার্থবিজ্ঞানের একটা বিখ্যাত সূত্র হলো ক্লাউসিয়াস-ক্লাপারন সমীকরণ। যে সমীকরণ ব্যাখ্যা করে যে বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ১ লিটার আয়তনের কোনো পাত্রের বায়ুর তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থাকলে সেই বায়ু যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারবে, তার চেয়ে বেশি ধারণ করতে পারবে যদি ওই একই পাত্রের বায়ুর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়ানো হয়। যে কারণে আজ থেকে ৫০ বছর আগে কোনো এক নির্দিষ্ট মাসে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প উপস্থিত থাকত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার থেকে বেশি থাকে। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই শোষণ করে নেয় সমুদ্রের পানি। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে, সমুদ্রের পানির তাপীয় বৃদ্ধি (থার্মাল এক্সপানশন) হচ্ছে, যার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা
বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি ও তার থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ৩০ বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়ের চলার গতি কমে যাচ্ছে। ধীরগতির কারণে ঘূর্ণিঝড় তার চলার পথে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সময় পাচ্ছে বেশি। মূলত, দুভাবে এই ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, একই স্থানে বেশি সময় অবস্থানের কারণে বেশি বৃষ্টি হয়ে বন্যা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী বাতাসের কারণে ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে বেশি। ২০১৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট হ্যারিকেন ডোরিয়ান বাহামা দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হানার পর ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার বেগে সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। যে কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে ভারী বৃষ্টি ও প্রচণ্ড বাতাসের কারণে দ্বীপপুঞ্জটিতে ব্যাপক ধ্বংস সাধিত হয়।

ভবিষ্যতের ঘূর্ণিঝড়গুলো যে দুটি কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছিল, ডোরিয়ানে তার দুটিই দেখা গেছে। ২০১৮ সালে নর্থ ক্যারোলিনা উপকূলে আঘাত হানা হ্যারিকেন ফ্লোরেন্স এবং ২০১৭ সালে টেক্সাস উপকূলে আঘাত হানা হ্যারিকেন হার্ভের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা দেখা গেছে। ২০২০ সালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও একই ঘটনা ঘটেছে। কলকাতা বিমানবন্দর বুকসমান পানিতে ডুবে গিয়েছিল। প্রায় সব ঝড়ের ক্ষেত্রেই স্থলভাগে প্রবেশ করার আগে চলার গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

আটলান্টিক মহাসাগরে সংঘটিত হ্যারিকেনগুলো থেকে বাংলাদেশের শেখার আছে। বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছরই কিছু ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়, যা বেশির ভাগ সময় ভারতের পূর্ব উপকূলের ওপর দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে; কোনো কোনো সময় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলের ওপর দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে। মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০ ঘূর্ণিঝড়ের ৮টিই বঙ্গোপসাগরে হয়েছে।

প্রতি ১০ থেকে ২০ বছরে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূল দিয়ে প্রবেশ করে স্থলভাগে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। যেমন ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়; ১৯৯১ সালের চট্টগ্রাম ঘূর্ণিঝড়; ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর প্রভৃতি। ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মধ্যে একটা ক্ষেত্রে মিল আছে, দুটিরই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে শক্তি সঞ্চয় করা। দুটি বড় মানের ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভূমিকম্পের মধ্যবর্তী সময়ের গ্যাপ যত বেশি হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের উপকূলে সর্বশেষ শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছে ২০০৭ সালে। তাই যেকোনো সময় শক্তিশালী একটি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানার সময় হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বাংলাদেশ সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিয়ে রাখা উচিত।

মোস্তফা কামাল আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক, স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি, সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন