default-image

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি যে ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দেওয়া বক্তব্যে সেটি সম্ভবত সবচেয়ে সহজভাবে খোলাসা হয়েছে, ‘তুমি হয় আমাদের পক্ষে, নয়তো বিপক্ষে’। আমেরিকা মনে করে, সে নেতৃত্ব দেবে, মিত্ররা তাকে অনুসরণ করবে এবং আমেরিকার বড়ত্বের বিরোধিতাকারীদের ওপর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন আর আগের মতো কোনো শত্রুপক্ষ নেই, আগের মতো বিরাট কোনো মিত্রবাহিনীকে তার নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে না। সে কারণেই এখন চীনের মতো বড় বড় শক্তির সঙ্গে টক্কর লাগানোর চেয়ে তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপনেই দেশটি বেশি লাভবান হতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

সন্দেহ নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একজন কৌতুকময় ব্যঙ্গচিত্রের প্রতিভূ ছিলেন। তিনি অন্য দেশগুলোকে তাঁর নীতি মানতে বাধ্য করার জন্য যাঁকে–তাঁকে অপমান করতেন, হুমকি–ধমকি দিতেন, একতরফা শুল্ক আরোপ করতেন এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিতেন। বহুপক্ষীয় নীতি বলে যে একটা ব্যাপার আছে, সেটিকেই তিনি উপড়ে ফেলেছিলেন। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে ট্রাম্পের এ একগুঁয়ে পররাষ্ট্রনীতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাধার মুখে পড়েনি। ট্রাম্পের চীনবিরোধিতার নীতিকে মার্কিনরা বিরোধিতার তুলনায় সমর্থনই বেশি দিয়েছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর একতরফাভাবে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার পরও ট্রাম্পের সেই নীতির বিরুদ্ধে মার্কিনরা অবস্থান নেয়নি।

ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করলে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিকে ঐশ্বরিক বলা যেতে পারে। বাইডেনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরে গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে যুক্তরাষ্ট্র ফিরতে চায় এবং ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের করা যে চুক্তি থেকে ট্রাম্প বেরিয়ে গেছেন, বাইডেন সেই চুক্তিতে ফেরত যাবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এগুলো অনেক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এরপরও বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে যেসব ঘোষণা রয়েছে তা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দেয় না। তবে সম্প্রতি বাইডেন মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে যে ভাষণ দিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রশাসনের শুরুর দিনগুলোর সম্ভাব্য করণীয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনটি চিন্তার বিষয় আছে।

প্রথমত, বাইডেন জেতার পর ‘বিশ্বনেতা হিসেবে আমেরিকা ফিরে এসেছে’—এমন একটি সরল ধারণা এখন সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র সবে বহুপক্ষীয় নীতিতে ফিরতে শুরু করেছে। কোভিড-১৯ মহামারিকে সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করা শুরু করেছে। এবং এই ২০ জানুয়ারির আগেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ট্রাম্প আমেরিকার বুকে যে ক্ষত তৈরি করে গেছেন, তার চিকিৎসা শুরু করতে এখনো বাকি আছে। সাড়ে সাত কোটি আমেরিকান ভোটার কেন ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন, তা–ও বাইডেন প্রশাসনকে বোঝার চেষ্টা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আগামী দিনগুলোতে বাইডেন কী নীতি অনুসরণ করবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

দ্বিতীয়ত, বাইডেন ওই ভাষণে বলেছেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারি সম্পর্ক একুশ শতকের লক্ষ্য পূরণের মূল ভিত্তি। কিন্তু আসলেই কি তাই? শুধু ইউরোপের সঙ্গে জোট বেঁধে একুশ শতকের লক্ষ্য পূরণের শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে?

উত্তর আটলান্টিকভিত্তিক সংগঠন ন্যাটো জোট আমেরিকার ‘সব আশা পূরণের’ সক্ষমতা রাখে না। বরং বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধির মতো কাজ করছে এই সংগঠন, যার সঙ্গে ট্রাম্পের নীতির সাযুজ্য আছে।

বিজ্ঞাপন

তৃতীয়ত, বাইডেনের দাবি, বিশ্ব এখন কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্রের মতাদর্শিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। তিনি বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের অবশ্যই নিজেদের তৈরি থাকতে হবে।’ ভারতীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারকে রুখে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে হবে বলেও তিনি তাঁর ভাষণে বলেছেন।

বাইডেনের এ দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘ মেয়াদে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে, তা চূড়ান্ত বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেই যাবে। কারণ, চীনের দিক থেকে এ ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য সাধারণত দেওয়া হয় না। গত জানুয়ারিতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বহুপক্ষীয় সহযোগিতামূলক পররাষ্ট্রনীতির দিকে জোর দিয়েছেন। তিনি সব দেশের পারস্পরিক সহযোগিতাভিত্তিক বিশ্ব উন্নয়নের দিকে জোর দিয়েছেন। তিনি সবাইকে একযোগে কাজ করে সবার স্বার্থ সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এতে বাইডেনের তুলনায় সি চিন পিংয়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাধারা প্রকাশিত হয়েছে। এটি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আমেরিকান রক্ষণশীলরা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপনকে ভীরুতা বলে মনে করে। কিন্তু আদতে মোটেও তা নয়। এ ধরনের সম্পর্ক হলে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই উপকৃত হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদের প্রসার ঘটিয়ে জাতিকে যেভাবে বিভক্ত করে দিয়ে গেছেন, সেই বিভক্তির ফাটল জুড়ে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতামূলক নীতিতে যেতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জেফরি ডি স্যাক্স: কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির টেকসই উন্নয়ন বিষয়ের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন