default-image

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তরুণ এক চিকিৎসকের দেখা পেয়ে খুশি হয়েছিলাম। তরুণেরা অবহেলিত উপজেলায় আসছেন, থাকছেন, কাজ করছেন—এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? জনস্বাস্থ্যের গুরু ডেভিড ওয়ারনারের যেখানে ডাক্তার নেই বইয়ের পাতায় পাতায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া রোগীর পাশে দাঁড়ানোর যেসব টিপস দেওয়া আছে, তা না জেনেও এসব সাহসী তরুণ এত দূর ছুটে এসেছেন।

পাশের জেলা শহরে তরুণ চিকিৎসকটির পূর্বপুরুষদের বাড়িঘর ছিল। সে অর্থে ‘হোম ডিস্ট্রিক্ট’। এখন প্রথম পোস্টিং ‘হোম ডিস্ট্রিক্ট’ হওয়ার রেওয়াজ। তাই তিনি এখানে। ‘হোম ডিস্ট্রিক্ট’ হলেও পোস্টিংয়ের আগে তাঁর জীবনে একবারও এদিকে আসা হয়নি। কাছের আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নেই আশপাশের তিন জেলায়। সরকারি চাকরি মানে ২৪ ঘণ্টাই গণ–কর্মচারী। তরুণ চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না। দু-একটা কল যে আসেনি, তা নয়। কিন্তু এখানে রোগী প্রচুর। নানা রঙের প্রাইভেট ক্লিনিক গড়ে উঠেছে উপজেলার আনাচে–কানাচে। প্রতি সপ্তাহে ঢাকা-খুলনা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনরা আসেন। তরুণ চিকিৎসক বললেন, ‘প্র্যাকটিস করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। চার মাস বেতন নাই। বাবা শিক্ষা অফিসার, এই মাসে অবসরে যাবেন, মা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা, তিন ভাইবোন কারও লেখাপড়া শেষ হয়নি। তাঁদের একজন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। কাঁহাতক আর মা-বাবার কাছে হাত পাতা যায়? আমি তো এখন চাকরি করি।’

বিজ্ঞাপন
তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি আমরা আস্থা রাখতে চাই। আমরা চাই, কয়েক বছর পর তাঁদের নৈপুণ্যে দেশের রোগীরা যেন দেশেই সুচিকিৎসা পান, নিজ নিজ এলাকাতেই পান। তবে সেটা চাইলে তরুণ চিকিৎসকদের বেতন-ভাতার সমস্যা অবিলম্বে দূর করতে হবে

গত ১৩ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নতুন চাকরি পাওয়া চিকিৎসকদের বলেছিলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণেই আপনাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেই অর্থে এ কোভিড-১৯ আপনাদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে।’ তাঁর এই কথায় উপস্থিত কেউ প্রতিক্রিয়া দেখাননি। নতুন চিকিৎসকেরাসহ সবাই হাততালি দিয়েছিলেন। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা কথা উঠেছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে কটাক্ষও ছিল। মন্ত্রী তাঁর ওই অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না।

করোনাকালে উদ্ভূত চিকিৎসক-সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার জন্য ৩৯তম বিসিএসের অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে অতি দ্রুত নতুন করে দুই হাজার চিকিৎসকের পদায়ন ও ছয় হাজার নার্স নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২৫ এপ্রিলের সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাঁরা বেতন পাচ্ছেন না। ১৪ মে প্রথম আলো প্রকাশিত ‘বেতন হচ্ছে না শত শত সরকারি চিকিৎসকের’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সে বিষয়ে বিস্তারিত বয়ান ছিল।

গত জানুয়ারি থেকে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে ‘আইবিএস++’ নামের একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এ সফটওয়্যারে প্রত্যেক চিকিৎসকের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থাকে। নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মাসের বেতন-বিল জমা দিতে হয়। ৩৯তম বিসিএসের প্রথম নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের অভিযোগ ছিল, দেশের অনেক উপজেলা থেকে সফটওয়্যারে বেতন-বিল জমা দেওয়া যাচ্ছে না। বেতন-বিল জমা দিতে গেলে ‘ইনসাফিশিয়েন্ট বাজেট বা অপর্যাপ্ত বরাদ্দ’ লেখা আসছে। তাঁদের এ অভিযোগের জবাবে উপজেলার হিসাব বিভাগ জানিয়েছিল, চিকিৎসকদের বেতন বাবদ বরাদ্দ না আসায় এমন সমস্যা হচ্ছে।

সেই সময় বেতন আটকে থাকার কারণ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে উপজেলা পর্যায়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ার তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১. ‘আইবিএস++’ একটি সংবেদনশীল সফটওয়্যার। ২. মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাহিদা পাঠানোর সময় সতর্কতা অবলম্বন না করা এবং ৩. নিয়মিত বরাদ্দ থেকে অন্যান্য বিল পরিশোধ করা।

বেতনের কোনো একটি খাতেও বরাদ্দ না থাকলে আইবিএস++ সফটওয়্যার বেতন-বিল জমা নেয় না। মাঠপর্যায় থেকে অর্থ চাহিদা পাঠানোর সময় সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি হলেও তাই বেতন আটকে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এসবই সিস্টেমের সমস্যা। অধিদপ্তরের মাথাব্যথায় মাঠের চিকিৎসকেরা কাতরাবেন কেন?

৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ১৬১ জন চিকিৎসক গত বছর ডিসেম্বর মাসে নিয়োগ পান। তাঁদের বেতন-ভাতা বাবদ ১৩৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পর বেতন হয়েছিল প্রথম ধাপের নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের। জুন মাসের পর আবার গোল বাধে।

বরাদ্দের এসব সমস্যার সমাধান না করে নতুন চিকিৎসকদের এ দুরবস্থায় ফেলার দায় কে নেবে? তরুণ চিকিৎসক জানালেন তাঁদের সমস্যা শুধু বরাদ্দ নিয়ে নয়, অধিদপ্তর দুই হাজার চিকিৎসকের ফাইল গোছাতে দেরি করছে। যাঁরা দৌড়ঝাঁপ করে, ধরাধরি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুশি করতে পেরেছেন, তাঁদেরটা হয়েছে। তাঁর মতো যাঁরা প্রত্যন্ত ‘হোম ডিস্ট্রিক্টে’ আটকে আছেন, তাঁদের উপায় কী?

বিজ্ঞাপন
আমরা চাই যে আমাদের তরুণ চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে পেট চালাবেন? সরে যাবেন গণসেবার মানসিকতা থেকে? নতুন নিয়োগ পাওয়া তরুণ চিকিৎসকেরা যদি মাসের পর মাস বেতন না পান, তবে তাঁরা হাসপাতাল রেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসবেন।

আমলাতন্ত্রের গোড়া থেকে একদম ওপরে ওঠা অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা সব শুনে বললেন, এখন করোনায় জেলা-উপজেলা হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসকেরা প্রাণপাত করে রোগীর সেবায় নিয়োজিত। অথচ তাঁদের বেতন হয় না, এ বেদনা তাঁরা কোথায় রাখেন!

তবে কি আমরা চাই যে আমাদের তরুণ চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে পেট চালাবেন? সরে যাবেন গণসেবার মানসিকতা থেকে? নতুন নিয়োগ পাওয়া তরুণ চিকিৎসকেরা যদি মাসের পর মাস বেতন না পান, তবে তাঁরা হাসপাতাল রেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসবেন। ভরা পেটে অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা যা করছেন, খিদে পেটে তাঁরাও তা-ই করবেন। সরকারি বেতনের চেয়ে অনেক বেশি আয় করবেন। হাসপাতালের কেনাকাটায় অনৈতিকতায় জড়াবেন।

তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি আমরা আস্থা রাখতে চাই। আমরা চাই, কয়েক বছর পর তাঁদের নৈপুণ্যে দেশের রোগীরা যেন দেশেই সুচিকিৎসা পান, নিজ নিজ এলাকাতেই পান। তবে সেটা চাইলে তরুণ চিকিৎসকদের বেতন-ভাতার সমস্যা অবিলম্বে দূর করতে হবে।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

nayeem5508@gmail.com

মন্তব্য করুন