default-image


বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত দিন এক মির্জার সরব পদচারণ দেখেছি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির মহাসচিব। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমরা আরও এক মির্জার আবির্ভাব লক্ষ করি। তিনি মির্জা আবদুল কাদের। নোয়াখালী বসুরহাট পৌরসভার মেয়র। তার চেয়েও বড় পরিচয় তিনি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। বড় ভাই মির্জা পদবি ব্যবহার করেন না। ছোট ভাই করেন। এলাকার মানুষ তাঁকে ছোট মির্জা বলেই জানেন।

চলতি বছর পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ছোট মির্জা প্রচারমাধ্যমে চলে আসেন। এর আগেও তিনি দুই দফা নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তখন তাঁকে নিয়ে খুব আলোচনা হয়নি। এবার এসেছেন সত্যভাষণের জন্য। যখন রাজনীতিতে মিথ্যার দৌরাত্ম্য চলছে, তখন তিনি কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলতে থাকেন। কেবল নোয়াখালী নয়, সারা দেশের মানুষই তাঁর এই সত্যবচনকে পছন্দ করেছে। আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী হয়েও তিনি দলের নেতাদের দুষ্কর্ম আড়াল করেননি। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে যেসব কঠিন কথা উচ্চারণ করেছেন, তা বিএনপির নেতারাও বলতে সাহস পাননি। তিনি বলেছেন, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, নোয়াখালী অঞ্চলের আওয়ামী লীগ সাংসদেরা পালানোরও দরজা পেতেন না।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের পালানোর ‘ঐতিহ্য’ আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নোয়াখালী অঞ্চলের এক আওয়ামী লীগ প্রার্থী পালিয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জ এলাকার আরেক প্রার্থী চলে গিয়েছিলেন কানাডা। অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সিলেট অঞ্চলের এক বিএনপির নেতা যে কোথায় পালিয়ে গেছেন, আজও তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলের পলাতক নেতারা ফিরে এসেছেন। কিন্তু বিএনপির পলাতক নেতারা এখনো লাপাত্তা। হয়তো তাঁরা বিএনপির ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় আছেন।

আবার ছোট মির্জার কথায় ফিরে আসি। তিনি তাঁর দলের নেতা-সাংসদ উপজেলা চেয়ারম্যানদের নানা অপকর্মের কথা বলেছেন। এমনকি নিজের বড় ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও ছেড়ে দেননি। এতে নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ খুশি হলেও আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন ঘরের কথা পরকে বলে দেওয়ার জন্য। কেউ কেউ মুখ টিপে হেসেছেন।

কিন্তু ছোট মির্জা নিজেও তাঁর অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে তাঁর উপলব্ধি হয়েছে আর কোনো অন্যায় করবেন না। অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেবেন না। সত্য লুকাবেন না।

রাজনীতিকদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা, তাঁরা যা বলেন তা করেন না, যা করেন তা বলেন না। মির্জা সাহেবও এই ধারণার বাইরে যেতে পারলেন না। মুখে শান্তির বাণী আওড়ালেও নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে অশান্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। বসুরহাট বা কোম্পানীগঞ্জে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মিজানুর রহমান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। দুর্মুখেরা বলে থাকেন পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্যই তিনি ‘শান্তির বার্তা’ দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। নির্বাচনেও জয়ীও হলেন। এরপরই বসুরহাট উত্তপ্ত হতে থাকে। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটল। প্রথমে মারা গেলেন সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির। এরপর আলাউদ্দিন নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গত সোমবার পাল্টাপাল্টি হামলার পর মঙ্গলবারও সংঘর্ষে জড়ায় বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও মিজানুর রহমানের অনুসারীরা। এ সময় গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুই দফার সংঘর্ষে পুলিশসহ অর্ধশত লোক আহত হন। নিহত আলাউদ্দিন উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের চরকালী গ্রামের মমিনুল হকের ছেলে। তাঁকে নিজের অনুসারী বলে দাবি করেছেন মিজানুর রহমান। ওই সংঘর্ষের জেরে রাত সাড়ে নয়টার দিকে বসুরহাট বঙ্গবন্ধু চত্বর ও পৌর ভবন এলাকায় আবারও সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। ২০ মিনিট ধরে দুই পক্ষের এই গোলাগুলি চলে। এ সময় উভয় পক্ষের কমপক্ষে আরও ৩০ জন আহত হন।

বিজ্ঞাপন

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মিছিলে দুই পক্ষই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। বোমাবাজি করেছে। মির্জা সাহেব যদি এতই শান্তির ধারক-বাহক হবেন, তাহলে তাঁর লোকেরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে গেলেন কেন? মির্জার প্রতিপক্ষ মিজানুরের দাবি, নিহত আলাউদ্দিন তাঁর কর্মী। এর আগে মির্জা সাহেবও প্রথমে সাংবাদিক মুজাক্কিরকে তাঁর সমর্থক বলে দাবি করেছিলেন। পরে বলেছেন, ‘মুজাক্কির কারও কর্মী নন। সাংবাদিক। তাঁর হত্যার বিচার চাই।’ কিন্তু তিন সপ্তাহ পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। আরও একজন খুন হলেন। মির্জা বলেছেন, মিজানুরের লোকেরা গুলি করেছেন। আর মিজানুর বলছেন, মির্জার লোকেরা তাঁর কর্মীকে হত্যা করেছে। শান্তির রাজনীতি অশান্তির চোরাগলিতে নিক্ষিপ্ত হলো কার পাপে?

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন দুই পক্ষকে সামাল দিতে না পেরে বুধবার সকাল থেকে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এ সময় পৌর এলাকায় ব্যক্তি, সংগঠন, রাজনৈতিক দল, গণজমায়েত, সভা, সমাবেশ, মিছিল, র‍্যালি, শোভাযাত্রা, যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রচার নিষিদ্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।

১৪৪ ধারা জারি করে সেখানে কত দিন সংঘাত ঠেকানো যাবে? আওয়ামী লীগের উপদলীয় সংঘাতের কারণে মাসখানেকের বেশি সময় ধরে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। মাঝে মধ্যে মহাসড়কও বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা দোকান খোলার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। আওয়ামী লীগের অস্ত্রের মহড়া বন্ধ করা যাদের দায়িত্ব, সেই পুলিশ প্রশাসনও অসহায়। কেননা, এক পক্ষের সন্ত্রাসীদের ধরপাকড় করলে তাদের অন্য পক্ষের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য গণবদলির আবেদন করেছেন। এই হলো বসুরহাটে আইনের শাসন ও শান্তির প্রতিষ্ঠার নমুনা।

আওয়ামী লীগের ‘শান্তিবাদী’ রাজনীতির কারণে বসুরহাটে দুজন মানুষ প্রাণ দিলেন, মির্জা সাহেব কিংবা সেখানকার আওয়ামী লীগ দায় এড়াবেন কীভাবে?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন