বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

চিলমারী নদীবন্দর বিলটি বেশ কিছুদিন আগে একনেকে পাস হয়েছে। বিলটি পাসের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আব্বাসউদ্দীনের বিখ্যাত ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’ গানটি গেয়ে শোনান। বন্দরটিতে তিন লাখ যাত্রী ও দেড় লাখ টন মালামাল ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। বন্দরটি বাস্তবায়ন করবে বিআইডব্লিউটিএ। ভারত, নেপাল, ভুটান ছাড়াও পায়রা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে পণ্য আনা-নেওয়ায় ব্যবহার করার কথা আছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

নকশায় এ বন্দরকে পাঁচটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। সামান্য এ বাজেট দিয়েই স্টেশন হবে চিলমারীর রমনা ঘাট, জোড়গাছ ঘাট, নয়ারহাটচরে আর রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায়। প্রতিটির জন্য চ্যানেল খনন করতে হবে, তীর সংরক্ষণ করতে হবে। মূল স্টেশন থাকবে জোড়গাছে, যার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হবে ৭ দশমিক ৫ একর, আর রমনা রেলস্টেশন-সংলগ্ন রমনা ঘাটে।

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রমনা রেলস্টেশন যেখানে চিলমারী বন্দরের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা, সেখানে তা বাদ দেওয়ার রহস্য কী? কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের তকমাযুক্ত রাখলে লাভ কার?
default-image

বন্দরের মূল স্থাপনা জোড়গাছে, যেখানে কার্গো ভিড়বে, পণ্য ওঠানো-নামানো করা হবে। অথচ বন্দরের এই অংশের সঙ্গে রেল সংযোগ নেই। নেই চলাচলের উপযুক্ত সড়ক। নেই অবকাঠামো নির্মাণের উপযুক্ত জায়গাও; অথচ বন্দরসংলগ্ন রেলের জায়গায় অবৈধভাবে বালু রাখার পয়েন্ট, বিশাল দিঘি আর স্থাপনা। আর পতিত রয়েছে রমনা রেলস্টেশনের বিস্তীর্ণ ভূমি। যেখানে ব্রিটিশরাই রেলস্টেশন করে গেছে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে, সেখানে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রেলস্টেশনটিকে পণ্য আনা-নেওয়া থেকে বাদ দেওয়া হলো।

অন্যদিকে সিসি ঢালাই দিয়ে রমনা ঘাট পর্যন্ত যে শক্তিশালী সড়ক বানানো হয়েছে, তা কি বালুর অবৈধ ব্যবসার কাজেই লাগবে? হাজার কোটি টাকায় ফ্লাইওভার করার পর আমরা নকশার ভুল দেখতে পাই। আমলাদের সরল বিশ্বাসে জনগণের অর্থ গচ্চা যায়। আর কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি ওঠে কার?

৩.

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মালবাহী ট্রেন ২১০টি ৫ টনের ট্রাকের সমান মালামাল পরিবহনে সক্ষম। তা ছাড়া একই পরিমাণ ট্রাফিক ইউনিট পরিবহনে রেল ও সড়কপথের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ি ৮ দশমিক ৩ গুণ এবং ট্রাক ৩০ গুণ পরিবেশ দূষণ করে। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য ২৫ ভাগ দায়ী হলো যানবাহন, প্রধানত ছোট ছোট গাড়ি। তা ছাড়া টন/কিলোমিটারের হিসাবে নৌপথে যেখানে খরচ হয় ২৫ টাকা, রেলপথে ৮৫ টাকা, সড়কপথে তা ২১৭ টাকা।

রেলওয়ের অবকাঠামো নির্মাণ ও যাবতীয় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ রেল কর্তৃপক্ষই করে। অন্যদিকে সড়কপথ ব্যবহারকারীরা সড়ক নির্মাণ ও মেরামত খাতে কোনো ব্যয় করে না। আরেক দিকে সরকার সড়ক বিভাগের বিনিয়োগের ওপর টাকায় ৩৫ পয়সা ও রেলওয়ে ৬৫ পয়সা আদায় করে। অর্থাৎ সরকার তার খরচের সড়কপথ থেকে ফেরত পায় ৩৫ ভাগ আর রেলপথ থেকে ৬৫ ভাগ। কনটেইনারবাহী একটি ট্রেন থেকে আয় হয় যাত্রীবাহী ট্রেনের চেয়ে ৪ গুণ। ঢাকা-চট্টগ্রামে জনপ্রিয় ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসে দৈনিক আয় হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। আর ওই রুটে একটি কনটেইনার ট্রেন থেকে হয় ছয় লাখ টাকা।

২০০২-০৩ সালে করা বেসরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, রেলের দুর্ঘটনা ৫২৪টি। সড়কপথে দুর্ঘটনা ৮ হাজার। তবে রেলের এই দুর্ঘটনাও রেলের নয়। এর মূল কারণ যেখানে-সেখানে ক্রসিং নির্মাণ। তা ছাড়া সড়কপথে টোলসহ নানান খরচ যুক্ত হয়ে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। মোটকথা, পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ, কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানো, নিরাপত্তা ইত্যাদি মিলে পরিবহনের ব্যয় সড়কপথে অনেক, যার প্রভাব পড়ে পণ্যের মূল্যে। এতে গরিবের ভোগান্তি বাড়ে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেই কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থায় মূল চালিকা শক্তি হলো রেল।

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রমনা রেলস্টেশন যেখানে চিলমারী বন্দরের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা, সেখানে তা বাদ দেওয়ার রহস্য কী? কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের তকমাযুক্ত রাখলে লাভ কার?

নাহিদ হাসান রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন