বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেন এমন হলো

স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থার কারণগুলো সবার জানা। তবু আরেকবার উল্লেখ করছি। ১. স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের স্বাস্থ্য খাতে গড় বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশের বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা গড় ব্যয়ের নিচে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই বছর মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে জিডিপির ৯ দশমিক ৪১, ৯ দশমিক ৪, ৫ দশমিক ৮৪, ৩ দশমিক ৭৬, ৩ দশমিক ৫৪, ৩ দশমিক শূন্য ৬ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২. স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি। এমনিতেই বরাদ্দ অপ্রতুল, ব্যাপক দুর্নীতির কারণে জনগণ সীমিত ব্যয়েরও সুফল পাচ্ছে না।

টিআইবির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের অপচয়ের কথা বলা হয়েছে। এটা করা হয়েছে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির পেছনে আছে প্রবল পরাক্রমধারী সিন্ডিকেট, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মহাপরিচালকের দপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, দুর্নীতি দমন কমিশনের ও বিভিন্ন হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা এবং একধরনের সাংবাদিকও এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। ৩. চিকিৎসকদের রাজনৈতিক বিভক্তি। চিকিৎসকদের প্রধান সংগঠন তিনটি; বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন(বিএমএ), আওয়ামীপন্থী স্বাচিপ ও বিএনপিপন্থী ড্যাব। বিএমএ সাধারণত যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে দলের পক্ষ নেয়। এসব সংগঠনে থাকার অনেক সুবিধা রয়েছে। ঢাকার বাইরে বদলি হতে হয় না, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কলেজের অধ্যক্ষ, মহাপরিচালক ও অন্যান্য উচ্চ পদে আসীন হওয়া যায়। অর্থ-প্রতিপত্তি অর্জনের এত সব সুযোগের কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসককেও দেখা যায় পেশাগত দায়িত্ব ভুলে দলাদলিতে সময় ব্যয় করেন। ৪. মানহীন ও লাগামহীন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

অপ্রতুল সরকারি বরাদ্দ ও চিকিৎসা খাতের ব্যর্থতার কারণে পরিবারের নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ বহন করতে হয় বলে বিশ্বব্যাংকের এক ব্লগে জানানো হয়েছে। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো আনাচকানাচে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি—কোনোটাই নেই। হাতে গোনা যে কয়টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আছে, সেগুলোর ব্যয়ভার সাধারণের নাগালের বাইরে। অনেকেই আমাকে বলেছেন, ভারতে একই মানের হাসপাতালে চিকিৎসা, হোটেল, যাতায়াত, এমনকি সেখানে পর্যটন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করলেও তা বাংলাদেশের তুলনায় সাশ্রয়ী। তাই সঠিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা, নিম্ন ব্যয়ের কারণে চিকিৎসার জন্য মানুষ বিদেশমুখী হবে না তো কী হবে?

অসুখ–বিসুখই নিয়তি। এটা বলেকয়ে আসবে না। ক্ষমতার বাইরে গেলেও গুরুতর অসুখ হতে পারে। এসব বিবেচনা করেই ক্ষমতাসীনেরা নিজের স্বার্থেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা (ওয়েকআপ কল) হিসেবে কাজ করবে, এটা আমরা আশা করি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থতা এবং তাঁর চিকিৎসা, দেশে না বিদেশে—এ বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি তাঁর মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকেরা জানান যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর লিভার সিরোসিস শনাক্ত হয়েছে। দেশে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব নয়। কেবল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির বিশেষায়িত হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। এর বিপরীতে, লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বিএনপির চেয়ারপারসনের চিকিৎসা দেশেই সম্ভব বলে জানিয়েছে বিএমএ। সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিপন্থী সংগঠন ড্যাব বলেছে, বিদেশ থেকে চিকিৎসক এনে দেশে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব নয়। চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী জনস্রোত বিএমএর বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে। তা ছাড়া দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল যদি এতই মানসম্পন্ন হবে, তাহলে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীরা কেন হাঁচি, কাশি—সবকিছুতেই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে ছুটে যান?

ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে

এর কারণ হলো, ক্ষমতায় থাকলে চাইলেই হাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স উড়ে আসে, রাষ্ট্রের তহবিল থেকে জরুরি বরাদ্দ পাওয়া যায়। সরকারি বিদেশভ্রমণ কর্মসূচির সঙ্গে চিকিৎসা, চেকআপ একত্র করা যায়। আর ব্যবসায়ীরা তো মুখিয়েই থাকেন সরকারি নেতাদের সেবা প্রদানের জন্য। সিঙ্গাপুরে শিক্ষকতাকালে আমি একবার একজন ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদকে সেখানকার হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম, ব্যবসায়ীরা হাসপাতালটিকে নিজেদের অফিসে পরিণত করেছেন। পালা করে চিকিৎসার দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন! অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে থাকলে মামলা থাকে, জামিন মেলে না, আদালতের শাস্তি থাকে, তাই শত প্রয়োজন হলেও চিকিৎসার অনুমতি মেলে না। চেনা মানুষও অচেনা হয়ে যায়, সাহায্য-সহায়তা পাওয়া তো দূরের কথা।

আলোচনা লঘু করার জন্য একটা গল্প বলি। স্বাধীনতার পর এক বিরোধী নেতা কারান্তরীণ ছিলেন। কারাগার পরিদর্শনকালে সরকারের মন্ত্রী বিরোধী নেতাকে দেখতে যান। তখনো রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ ধরনের সংস্কৃতি ও সৌজন্যবোধ ছিল। তখন ছিল গরমকাল। কুশল জিজ্ঞাসা করলে অন্তরীণ বিরোধী নেতা বলেন, ‘ভালোই আছি। তবে গরমটা একটু বেশি। আমরা ক্ষমতায় থাকাকালে কারাগারে ফ্যান লাগিয়েছিলাম। এতে কাজ হচ্ছে না। তোমরা এখানে আসার আগে এসি লাগিয়ে নিয়ো!’

প্রতিবছর সাত লাখ বা তার বেশি বাংলাদেশি দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে। তাই বর্ষীয়ান সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাত লাখের একজন হিসেবে দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করলে তাতে কার কী ক্ষতি? এমন তো নয় যে এর আগে সাজাপ্রাপ্ত কোনো রাজনীতিবিদ বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করেননি।

অসুখ–বিসুখই নিয়তি। এটা বলেকয়ে আসবে না। ক্ষমতার বাইরে গেলেও গুরুতর অসুখ হতে পারে। এসব বিবেচনা করেই ক্ষমতাসীনেরা নিজের স্বার্থেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা (ওয়েকআপ কল) হিসেবে কাজ করবে, এটা আমরা আশা করি। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারি হাসপাতালগুলোকেই গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবেশী ভারতে সরকারের শীর্ষ নির্বাহীরা অসুস্থ হলে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে ভর্তি হওয়ার খবর শুনি। যখন বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ দেখতে পাবে দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা বিদেশে না গিয়ে বিএসএমএমইউ বা অনুরূপ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন, তবেই বিদেশে চিকিৎসাগামী জনস্রোত বন্ধ করা যাবে, অন্যথায় নয়।

সামনের পথ

ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের কাজটি সহজ নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে আমরা আজকের অবস্থায় উপনীত হয়েছি। তাই এখন আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে ও দুর্নীতি কমাতে হবে। চিকিৎসকদের দলাদলি ও ক্ষমতাসীন ও রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত পেশাদারদের বিএসএমএমইউ ও স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনতে হবে। বেসরকারি খাতের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেবার মান নিশ্চিত এবং এসব হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে তা ভারতের সমমানের প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি হয়। কাজগুলো দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ হলেও কাজটি শুরু করতে হবে এখনই। না হলে অচিরেই বিদেশে চিকিৎসাপ্রার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ও ব্যয় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা বিষয়ে কিছু বলে লেখাটি শেষ করতে চাই। জনান্তিকে বলে রাখি, দলীয় রাজনীতি আমার আগ্রহের বিষয় নয়। আগেই বলেছি, প্রতিবছর সাত লাখ বা তার বেশি বাংলাদেশি দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে। তাই বর্ষীয়ান সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাত লাখের একজন হিসেবে দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করলে তাতে কার কী ক্ষতি? এমন তো নয় যে এর আগে সাজাপ্রাপ্ত কোনো রাজনীতিবিদ বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করেননি। বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন