সম্ভবত এই সুফল চিন্তা করেই বেকুব টিটিই-র চাকরি ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ জন্য আমরা মাননীয় মন্ত্রী, তাঁর সম্মানিত স্ত্রী এবং ভাগনেবৃন্দের মহানুভবতার তারিফ করি।

আশা করি ভবিষ্যতে আর এমন হবে না। মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী, সেই স্ত্রীর ভাই-বোন, তাঁদের সন্তানেরা, শালা-দুলাভাই-খালু-ফুপা আর লতায়-পাতায় থাকা আাত্মীয়রা মিলেই তো ক্ষমতার বলয়। এঁরাই তো অভিজাত শ্রেণি। অভিজাত শ্রেণিই তো ক্ষমতার শোভা। সেই শোভায় কালি লেপা মানে ক্ষমতারই অপমান। আশা করি আমাদের আইনপ্রণেতারা রাতভর পড়াশোনা করে এমন আইন বানাবেন যাতে জনগণের ওপর প্রযোজ্য বিধিনিষেধ থেকে তাঁরা মুক্ত থাকেন; কারো যাতে তাঁদের ঘাঁটানোর সাহস না হয়। ঘাঁটাঘাঁটি যা করার তাঁরা নিজেরাই করবেন। দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে অনুমতি নেওয়ার বিধান আছে। অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ও তাঁদের পরিবারকে যাতে হেয় না করা যায় তেমন একটা আইন করে দিলেই সমস্যাটা চুকে যায়। জনগণও তখন তাদের সীমাটা বুঝে নিতে পারবে।

যখন ১ শতাংশ ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে তখন ৯৯ ভাগ হয়ে পড়ছে আরও গরিব, তখন ওই এক শতাংশ সামরিক–বেসামরিক আমলাতন্ত্র আর বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নতুন শাসকশ্রেণি গঠন করে ফেলছে। এই ভিআইপি-অভিজাত-বেগমপাড়ামুখী শ্রেণিটিই তো সবকিছু হাতে নিয়ে বসে আছে। বৈষম্য বাড়া মানে তো সমাজ খাড়াখাড়িভাবে ধনি-গরিবে ভাগ হয়ে যাওয়া; মধ্যবিত্তে ওঠার সুযোগ, মধ্যবিত্ত থেকে আরও ওপরে ওঠার সুযোগ কমে যাওয়া। এমনটাই যদি চলতে থাকে তাহলে তো সামন্তবাদই কায়েম হচ্ছে বলতে হবে।

এ রকম অপমানজনক ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটছে। ঢাকার প্রভাবশালী নেতা হাজি সেলিম সাংসদকে আদালত হয়তো দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়েই ফেলেছে। তাঁকে বলা হয়েছিল, রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭-এ আত্মসমর্পণ করতে হবে। এই সময়সীমার মধ্যেই তিনি গত ২ মে, ঈদের চাঁদ ওঠার দিন বিদেশে চলে যান। পরে এটা নিয়ে কিছু লোক হইচই করায় তাঁকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। এটাও ভালো হয়েছে। দেশে ফেরত আনা হয়েছে তো কী হয়েছে, জেলে তো পাঠানো হয়নি!

এই ঈদের সময়ই (৬ মে) পায়রা সেতুর টোল প্লাজায় এসে হাজির হয় একটি বরযাত্রী বহর। তাঁরা টোল দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের ওপর চড়াও হয় টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। তাঁরা কি জানতেন না যে, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, পটুয়াখালী জেলা জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান, পটুয়াখালী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য, মাননীয় সাংসদ কাজী কানিজ সুলতানার বড় ছেলে বরযাত্রীসহ তাঁর নববধূ নিয়ে যাচ্ছেন। জানতেন, কিন্তু সাংসদের পুত্রেরা জানতেন না হয়তো যে, বনে আরও বাঘ থাকে। টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের মালিকেরাও কি কম ক্ষমতাবান!

