default-image

কখনো কখনো মানুষের সৃষ্ট বিপর্যয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে আরও বেশি ভয়াবহ হতে দেখা যায়। সামাজিক অজ্ঞতা, অসাবধানতা, অনুপযুক্ত কৌশল এবং সঠিক কারিগরি দক্ষতার অভাবে দেশকে গত কয়েক দশকে বেশ কিছু জাতীয় দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে, যা যথাযথ সঠিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যেত। ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশন পথটি বন্ধ হয়ে গিয়ে বৃষ্টির পানি ছাদে জমার কারণে ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের টিভিকক্ষের ছাদ ধসের ঘটনায় ৩৯ জনকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। অপর্যাপ্ত নিরাপত্তার কারণে ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে অনুপযুক্ত নকশা ও নির্মাণকৌশলের ফলে রানা প্লাজা ধসে গিয়ে ১ হাজার ১৩৪ জনের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এগুলো আমাদের দেশের জীবনের কয়েকটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনামাত্র। সময়োপযোগী সতর্কবাণী, সঠিক ও অভিজ্ঞ কারিগরি দক্ষতায় ভবন নির্মাণ এবং যথোপযোগী ব্যবহার দালান কাঠামোতে দুর্ঘটনা রোধ হতে পারে। 

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ঋতুভিত্তিক সবজি, বছরব্যাপী ফল এবং ফুলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করা হয়। এসব চাষাবাদের জমিগুলো বাসস্থান থেকে দূরে এবং বাসিন্দাদের থেকে পৃথক হয়। শহরের কাছাকাছি বসতি এলাকাগুলোতে এবং ছোট শহরগুলোতে খুব অল্প পরিসরে ঋতুভিত্তিক সবজি, ফল এবং ফুলের চাষাবাদ করা হয়। বর্তমানে ছাদকৃষি দেখা যাচ্ছে ছোট শহরগুলোসহ ঢাকা শহরে, পাশাপাশি সরকারি ভবনগুলোর ছাদে, স্কুলে, গার্মেন্টস কারখানা এমনকি হাসপাতাল ভবনে। এই ছাদকৃষির প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে ফরমালিনমুক্ত ঋতুভিত্তিক সবজি ও বছরব্যাপী ফল পাওয়া।

বর্তমানে ছাদকৃষির জন্য কোনো আইন বা কোনো ধরনের নিয়মনীতি নেই। এমন অনেক মৌলিক কারণ রয়েছে যেগুলো এখনো বিবেচিত হয়নি যেগুলো অন্তর্ভুক্ত কিন্তু সীমাবদ্ধ নয়। ছাদের কাঠামোগত দুর্বলতা, ভবনের কাঠামো, বাড়তি ভার গ্রহণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তরের ধারণক্ষমতা, চাষের স্থান থেকে রাস্তায় বর্জ্য ও জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন পদ্ধতি, চাষাবাদের জন্য ওয়াসা থেকে ব্যবহৃত পানি, কৃষি-শিল্প এবং এর শ্রমিকদের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি। ছাদকৃষির নেতিবাচক এবং ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তারের আগেই যদি এগুলো বিবেচনা না করা হয় তবে এটার কারণে ভবনধস, সম্পত্তির ক্ষতিসহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবজীবন নাশ হতে পারে।
এই ছাদকৃষি পরিবেশ, ভবন এবং আশপাশে বসবাস করা বাসিন্দাদের ওপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে, তা এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে।

১) কাঠামোগত দুর্বলতা: ছাদকৃষির কারণে ছাদে যেসব বাড়তি ভার সংযোজন করা হয়, যেমন চাষের মাটি, কম্পোস্ট, গাছ, ঝোপ, ফুল, সবজির বেড, ফলের গাছ এবং বাগানের সবজি, ফল ইত্যাদির জন্য তৈরি অস্থায়ী কাঠ, বাঁশ ও ইস্পাত কাঠামো থেকে, যেগুলো এসব ভবনে স্থাপিত করা হয়। এ ছাড়া বাগানের জন্য কংক্রিটের বক্স, জালের জন্য অস্থায়ী স্থাপনা, সবজি চাষের জন্য পোস্ট ও ফ্রেমের স্থাপন এবং মাছের চাষ ও হাঁস-মুরগি পালনের জন্য অন্যান্য স্থাপনাও সংযোজন করা হয়। যখন অতিরিক্ত ভার একটি ভবনে স্থাপন করা হয়, যা ভবনের নকশায় ছিল না, তখন ভবনটির ভার ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি হতে পারে, যার কারণে মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এটির কারণে ছাদ ধস, ভবনের স্থাপনা এবং ফাউন্ডেশন ধস নামতে পারে। এর কারণে ভবনের সামগ্রিক কাঠামোতে ধসের ফলে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি প্রতিবেশী ভবনগুলোও গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিদ্যমান ভবনগুলো অতিরিক্ত ভার বহনের জন্য ডিজাইন করা হয়নি। কারণ বিএনবিসিতে এই ধরনের অতিরিক্ত ভার বহন নিয়ে কোনো বিধান নেই, যা নকশা পেশাদারের মাধ্যমে বিবেচিত হয়।

২) ওয়াসার সরবরাহ করা পানি এবং বর্জ্যমিশ্রিত পানি নিষ্কাশনের ওপর প্রভাব: ছাদকৃষিতে সরবরাহ করা অতিরিক্ত পানি এবং নিষ্কাশিত বর্জ্যমিশ্রিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অবকাঠামো তৈরির আগেই গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করতে হবে। ঢাকায় পানি সরবরাহ, নিষ্কাশন ও স্যানিটেশন/স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালনা করার প্রধান সংস্থা হচ্ছে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথোরিটি বা ওয়াসা। ছাদকৃষিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত পানি অন্য কোনো বিকল্প সরবরাহ মাধ্যম না পাওয়া পর্যন্ত ওয়াসার থেকে সরবরাহ করতে হবে। এটি ওয়াসার পানির ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি করবে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাবে এবং এর ফলে নির্বিশেষে সব বাসিন্দার জন্য পানির দাম বেড়ে যাবে। এটি ঢাকার নিম্ন, মধ্যম ও অন্যান্য সীমিত আয়ের জনসংখ্যার ওপর বহুলাংশে প্রভাব ফেলবে। অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা এই ছাদকৃষির সুবিধাভোগী না হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের এই অতিরিক্ত প্রতি গ্যালন পানির খরচ বহন করতে হবে। উপরন্তু, ছাদ থেকে বর্জ্যমিশ্রিত পানি ছাদের পানি নিষ্কাশন পথের মাধ্যমে বের হয়ে যাবে, যেটা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি, বর্জ্যমিশ্রিত পানির জন্য নয়। এই বর্জ্যমিশ্রিত পানির সঙ্গে কীটনাশক (স্প্রে থেকে পাওয়া), সারযুক্ত মাটি, এবং হাঁস-মুরগির বর্জ্য, মাছের বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি বহন করে আনে। এই বর্জ্যসহ নিষ্কাশিত পানি প্রথমে রাস্তায় পড়ছে এবং পরে হয়তো ওয়াসার নর্দমা দিয়ে চলে যাচ্ছে। রাস্তায় পড়া এই বিষাক্ত বর্জ্যমিশ্রিত পানি ঢাকাবাসীর জন্য বিভিন্ন অসুখের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

৩) ‘গ্রিন এনার্জির’ প্রয়োজনীয়তার ওপর প্রভাব: ‘গ্রিন এনার্জির’ আওতায় সরকারি নির্দেশনায় বহুতল ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপিত করা হয়েছে। ছাদকৃষি এসব সৌর প্যানেলের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ছাদকৃষির ফলে ছাদের সৌর প্যানেল ব্যবহার ক্রমান্বয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। যদি কোনো বহুতল ভবনের মাত্র একটি সাধারণ ছাদ থাকে, এবং সেটি যদি ছাদকৃষির জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে এটির অন্যান্য ব্যবহার এবং বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে যাবে।

৪) পরিবেশের ওপর প্রভাব: যদিও ছাদকৃষি অনেক কৃষি সামগ্রী সরবরাহ করবে, তবে খামার ও মাছ চাষ প্রতিবেশী ভবনের বাসিন্দাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। শাকসবজি, গাছপালা, পশুপাখি ও মাছ রোগজীবাণু বহন করবে। ঢাকা শহরের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ আটকা এলাকায় রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। জৈব ও অন্যান্য সারের ব্যবহার, পাখির বিষ্ঠা এবং মাছের বর্জ্য ঘনবসতিপূর্ণ আটকা এলাকা, যেখানে প্রাকৃতিক বায়ুর সঞ্চালন সীমাবদ্ধ, সেখানকার আশপাশের জনবসতির জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। অ্যামোনিয়ার মতো গ্যাস এবং চাষাবাদে ব্যবহৃত অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য যেমন পোকামাকড় বিতাড়ক ও কীটনাশক মানুষের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনে যাঁরা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত। এটি শহরের জীবনযাত্রা এবং বেঁচে থাকার সুষ্ঠু পরিবেশের ওপর নেতিবাচক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে।

৫) ঘূর্ণিঝড় এবং তীব্র বাতাসের সময় প্রভাব: বাংলাদেশ একটি গ্রীষ্মপ্রধান দেশ এবং ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র বাতাস এ দেশের জন্য খুবই সাধারণ বিষয়। প্রাথমিকভাবে ঋতুভিত্তিক সবজি ও ফুল ছাদ ও বারান্দায় চাষ করা হয়। কিন্তু ছাদকৃষিতে বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ যেগুলো ২০-৩০ ফুটের মতো লম্বা এবং প্রশস্ত ঝোপের মতো হয় বর্ধিত হয়, যেমন: আম, কলা, লিচু ইত্যাদি। অনেক মালিক ওই ধরনের গাছ লাগানোর জন্য কংক্রিটের পরিবেষ্টন তৈরি করেন, যা কয়েক ফুট উঁচু হয় এবং মাটি, গোবর, সার ও কম্পোস্ট দিয়ে পূর্ণ থাকে।এর পাশাপাশি অনেক মালিক ছাদের ওপর পশুর খামার ও জলীয় কৃষি আরম্ভ করেছেন, যার জন্য ছাদে মাছ এবং পানির ট্যাংক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো যেকোনো ভবনের কাঠামো ও ভিত্তির জন্য উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ভার। এই ফলের গাছগুলোর মধ্যে কিছু গাছকে মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত শিকড় বিস্তৃত করার প্রয়োজন হয় অবাধে দাঁড়ানো এবং ঘূর্ণিঝড় ও প্রবল বাতাসের সময় পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করার জন্য। কিন্তু এই ফলগাছের জন্য তৈরি ছাদের এই অগভীর মাটির বেডগুলো প্রবল বাতাসের সময় গাছগুলোকে নিজ স্থানে আটকে না-ও রাখতে পারে। এর ফলস্বরূপ গাছগুলো উপড়ে পড়ে ভবনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী ভবনের ধ্বংস হতে পারে, পড়তে পারে বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য তার, কাছাকাছি যানবাহন ও পথচারীর ওপর এবং ঘটতে পারে সম্পদ নাশসহ প্রাণহানির মতো ঘটনা। এই একই ঘটনা ঘটতে পারে ছাদ কৃষিতে ব্যবহৃত অস্থায়ী বাঁশের ধারক, জাল, সংযোজিত অতিরিক্ত সহায়ক, পাত্র এবং অন্যান্য অনিরাপদ সরঞ্জামের জন্য।

৬) কৃষকদের ওপর আর্থিক প্রভাব এবং পরিণতি: ছাদকৃষি গ্রামের কৃষকদেরও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। উৎপাদিত বেশির ভাগ পণ্যই বিশেষ করে মৌসুমি সবজি ও বছরব্যাপী ফল এসব গ্রাম থেকেই আসে। অনেকের জন্য, এই মৌসুমি সবজি প্রধানত দুটি বার্ষিক ফসলের মধ্যবর্তী স্বল্প সময়ে চাষাবাদ করা হয়, যা কৃষকদের বেঁচে থাকার জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস। সাধারণত সচ্ছল আয়ের পরিবারের সদস্যরাই এই পণ্যগুলোর ভোক্তা। এই সচ্ছল আয়ের পরিবারের মধ্যে যাঁরা বহুতল ভবনের মালিক, তাঁরা নিজস্ব ছাদে চাষ করছেন ঋতুভিত্তিক সবজি, ফুল ও ফলের বাগান। কারণ তারা ছাদকৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিতে সক্ষম। যদি তারা এখন ‘নাগরিক ছাদ কৃষক’ হয়ে ওঠেন, তাহলে তাঁরা আর বাজার থেকে এই উৎপাদিত মৌসুমি পণ্য আর কিনবেন না। এটি বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে উৎপাদিত হতে থাকলে সবজির কৃষি বাজার সংকুচিত করবে, ফলে উৎপাদন কমে যাবে, বিক্রয়মূল্য বেড়ে যাবে এবং সীমিত আয়, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। এর কারণে গ্রাম এবং গ্রামীণ কৃষকেরা সবজি উৎপাদনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যাঁদের অনেকেই তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল, ফলে তাঁদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এর ফলে কৃষিভিত্তিক একটি বিশাল শ্রমিক সম্প্রদায় কর্মহীন হয়ে যেতে পারে এবং তৈরি হবে সামাজিক আর্থিক ভারসাম্যহীনতা, যার প্রভাব পড়বে ঢাকার বাজার এবং উৎপাদকদের ওপর। এই পেশার সঙ্গে জড়িত তরুণ কর্মক্ষম যুবক যাঁরা এই ব্যবসার উৎপাদক থেকে শেষ ব্যবহারকারী, তাঁরা এর ফলে প্রবলভাবে প্রভাবিত হবেন এবং হতাশার কারণে সামাজিক অবক্ষয় হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে সরে আসবেন।
যদি কর্তৃপক্ষ কোনো আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ভবনের বর্তমান অবস্থায় ছাদের ওপর ছাদকৃষি করার অনুমতি দেয়, সে ক্ষেত্রে এখানে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হলো:
১। সঠিক পরিকল্পনা এবং নিয়মনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ছাদকৃষির পরিবর্তে ছাদে সীমিত আকারে বাগান করার অনুমোদন দিয়ে নতুন আইন তৈরি করে তার যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ক) এই আইনের মধ্যে যেসব গাছ চাষ করার অনুমতি আছে, সেগুলোর সীমিত তালিকা থাকতে হবে। কোন কোন প্রজাতির গাছ এবং ঋতুভিত্তিক সবজি চাষ করা যাবে, তার তালিকা করা শ্রেয়। এই আইন লেখার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগীয় দপ্তরের প্রতিনিধি এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমজীবী এবং পেশাজীবীদের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে এবং এই ধরনের নকশা প্রণয়নের পর দালান অনুমোদন কর্তৃপক্ষকে সঠিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
খ) সরকারি উপযুক্ত বিভাগের অনুমোদন/সংজ্ঞা অনুযায়ী, গাছের বয়স এবং উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
গ) মাটি, সার, রাসায়নিক ও কীটনাশকের গুণমান ও ধরন আইনের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যাতে এটি সীমিত আবাসিক ভবনের জন্য পরিবেশবান্ধব হয় এবং বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষের জন্য ক্ষতিকারক না হয়।
ঘ) মালিক, বাড়ির মালিক, প্রতিবেশী, ওই ভবনে বাসকারী প্রতিটি ভাড়াটেকে ছাদকৃষির বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এটি ছাদকৃষি মালিক নিজ দায়িত্বে করবেন।
ঙ) দালানের বাইরে দৃশ্যমান ‘নোটিশ বোডের’ ছাদে বাগানের বিষয়টি উল্লেখ থাকতে হবে, যাতে করে প্রতিবেশী এবং পথচারীরা এ বিষয়ে সচেতন হয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
চ) ওয়াসার সরবরাহ করা পানির পরিবর্তে বিকল্পভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এর জন্য ভবনের নকশা ও নির্মাণের সময় ভূগর্ভে কিংবা ছাদের শীর্ষে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সংযোজন করতে হবে।
ছ) অতিরিক্তভাবে, বৃষ্টির পানিসহ চাষাবাদের বর্জ্যসহ পানি যাতে সঠিকভাবে ছাদ থেকে নিষ্কাশিত হতে পারে, তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নকশাতে করতে হবে। এর ফলে দূষিত পানির কারণে সৃষ্ট অসুখগুলো হ্রাস পাবে।
জ) কোনো প্রকারের খামার বা মাছ চাষের জন্য ছাদ ব্যবহার করা যাবে না।
ঝ) ছাদকে কখনোই বাণিজ্যিক চাষাবাদের আওতায় আনা যাবে না।
ঞ) বাড়ির কার্নিশে এবং বারান্দায় কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের চাষাবাদের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
ট) বহুতল ভবনে বাস করা বাসিন্দাদের অনেকেই ছাদকে বিনোদনের জন্য ব্যবহার করে থাকেন। তাই কোনো অবস্থাতেই ছাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অংশকে বাগান তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না।

default-image

২। যে বাড়িগুলো ইতিমধ্যে নির্মাণ হয়ে গেছে এবং যেসব ছাদে বাগান আছে, তাদের অবশ্যই অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা বাড়ির কাঠামো, ভিত্তিপ্রস্তর মূল্যায়ন করে বাড়ির কাঠামো বাড়তি কতটা ভার বহন করতে পারবে, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হবে। যদি ভবনটিকে রিট্রফিট বা অতিরিক্ত শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে যথাযথ অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর মাধ্যমে বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে এটা করতে হবে।

৩। প্রতিটি বাড়ির মালিকের উচিত হবে নতুন ভবন তৈরির সময় নিয়ন্ত্রিতভাবে ছাদ ব্যবহার করা এবং ছাদকৃষি প্রতিষ্ঠার পূর্বে অবশ্যই দক্ষ প্রকৌশলীর কাছ থেকে ছাদের ভার বহন, পুরো কাঠামোর ধারণ ক্ষমতা এবং ভিত্তিপ্রস্তরের ভার বহনক্ষমতা যাচাই করে উপযুক্ত পেশাজীবী দ্বারা মূল্যায়ন করা। এটা ভুলে গেলে হবে না, বাংলাদেশ ভূ-কম্পনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। ছাদে স্থাপিত প্রতিটি বাড়তি ভার সরাসরি ভবনের ভিত্তি ও নকশা ভূকম্পনের সহনীয় নির্মাণ খরচকে প্রভাবিত করবে।

৪। এই ধরনের নকশা প্রণয়নের পর দালান অনুমোদন কর্তৃপক্ষকে, যেমন ঢাকার জন্য রাজউক এবং অন্যান্য শহরের অনুরূপ কর্তৃপক্ষ সঠিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এবং নির্মাণের সময় নিয়মিতভাবে অনুমোদন নিতে হবে।

৫। নিরাপদ এবং যথাযথ কৌশলগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পুরো বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

৬। কৃষি মন্ত্রণালয়ে কর্তব্যরত কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়মিতভাবে পরি বশ বান্ধব কীটনাশক প্রয়োগের পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭। ঋতুভিত্তিক সবজি এবং ফুল চাষকে অগ্রাধিকার দিয়ে নানা ধরনের বহুবর্ষীয় বৃক্ষ জাতীয় ফলগাছের চাষ থেকে বিরত থাকতে হবে। কোন ধরনের ফুল ও ঋতুভিত্তিক সবজি এবং কী ধরনের ফল চাষ করা যাবে, তার তালিকা করে সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ এবং অমান্যকারীর শাস্তি নির্ধারণ করতে হবে।

৮। ওয়াসার সরবরাহ করা পানির বাড়তি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট করে এর প্রাথমিক হার চিহ্নিত করতে হবে, যাতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এই অতিরিক্ত ব্যবহারের খরচ সঠিকভাবে বণ্টন করতে পারে।
এই ছাদকৃষির মূল উদ্দেশ্য যদি হয় ফরমালিনমুক্ত সবজি এবং ফল লাভ, তাহলে কীভাবে বাজার থেকে ফরমালিনের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা যায়, তা আমাদের চিন্তা করে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু ছাদকৃষির ফলে সৃষ্ট প্রভাবগুলোকে বিবেচনা না করে ছাদকৃষিকে উৎসাহিত করা হলে ভবিষ্যতে এটি সমাজের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।

সামগ্রিকভাবে, শহরে বসবাসকারী বর্তমান বাসিন্দাদের দায়িত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঢাকা শহরকে আরও আকর্ষণীয়, বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা। বর্তমানে নেওয়া যেকোনো শহুরে পরিকল্পনা ভবিষ্যতের বাসিন্দাদের জন্য যেসব উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে, তা নির্ণয় করা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। আমরা কেউ চাইব না ঢাকাকে ভবিষ্যতে ‘নিষিদ্ধ শহর’ বলা হোক। বর্তমানে যারা এই শহরের বাসিন্দা, তাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধ অবশ্যই ঢাকা শহরকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং বসবাস উপযোগী শহরে পরিণত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একটি ছোটগল্পে নিচের এই লাইনটির মাধ্যমে এ সত্যই তুলে ধরেছিলেন—
‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’

প্রকৌশলী লুৎফর খোন্দকার, (কেবিকে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন,এলএলসি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
প্রকৌশলী রওনাক খোন্দকার, এমএসসি, ইঞ্জি. (পার্সনস করপোরেশন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0