জন্ম নিবন্ধনের গাড়ি চলে (না) চলে

অবিভক্ত ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসানের প্রায় ২৮ বছর পর ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশরা জন্ম আর মৃত্যু নিবন্ধনের আইন জারি করে। অবশ্য ১৮৭৩ সালে অবিভক্ত বাংলার জন্য প্রথম জন্ম নিবন্ধনের আইন জারি করা হয়েছিল। ১৯১১ সালে এই আইনে পরিবর্তন আসে। পরিবর্তনটি হয় মেয়েদের মানে মেয়েশিশুদের বিয়ের বয়স ঠিক করার জন্য। সে সময় সেটা ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা—সাবালিকা না হলে বালিকাদের বিবাহ দেওয়া আইনের চোখে অন্যায় ঘোষণা করা হয়। আমার দাদির মুখে তাঁদের পাশের বাড়ির খাঁ সাহেবদের ছয় ছেলের একই দিনে বিয়ে দেওয়ার গল্প শুনেছি সেই ছোটবেলায়। ১৯১১ সালের আইন কার্যকর হওয়ার আগে খাঁ সাহেব তাঁর ছেলেদের নিশ্চিত কুমারী বধূ গ্রহণের পথ পরিষ্কার করে সব কজন ছেলের বিয়ে দিয়ে দেন একই দিনে। বলা বাহুল্য, কনেদের বয়স আটের বেশি ছিল না। ছয় বছরেরও একজন ছিলেন, তাঁর স্বামীর বয়স তখন ছিল ১৩–১৪ বছর। এই দম্পতিকে আমি দেখেছি, তাঁদের মুখে সেই বিয়ের গল্পও শুনেছি। আইনকে ফাঁকি দিয়ে কথিত ধর্ম রক্ষার কত কৌশল। সেই ফাঁকিজুকির ফন্দিফিকির এখনো চলছে।
তিন স্তরের নিরাপত্তার চাদরে আমাদের স্কুলশিক্ষাকে বেঁধে ফেলার আগে এসএসসি বা ম্যাট্রিক পরীক্ষার নিবন্ধনের সময় অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে বোর্ডের কাগজে জন্মের তারিখ লিখতে হতো—সেটাই ছিল জন্ম নিবন্ধনের দালিলিক প্রমাণ, শিক্ষক ঠিক করে দিতেন কার কবে জন্মদিন। দাঁত দেখে মানুষ যেমন কোরবানির প্রাণীর বয়স সম্পর্কে আঁচ–অনুমান করেন, তেমনি শ্রেণিশিক্ষক শরীরের গড়ন, গলার আওয়াজ, গোঁফের রেখা দেখে ছাত্রের জন্মতারিখ হিসেবে একটা সন বসিয়ে দিতেন। তাই গ্রাম থেকে আসা খালি পায়ের শক্তপোক্ত পেশির সিরাজ জন্মসাল অনুযায়ী কোর্ট দারগার রোগা–পটকা ছেলে সালাউদ্দিনের থেকে দুবছরের বড় হয়ে যায়। সিরাজ আজও গজগজ করে, কারণ মোস্তফা স্যারের কারণে তাঁকে সালাউদ্দীনের চেয়ে দুবছর আগে অবসরে যেতে হলো বলে। এ দুঃখ সে রাখবে কোথায়?
শ্রেণিশিক্ষকরা বছরের তারতম্য করলেও মাস সবাই প্রায় একই। সবার মা ইংরেজি বছরের শুরুতেই সন্তান প্রসব করেছেন—মানে সবারই জন্ম জানুয়ারি মাসে। বিশ্বাস না হলে ফেসবুকে গিয়ে দেখতে পারেন বেশির ভাগ মানুষেরই জন্ম জানুয়ারি মাসে। এ নিয়ে সৌদি অভিবাসন কর্মকর্তার অসম্মানসূচক মন্তব্যের উল্লেখ না করাই ভালো। একবার হিথরোতে প্রায় একই ধরনের মন্তব্য শুনেছিলাম ব্রিটিশ অভিবাসন কর্মকর্তার কাছে। সাতজন কলেজে ভর্তি–ইচ্ছুক ছাত্রের পাসপোর্ট নিয়ে দেখেন সবার জন্ম ১ জানুয়ারি। কুমিল্লা, রংপুর, বরিশাল, পাবনা, কেউ বাদ না, সবাই জন্মেছে ১ জানুয়ারি। সবে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিলেতের বিমানবন্দরে যাওয়া এসব ছেলেমেয়ের পক্ষে এসবের ব্যাখ্যা ছিল না। ব্যাখ্যাতীত বিষয়ও বটে। এসব বিভ্রান্তি কাটাতেই হোক আর শিশুর এক নম্বর অধিকার তার ন্যায্য জন্ম নিবন্ধন অধিকার প্রতিষ্ঠার তাগিদেই হোক, দাতা সংস্থার (উন্নয়ন বন্ধু বলা হয় আজকাল) আগ্রহে ২০০৪ সালে জন্ম নিবন্ধন আইন নতুন করে সংশোধিত–সংযোজিত করে গৃহীত হয়। তবে ২০১০ সালে কালি-কলমে নিবন্ধনের চর্চা বন্ধ করে অনলাইন নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত জন্ম নিবন্ধনের অরাজকতা একেবারে কাটেনি। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনের আগে অভিভাবকেরা নোটারি পাবলিকদের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। মায়েদের মুচলেকায় লিখতে হতো, আমি আমার সন্তানের গর্ভধারিণী মা, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে...ইত্যাদি ইত্যাদি বলে বয়স কমিয়ে একটা সনদ নিয়ে স্কুলে জমা দিয়ে নতুন বয়স লেখা হতো বোর্ডের কাগজে। নোটারি পাবলিকদের সে বাড়া ভাতে ছাই পড়ে প্রাথমিক সমাপনী, জুনিয়র, মাধ্যমিকের নতুন ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ার পর। তবে ছাই একেবারে পড়েনি, জুনিয়র, মাধ্যমিকের নিবন্ধনের সময় এখন সেই চর্চা চালু আছে কমবেশি।
সেই সুযোগ করে দিয়েছে প্রাথমিক সমাপনীর নিবন্ধনটা অনলাইনে এখনো চালু না হওয়ায়। কালি–কলমের করা সেই নিবন্ধন পরিবর্তনের খেলা এখনো চলছে। প্রাথমিক সমাপনীর নিবন্ধনটা অনলাইনে হয় না কেন? কেন সেটা সার্ভারে ওঠে না? কেউ জবাব চায় না, চাইলেও কেউ জবাব দেয় না।
অসততার রোজগারিব্যবস্থা চালু রাখার জন্যই হোক বা আমলাদের গণিত জ্ঞানের ঘাটতির কারণেই হোক, প্রাথমিক শ্রেণির শুরু অর্থাৎ প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির বয়স সর্বনিম্ন ছয় বছর নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু স্কুল ফাইনালে বা এসএসসি দিতে হলে বয়স চৌদ্দ হলেই চলবে। ছয় বছর বয়স হওয়ার আগে কেউ যদি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে না পারে, তাহলে কারা ১৪ বছর বয়সে স্কুল ফাইনাল দেবে। এটা কি ভ্রম? ভুল? বেখেয়াল? বেহিসাব, নাকি আইনের ফাঁক রাখা। যে শিশুর বয়স ৫ বছর ৭ মাস, সে কেন পাঁচ মাস অপেক্ষা করবে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য? পাঁচ মাস বাড়িয়ে সে ছয় বছর বয়সের সনদ নিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। অষ্টম শ্রেণিতে অভিভাবকেরা তার হারানো পাঁচ মাসের সাথে আরও সাত মাস যোগ করে বয়স কমিয়ে দিলে সে প্রায় পনেরো বছরে স্কুল ফাইনাল দিতে পারবে—এমনকি আরও এক বছরও কমিয়ে আনতে পারে। এসব চর্চা ঝেটিয়ে বিদায় করার জন্যই বোধহয় বর্তমানে নিবন্ধক জেনারেল বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে স্থায়ী ঠিকানা হাসিল না করলে রাজধানীর কাউকে আর জন্ম নিবন্ধনের সনদ দিচ্ছেন না।
মাথাব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাথা কেটে ফেলার ঝুঁকি নেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? আইন বা ২০১৭ সালের বিধিমালা কি এ রকম সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়? জন্ম নিবন্ধনের জন্য স্থায়ী ঠিকানা আবশ্যক নয়। জন্ম নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধিমালা (বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা বৃহস্পতিবার, মার্চ-২, ২০১৭) অনুযায়ী (ধারা ৯–এর ঙ) এমনকি রাস্তায় বা উন্মুক্ত স্থানে জন্ম নেওয়া শিশুরও জন্ম নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ধারা ৯–এর ‘উ’–তে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, ‘কোনো কারণে কোনো ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা না থাকিলে স্থায়ী ঠিকানার স্থানে অপ্রাপ্য লিখিয়া জন্মনিবন্ধকের নিকট নিবন্ধন করিতে হইবে....।’ কাজেই জন্ম নিবন্ধনের জন্য স্থায়ী ঠিকানার শর্ত কোনো অবস্থাতেই বাধ্যতামূলক নয়। এটা নিয়ে চাপাচাপি বা দেশের বাড়ি থেকে সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই।
পাদটিকা: নিবন্ধন বিধিমালার টাটকা কপিতে (বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, মার্চ ২, ২০১৭) চোখ বুলাতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছে চড়ল। এই বিধিমালার ৩ নম্বর ধারায় বলা হচ্ছে: ৩–এর ক: জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নাম, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, জন্মস্থান, পিতা ও মাতার (এবং দত্তক সন্তানের ক্ষেত্রে) কততম সন্তান, পিতা ও মাতার জন্ম নিবন্ধন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ নাম এবং বর্তমান ও অস্থায়ী ঠিকানা)...অথচ বাংলাদেশে দত্তক প্রথা নিষিদ্ধ, কোনো আইনে দত্তক স্বীকৃত নয়। এমনকি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করলেও এই সনদের একবিংশ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি। এটা নিয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে অনেক দেন-দরবার চললেও এখন বাংলাদেশ অজানা কারণে দত্তকের বিষয়ে আগের অবস্থানে অনড় আছে। তবে কি আইনের চৌকস ব্যক্তিরা বিষয়টি জানেন না, নাকি সরষেতেই ভূত আছে!
গওহার নঈম ওয়ারা: ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।