আগে নাকি সময়ের বার্তা দেওয়ালে লেখা হতো। এখন লেখা থাকে গাড়ির সামনে পেছনে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা পরিচয়লেখা গাড়িতে ঘোরেন। ভিআইপি পর্যায়ের অনেকে যাঁরা পরিচয় দেওয়ার তোয়াক্কা করেন না, তাঁদের গাড়িতে বিশেষ রকম হর্ন লাগানো থাকে। জাহাজের ভোঁ-এর মতো সেই কর্কশ হর্ন যদি আপনার সামনে-পেছনে, আশে-পাশে বেজে ওঠে তো আপনি বুঝবেন, ওই যে একজন ভিআইপি যাচ্ছেন, ক্ষমতার শোভা যাচ্ছেন, নব্য জমিদার যাচ্ছেন। আগে কোটিপতি হলে বাতি জ্বালাতো, এখন কোটি টাকার গাড়িতে বিশেষ হর্ন লাগানো হয়, সাইরেনযন্ত্র বসানো হয়, তাতেও যদি না হয় গাড়ির সামনের সিটে বসা বডিগার্ডেরা মাইকে আওয়াজ করে রাস্তা পরিষ্কার করতে বলেন। বিমানবন্দর থেকে ফেরিঘাট ঘুরে আসুন, ভিআইপিতন্ত্রের ক্ষমতা টের পাবেন। সড়কে, ঘাটে-ঘাটে গণপরিবহন আটকে থাকে, ফেরি আটকে থাকে, কিন্তু ভিআইপিরা কোথাও আটকান না। আটকালে চাকরি যেতে পারে কিন্তু।

এভাবে মাইক বাজিয়ে, সাইরেন শুনিয়ে সমাজ বিবর্তনের সংকেত দেওয়া হচ্ছে। সংকেত বলছে, গণতন্ত্রের রাস্তায় হোঁচট খেয়ে আমরা জমিদারতন্ত্রের মহাসড়কে উঠে পড়েছি। জমিদারতন্ত্র ফিরে আসছে বলে জানাচ্ছেন আমেরিকান সমুদ্রবিজ্ঞানী জোয়েল কটকিন। এর তথ্যপ্রমাণ, আলামতসহ তিনি একটা বই লিখেছেন, ‘দ্য কামিং অব নিও ফিউডালিজম: আ ওয়ার্নিং টু দি গ্লোবাল মিডল ক্লাস’। অর্থাৎ নয়া সমান্তবাদ আসছে: বিশ্বের মধ্যবিত্ত হুঁশিয়ার। শুধু কটকিনই নন, আরও আরও পণ্ডিতেরাও এটা বলছেন।

সামন্তবাদী সমাজ তিন স্তর বিশিষ্ট। সকলের ওপরে সর্বশক্তিমান রাজা-রানি। তারপরে অভিজাতশ্রেণীর জমিদারেরা। তারপরে নায়েব-গোমস্তা-আমলারা। সবার নিচে থাকবে চাষাভুষা জনগণ। এই সমাজ হলো খাড়াখাড়ি অর্থাৎ ওপর থেকে নিচে। পুঁজিবাদে এসে ভোট দেওয়ার অধিকার হাতে নিয়ে চাষাভুষারা নিজেদের পছন্দের লোককে ক্ষমতায় বসাতে পারল, তাদের থেকে তৈরি হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যবিত্তরা বৈষম্য কমানোর রাজনীতি নিয়ে এলো। আর তাদের সমর্থন নিয়ে অভিজাতদের বংশগৌরবের দোহাই বাতিল করে দিল পুঁজিপতিদের দলগুলি। বলা হলো গণতান্ত্রিক সমাজ হবে আড়াআড়ি অর্থাৎ সবাই আইনের সমান ভূমিতে সমান মর্যাদা পাবেন।

কিন্তু যখন ১ শতাংশ ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে তখন ৯৯ ভাগ হয়ে পড়ছে আরও গরিব, তখন ওই এক শতাংশ সামরিক–বেসামরিক আমলাতন্ত্র আর বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নতুন শাসকশ্রেণি গঠন করে ফেলছে। এই ভিআইপি-অভিজাত-বেগমপাড়ামুখী শ্রেণিটিই তো সবকিছু হাতে নিয়ে বসে আছে। বৈষম্য বাড়া মানে তো সমাজ খাড়াখাড়িভাবে ধনি-গরিবে ভাগ হয়ে যাওয়া; মধ্যবিত্তে ওঠার সুযোগ, মধ্যবিত্ত থেকে আরও ওপরে ওঠার সুযোগ কমে যাওয়া। এমনটাই যদি চলতে থাকে তাহলে তো সামন্তবাদই কায়েম হচ্ছে বলতে হবে।

জনগণকে তাই পরিস্থিতি বুঝে চলতে হবে। কুমড়ার বেগুনি হতে পারলে অভিজাততন্ত্রকে গণতন্ত্র বলা যাবে না কেন?

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন