default-image

পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হয়েছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের চারজন রাজনৈতিক নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। এ নিয়ে একটি মামলা হয়েছে। বিচারও হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি।

এটা সত্য যে আদালতে সব বিষয় আলোচনায় আসে না। সব জট খোলে না। তদন্তকারী সংস্থা এবং আইনজীবীরা যেভাবে চান, মামলা সেভাবেই গড়ায়। আদালতের রায়ে ইতিহাসের উপাদান থাকলেও তা শেষ কথা নয়। ইতিহাসের সূত্র খোঁজা আদালতের কাজ নয়।

একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—এই চারজন জাতীয় নেতাকে কেন হত্যা করা হলো? এ প্রসঙ্গে একটি সরল ব্যাখ্যা আছে যে বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁরা নেতৃত্বে ফিরে আসতে পারেন বা তাঁরা ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে পারেন—এ রকম একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এটি তাঁদের প্রতিপক্ষ চায়নি। এ জন্য পথের কাঁটা সরানো হলো। এই চার নেতা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন; মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকারের পথচলা শুরু।

বিজ্ঞাপন

৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবে উঠে আসে ১৫ আগস্টের কথা। ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবার নিহত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর ভগ্নিপতি পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং ভাগনে বাকশালের অন্যতম সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি। বোঝা যায়, অভ্যুত্থানকারীদের টার্গেট ছিল একটি পরিবার।

আওয়ামী লীগের এই চার শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হলেন ২৩ আগস্ট। ১৫ আগস্টের পর আট দিন তাঁদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তখন আওয়ামী লীগ ছিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে একটি সরকার, যার মন্ত্রিসভার সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগ তথা বাকশালের। এটা ছিল একটা আধা সামরিক সরকার। এর ওপর ছড়ি ঘোরাত অভ্যুত্থানকারী মেজর-ক্যাপ্টেনরা। ক্যান্টনমেন্টের সেনানেতৃত্ব এটিকে সমর্থন দিলেও বঙ্গভবনের ওপর তাদের পুরো কর্তৃত্ব ছিল না। যদিও বঙ্গভবন পাহারার দায়িত্বে ছিল ৪৬ ব্রিগেডের দুটি কোম্পানি, যার নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল। তাঁর অধীন মেজর খন্দকার আবদুর রশিদ তাঁকে খুব একটা মান্য করতেন না বলে তিনি মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন।

২৪ আগস্ট কে এম সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান করা হয়। সিজিএস খালেদ মোশাররফ আগের পদেই বহাল থাকেন। ১৫ আগস্ট নিয়ে তাঁদের কোনো আহাজারির সংবাদ জানা যায় না। চেইন অব কমান্ড তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে শাফায়াত জামিল তাঁর ব্রিগেড নিয়ে ২ নভেম্বর রাতে অভ্যুত্থান শুরু করেন। ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে বিমানবাহিনীকে না জড়ানোয় বিমানবাহিনীর অনেক কর্মকর্তার মন খারাপ হয়েছিল। এবার তাঁরা সুযোগটি হাতছাড়া করলেন না। ৩ নভেম্বর ভোরে তাঁদের কেউ কেউ আকাশে জঙ্গি বিমান উড়িয়ে অভ্যুত্থানে শরিক হন।

চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার তত্ত্বটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কেননা, শুরুতেই অভ্যুত্থানকারীরা চেইন অব কমান্ড ভাঙেন। তাঁরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করতে চান। অভ্যুত্থানটি ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও ছিল না। তাঁরা মোশতাককে রাষ্ট্রপতি রেখেই খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করার জন্য ৪৮ ঘণ্টা দেনদরবার করেন।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন যে তাঁরা ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ কিংবা বদলা নিতে চেয়েছেন। এ দাবি ধোপে টেকে না। ১৫ আগস্ট দেশের চালচিত্র পাল্টে যায়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চেয়েছেন—এটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। যদি থাকত, তাহলে তাঁরা একটা রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতেন। এ জন্য তাঁদের জেলে আটক চার নেতার দ্বারস্থ হতে হতো। কিন্তু চার নেতা তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে থাকা তো দূরের কথা, ফুটনোটেও ছিলেন না। ৩০ ঘণ্টা পরে তাঁরা জানতে পারেন যে চার নেতা জেলখানায় নিহত হয়েছেন। যাঁদের নিয়ে সরকার গঠন করা হবে, প্রথম কাজটিই হতো তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের বঙ্গভবনে নিয়ে আসার তোড়জোড় করা। চার নেতার কথা তাঁদের মনেই হয়নি। নিহত নেতাদের নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা, আবেগ কিংবা আহাজারি দেখা যায়নি। তাঁদের স্বজনেরা দোয়েল চত্বরের কাছে তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁদের কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নিলে সেটি ভন্ডুল করে দেওয়া হয়।

মোশতাক খুবই চতুর। তিনি কালক্ষেপণ করছিলেন। তিনি সঙ্গে পেয়েছিলেন দুজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে—তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী এবং চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে। তাঁদের উপস্থিতিতে একটা আপস-মীমাংসা হয়। ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের কুশীলবেরা ৩ নভেম্বর রাতে নিরাপদে দেশত্যাগ করেন। দুটি অভ্যুত্থানের কুশীলবেরা ছিলেন পরস্পরের দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহযোদ্ধা এবং প্রতিবেশী। কেউ ‘গৃহযুদ্ধ’ চাননি।

মোশতাক ৫ নভেম্বর পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে স্পিকারের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা। সংবিধানে এটাই বলা আছে। খালেদ-শাফায়াতরা স্পিকারকে না ডেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে তাঁকে দিয়ে দুটি কাণ্ড ঘটান। এক. জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হয়। দুই. বিচারপতি সায়েম হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তিন বাহিনীর প্রধানকে বানানো হয় উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সামরিক আইন প্রশাসকের পদ তৈরি হয়। ১৫ আগস্টের পর সামরিক আইন জারি হলেও মোশতাক সামরিক আইন প্রশাসক হননি। খালেদ-শাফায়াতের মডেলটি ছিল আইয়ুব-ইয়াহিয়ার আদলে একচ্ছত্র সেনাশাসন। তাঁদের মধ্যে আরেকটি মিল পাওয়া যায়। আইয়ুব, ইয়াহিয়া এবং খালেদের অভ্যুত্থান—তিনটিই ছিল ‘রক্তপাতহীন’।

বিজ্ঞাপন

তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, জেলে চার নেতাকে খুন করা হলো কেন? তাঁরা তো জেলে ছিলেন, খালেদ-শাফায়াতের পরিকল্পনায় তো তাঁরা ছিলেন না। তাহলে কি অন্য কোনো মহলের অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল? আমরা জানি ৪ নভেম্বর ঢাকায় বাকশালের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে একটি মিছিল হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাই এ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। মিছিলের আয়োজকেরা তখনো জানতেন না, জেলে চার নেতাকে খুন করা হয়েছে। কোন ভরসায় তাঁরা মিছিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, জেলহত্যার আশঙ্কা বা পরিকল্পনার কথা কি খালেদ-শাফায়াতরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি? সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপের একটি ১৫ আগস্টে এবং অন্যটি ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েনের খবর জানা যায় না। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে মোশতাকের দিকে তর্জনী তুললেও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না।

জেলহত্যাকাণ্ড এখনো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। অনুকূল পরিবেশ পেলে এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যভান্ডার উন্মুক্ত হলে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব।

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

mohi2005@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0