default-image

দেশে চলছে চরম দাবদাহ। গরমে শহরে মানুষের হাঁসফাঁস দশা। আমাদের মতো উপক্রান্তীয় জলবায়ুর দেশে দাবদাহ চরম অস্বস্তিকর। আবহাওয়ার অন্যতম চলক আপেক্ষিক আর্দ্রতার বৃদ্ধিতে দাবদাহ একদিকে যেমন মানবদেহে পানিশূন্যতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে, অন্যদিকে অসহনীয় গরম দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপে শ্রমবিমুখতা তৈরি করে। ভবিষ্যতে এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্রতর হতে পারে বলে বৈশ্বিক জলবায়ু মডেলগুলো আগাম বার্তা দিচ্ছে। বাড়তে পারে আকস্মিক বন্যা, অনাবৃষ্টি ও ঝড়ঝঞ্ঝার ভয়াবহতা।

আর আবহাওয়ার বৈরী আচরণের অসম শিকার হতে পারে আমাদের নগরগুলো, যার কিছু কিছু ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যেমন এ বছর মার্চে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়েছে। আবার ঢাকায় ২৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা অনুভূত হয়েছে ২৫ এপ্রিল, ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়ার বৈরিতা নগরের মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উপরন্তু, শহরের অবকাঠামোগুলোর স্থিতিস্থাপকতার জন্য বৈরী আবহাওয়া হুমকিস্বরূপ।  
অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও কানাডার ছয় গবেষক দেশের পাঁচটি বড় শহরের ‘ভূপৃষ্ঠস্থ ত্বকে’র তাপমাত্রার স্থানিক-কালিক ধরন, কারণ এবং ধারা নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সাময়িকীতে  একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। গত ২০ বছরের (২০০০-২০১৯) দিন ও রাতের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে পাঁচটি নগরের তাপমাত্রার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা যায়, রাজউক নির্ধারিত ঢাকা মেট্রোপলিটন অঞ্চলের দিনের তাপমাত্রা পাশের গ্রামের তুলনায় ২ দশমিক ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। চট্টগ্রাম (১.৯২ ডিগ্রি), খুলনা (১.২৭ ডিগ্রি), সিলেট (১.১০) এবং রাজশাহীতেও (০.৭৪ ডিগ্রি) একই অবস্থা। অন্যদিকে, রাতের তাপমাত্রা গ্রামের তুলনায় চট্টগ্রামে (১.৯০ ডিগ্রি) বেশি। তারপর ঢাকায় (১.৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।

আশ্চর্য হলেও সত্য, খুলনা নগরে রাতের তাপমাত্রা ২০০০ সাল থেকে গ্রামের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম একটা নির্দেশক হচ্ছে দিন-রাতের তাপমাত্রার তারতম্য। গবেষণায় দেখা যায় দিবারাত্রির তাপমাত্রার তারতম্য সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে, তারপর রাজশাহীতে। অন্যদিকে, ঢাকা, খুলনা ও সিলেটে এই তারতম্য যৎসামান্য। সহজ বাংলায়, দিনে সূর্যালোকের কারণে গরম বেশি অনুভূত হলেও সূর্যাস্তের পর রাতে গরম কম অনুভূত হয়। আমাদের বড় পাঁচটি শহরে হচ্ছে উল্টো অর্থাৎ দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ২০০০ সালের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে কমছে, ফলস্বরূপ নগরবাসীকে রাতেও গরমে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে।

মাত্রাতিরিক্ত জনঘনত্ব, জলবায়ু-অসংবেদনশীল বিল্ডিং উপাদান, অতিরিক্ত মনুষ্য কর্মকাণ্ড এবং সবুজের চরম অভাব পাঁচটি নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ। বৃহৎ পরিসরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর দুর্বল হয়ে পড়া এবং ভারত মহাসাগরের উপরিস্থ পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিও দেশের দাবদাহে প্রভাব ফেলছে। নগরগুলোর তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি শহরে সামনের দিনগুলোতে দিনের তাপমাত্রা বাড়বে। অন্যদিকে, রাত্রিকালীন তাপমাত্রা খুলনা ছাড়া অন্য চার শহরে বাড়বে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনে দাবদাহ ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। ফলে, দেশের শক্তি, পানি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে বৈ কমবে না। তা ছাড়া, নগরগুলো বসবাসের উপযুক্ততা হারাতে পারে।

যদিও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একক কোনো সমাধান আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়নি, তবে সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় নগরগুলো জলবায়ুর অভিঘাত হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে অভিযোজন কৌশল নির্ধারণে নগরগুলোর ভূমিকা বেশ ফলপ্রসূ হতে পারে, যদি শহরগুলোর পারিবেশিক অবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণপূর্বক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কী, তা নির্ধারন করা যায়।

বিজ্ঞাপন

কেননা, নগরপরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, যার ভিত্তিতে জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কৌশলগুলো উদ্ভাবন করা যাবে। অনেকেই উন্নত বিশ্বের কৌশলগুলোকে প্রতিস্থাপনের কথা বলেন। মনে রাখতে হবে, ফলপ্রসূ অভিযোজন কৌশল নির্ধারণে স্থানীয় ভৌগোলিক জ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক ও জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় প্রয়োজন, বিশেষ করে দরকার স্থানীয় উদ্ভাবন।

সুতরাং, বিদেশের শহরের কোনো কৌশল আমাদের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। যেমন সিউল শহরে দাবদাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় ৩০ মিটার উঁচু গাছ লাগানো হচ্ছে, যাতে ছায়ার বিস্তার বাড়ে। ব্রাজিলের সাওপাওলো শহরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে নগরবাসীকে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ অন্যতম, এ কথা যেমন ঠিক; তেমনি নগর জলবায়ুর বর্তমান অবস্থার জন্য শহর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা এবং অত্যন্ত দুর্বল পারিবেশিক শাসনপ্রক্রিয়া সমভাবে দায়ী।

অর্থাৎ শহরগুলোর বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির নীতিমালা বা আইনকানুনগুলোর অবস্থা অনেকটা সুকুমার রায়ের ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ কবিতার মতো। মানে ফোঁস ফোঁস করে কিন্তু কামড় দেয় না। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে যেসব অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে দাবদাহ হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ংকর। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, এই প্রপঞ্চটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ অনেক সহজ। যেহেতু নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে দেশে সামনের দিনগুলোতে গ্রাম থেকে শহরে অভিগমনের হার বাড়বে, ফলে মাঝারি শহরগুলোতেও দাবদাহ বাড়তে পারে।

তাই দাবদাহের সঙ্গে অভিযোজনের কৌশলগুলো এখন থেকে রপ্ত করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ হতে পারে বিবর্ণ। দাবদাহের সঙ্গে অভিযোজনের একটা ফলপ্রসূ উপায় হচ্ছে পরিকল্পিত নগরায়ণ, যা জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিসহ উন্নয়নকে টেকসই করতে সহায়তা করে। দাবদাহ তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক বিষয়। মনে রাখতে হবে, নগর জলবায়ুর পরিবর্তন বা দাবদাহ-সংক্রান্ত নীতিমালা যত দ্রুত তৈরি করা যাবে, তত দ্রুত নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি লাঘব করা সম্ভব। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রকৃতির ওপর মানুষের সীমাহীন খবরদারির নিয়ন্ত্রণ।

আশরাফ দেওয়ান অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সের গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন