বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কয়েকদিন ধরে গোপালগঞ্জে এমন তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া ইস্যুতে সবার মনোযোগ এখন দেশের বাইরে, ফলে বশেমুরবিপ্রবিতে এতসব ঘটনা আলোচনার বাইরেই থেকে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করল, সেগুলোও তেমন সাড়া ফেলল না। একের পর এক এত ঘটনায় প্রশাসনও পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ।

ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে দায়ী করার ‘সংস্কৃতি’ এখনো আমাদের সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। ফলে ধর্ষণের ঘটনার তুলনায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভের নজির একেবারে নগণ্যই বলা যায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান কিছুটা ভিন্ন, সেখানেই ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী সংগঠিত আন্দোলন আমরা দেখতে পাই। তারুণ্যের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সেখানে সোচ্চার থাকাটাই স্বাভাবিক। সহপাঠী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে তেমনই ফুঁসে উঠেছিলেন বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেটি কেন স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধে জড়াল, এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বললাম। যাতে বোঝা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি স্থানীয় লোকজনের আগে থেকেই বিদ্বেষী মনোভাব এ ঘটনাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে।

default-image

প্রথম আলোর স্থানীয় প্রতিনিধি জানান, ১০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হলেও চাহিদা অনুসারে গড়ে ওঠেনি আবাসনব্যবস্থা। প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র ৪টি আবাসিক হল। তিন-চার হাজার ছাত্রীর জন্য মাত্র দুটি হল, সেখানে থাকতে পারেন মাত্র ৭০০-৮০০ জন। অন্যদিকে ছেলেদের জন্য মাত্র দুটি হলে থাকতে পারেন দুই থেকে আড়াই হাজার জন। ফলে বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে থাকতে হয় পৌরসভা শহরসহ ক্যাম্পাসের পাশের এলাকাগুলোর বাসাবাড়িতে মেস ভাড়া করে।

মূলত এখান থেকেই সমস্যার শুরু। স্থানীয় লোকজন কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘মুক্ত চলাফেরাকে’ ভালো চোখে দেখেনি। ছেলেমেয়ের একসঙ্গে চলাফেরা মানে তাদের কাছে ‘সমাজের পরিবেশ নষ্ট’ হয়ে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারণে তাদের ছেলেমেয়েরাও ‘খারাপ’ হয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণাই সেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। আমার জানা মতে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধ কমবেশি এখনো আমরা দেখতে পাই।

স্থানীয় লোকজন কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘মুক্ত চলাফেরাকে’ ভালো চোখে দেখেনি। ছেলেমেয়ের একসঙ্গে চলাফেরা মানে তাদের কাছে ‘সমাজের পরিবেশ নষ্ট’ হয়ে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারণে তাদের ছেলেমেয়েরাও ‘খারাপ’ হয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণাই সেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। আমার জানা মতে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধ কমবেশি এখনো আমরা দেখতে পাই।

বিভিন্ন বাসাবাড়িতে থাকা ছাত্রীদের চলাফেরা করতে গিয়ে প্রায়ই স্থানীয় লোকদের টিজিংয়ের শিকার হতে হয়। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার ছোটখাটো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সেসবের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিষয়টি ধর্ষণের পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। নবীনবাগে মেসে থাকা এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে এমনটাই জানান।

গত মঙ্গলবার গোপালগঞ্জেরই সন্তান ও ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক সাঈদ জুবেরী জানালেন, পরিস্থিতি এমন যে রাত ৯টা-১০টার সময়ও যদি বশেমুরবিপ্রবির কোনো ছাত্রী ক্যাম্পাস থেকে খুব দরকারে বের হয়ে যে নিরাপদে ফিরবেন, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আর বিপদে পড়লে মানে আক্রান্ত হলে আপামর গোপালগঞ্জবাসীর প্রথম কথা—সে এত রাতে বের হয়েছিল কেন? মজার কথা হলো, এক এলাকাবাসীকে জিজ্ঞাসা করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের সমস্যাটা কী? তাঁর উত্তর ছিল এমন—‘চিন্তা করেন ফকিন্নির পোলা, বিড়াল কান্ধে নিয়ে হাফপ্যান্ট পইরা দোকানে এসে বিড়ালের জন্য বলে, মামা একটা বিস্কুট দেন তো! এটা তো ঢাকা না!’

মূলত পৌরসভার নবীনবাগ এলাকাবাসীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এ বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে আলটিমেটাম দিয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। এতে দুই পাশে ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়ে কয়েকশ গাড়ি আটকা পড়লে অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক ও এসপি হাজির হলেও তারা শিক্ষার্থীদের এমন কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি, যাতে অন্তত মহাসড়ক অবরোধ থেকে তারা সরে আসে। উপরন্তু জেলা প্রশাসক ও এসপি অবরোধ স্থান থেকে চলে যাওয়ার ২০ মিনিটের মাথায় গোপালগঞ্জের স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা সেখানে হাজির হয়ে ঘোষণা দেন, যারা রাস্তা ছেড়ে দেবে না তারা সবাই শিবির। এরপরেও শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থানে অটল থাকলে তাদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। সেখানে জড়িয়ে পড়ে এলাকাবাসীও। হামলার শিকার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি দোকান ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে। ফলে বিরোধ আরও চরম রূপ ধারণ করে।

প্রশাসনের কর্তারা যাওয়ার পরপর ছাত্রলীগের হামলায় প্রশাসনের ইঙ্গিত ছিল বলেই মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। ঘটনাস্থলে থাকা এক সাংবাদিক মুঠোফোনে জানান, পুরো ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশকে একেবারে নীরব ভূমিকায় দেখা গেছে। পুরো এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্র হয়ে গেছে, প্রশাসনের সেখানে কিছুই করার নেই যেন! শিবির ট্যাগ দিয়ে ছাত্রলীগের হামলার ভিডিও থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সেই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এখন শুধু ধর্ষণের না, ছাত্রলীগ ও স্থানীয় লোকজনের হামলার বিচার নিয়েও সোচ্চার শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীকেই দোষারোপ করা হচ্ছে আশপাশের এলাকায়। ফলে আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান হয়ে যায়, স্টপ ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ নয়।

default-image

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, দ্রুত ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করা ও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা। ফলে প্রথমে পুলিশ দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও এক কিশোরকে আটক করে। যদিও হরিজন সম্প্রদায়ের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা নির্দোষ। প্রতিবাদে হাসপাতালের সামনে ময়লা ফেলার ঘটনা তো আগেই উল্লেখ করলাম। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে র‌্যাব ছয়জন বখাটেকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাবের বক্তব্য, তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রী উত্ত্যক্ত, মাদক সেবন, ছিনতাইয়ের অভিযোগ আছে, থানায় মামলাও রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি অনুসারে তাদের পরিচয় ও ছবিও প্রকাশ করা হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগে ধর্ষক যেহেতু ৫-৬ জন ছিলেন, কিন্তু আটক করা হলো ৮ জনকে এবং তাদের ধর্ষক হিসেবেও পরিচিত করা হলো, এতে এলাকাবাসী স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ হওয়ারই কথা। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ধর্ষক বানিয়ে দেওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তারা, পক্ষান্তরে র‌্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধেও আঙুল তুলেছে।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে আরও বেশি কোণঠাসা ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে থাকা ছাত্রছাত্রীরা বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছে। এমনকি এক রাতে ৪০ জনের মতো ছাত্রছাত্রী নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে বিভিন্ন মেস থেকে ক্যাম্পাসে চলে আসতে বাধ্য হন। তাঁদের অভিযোগ, সারা রাত মেসের বাইরে টহল দিচ্ছিল এক দল যুবক। সামনে কাউকে পেলে ফোন চেক করা হচ্ছিল। অশ্লীল ভাষায় কথাবার্তা ও ইঙ্গিতও ছিল। দোকানে গেলে এমনটাও শুনতে হয়, এত রাতে কোনো মেয়ে বের হলে আর ছেলেবন্ধু নিয়ে ঘুরলে তো ধর্ষণ হবেই। চায়নিজ কুড়ালসহ নানা ধরনের ধারালো অস্ত্র নিয়ে দিনে রাস্তায় স্থানীয় লোকজনের টহলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা হামলা করতে আসছে, এমন গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় সেখানে।

এমন জটিল পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের মিলে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল। দুঃখজনক হচ্ছে, তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শঙ্কিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার হারসহ নানা দিকে পিছিয়ে থাকা এলাকাবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে যে ‘সাংস্কৃতিক’ ও ‘মানসিক’ দূরত্ব সেটি ঘোচানো না গেলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট নিরসন করা হোক। আরও বেশি হল তৈরি করে ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়তে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীরাও ধর্ষণের বিচারের দাবিতে প্রতিবাদে নেমেছেন। তারাও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জাজনকই বটে।

গত বুধবার শিক্ষার্থীরা ৭২ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছে। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার চায় তারা। দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ নেবে, সেই আশাই করছি।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন