জাতিরাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো তার জাতীয়তাবাদী চেতনা। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের ফসলই হলো জাতিরাষ্ট্র। মধ্যযুগে খ্রিষ্টীয় ইউরোপে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তা-ই বলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকায় যেসব জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব জাতি আগে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে, সেগুলোর অধিকাংশই স্বাধীনতার পরে ধারণ করেছে জাতীয় বৈশিষ্ট্য। পরাধীন আমলে প্রবর্তিত বহু রীতিনীতি বর্জন করেছে। জাতীয়তাবাদী চেতনা ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে তার সংস্কৃতিতে: ভাষায়, পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভ্যাসে, সম্ভাষণরীতি প্রভৃতি জীবনাচরণে।

যেসব ভূখণ্ডে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানকার সরকারব্যবস্থা স্বাধীনতার আগে যেমনটি ছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে তেমনটি থাকে না। তাতে আসে আমূল অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন। ঔপনিবেশিক আমলের বিজাতীয় সাংস্কৃতিক বিষয় পরিত্যাজ্য হয়। তার জায়গায় যুক্ত হয় জাতীয় ঐতিহ্যগত বিষয়।

স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে সেই লড়াই বহুমাত্রিকতা পায়। পাকিস্তানের ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষার জন্য লড়াই করার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এই কথার অর্থ হলো এই যে রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে বাংলা ভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়।

স্বাধীনতার আগেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছিল পাকিস্তানের ১৯৬২-এর সংবিধানে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা এবং উর্দু, তবে এই অনুচ্ছেদটির অর্থ এই নয় যে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারে বাধা থাকবে, এবং বিশেষভাবে ইংরেজি ভাষা সরকারি ও অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে যে পর্যন্ত না এর পরিবর্তনের জন্য উপযোগীকরণ ব্যবস্থা করা হবে।’ বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা ভাষার সঙ্গে এমন কোনো শর্ত নেই বিকল্প হিসেবে ইংরেজি ব্যবহারের। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত নানা দাপ্তরিক কাজকর্মে বাংলার সঙ্গে ইংরেজিকে বাদ দেওয়া যায়নি।

১৯৭৪-এর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বিশ্বসভায় বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা স্বীকৃত হয়। এক সপ্তাহ পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তিনি তাঁর ভাষণ দেন বাংলায়। জাতির জীবনে তা ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের একটি শুভসূচনা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দ্বিতীয়বার জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁর হয়নি।

বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিচ্ছিলেন বাংলায়, তার ইংরেজি অনুবাদ ওই কক্ষ থেকেই একই সঙ্গে পাঠ করছিলেন কূটনীতিবিদ ফারুক চৌধুরী। সেই ইংরেজি থেকে পাঁচ ভাষায় তরজমা হচ্ছিল। আমাদের জন্য তা ছিল রোমাঞ্চকর ব্যাপার। তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। সেটা সেকেলে টেলিপ্রিন্টারের যুগ। জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণ ঢাকায় আমরা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং এক্সটার্নাল পাবলিসিটি শাখা থেকে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করছিলাম। বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর বিশ্ববাসী বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী নেতার মুখ থেকে শুনেছিল।

পরের বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন বর্তমানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। বিচারপতি চৌধুরী ভাষণ ইংরেজিতে দেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অথবা তাঁদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইংরেজিতেই ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুর সূচিত বাংলায় ভাষণ দেওয়ার প্রথা অনেক বছর অনুসৃত হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর পরে জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ১৯৯৩ তে। তাঁর বাংলা ভাষণের ট্রান্সলেশন বুথ থেকে ইংরেজি তরজমা পাঠ করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ শাখার মহাপরিচালক ইফতেখার আহমদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর তিন মেয়াদে সব সময় বাংলাতেই জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন।

বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা। এই ভাষার কবি এক শতাব্দীরও বেশি আগে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। সেটাও ভাষার বিশ্বস্বীকৃতি। এখন বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। তারা শুধু বাংলাদেশ ও ভারতে নয়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাস করছে। সেসব বিবেচনায় ও ভাবাবেগবশত দাবি উঠছে অথবা আমরা আশা করছি, জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করা হোক বাংলাকে। বর্তমানে ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, আরবি ও চৈনিক মান্দারিন জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা।

বাংলা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হতে বাধা কোথায়, তা নিয়ে কথা বলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদের সঙ্গে। তিনি অনেক দিন জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে এবং জেনেভায় জাতিসংঘের ইউরোপীয় সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর মতে, অন্যান্য বাধার সঙ্গে বড় বাধা ব্যয়। ছয়টির সঙ্গে আর একটি নতুন ভাষা যুক্ত হলে বছরে জাতিসংঘের খরচ বাড়বে অন্তত সাত-আট কোটি ডলার। জাতিসংঘ এবং সদস্যদেশগুলো সেই বোঝা বহনের দায় নেবে কেন? সমৃদ্ধ ভাষা জার্মান ও জাপানিও দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি পায়নি। জার্মান ও জাপানের টাকার অভাব নেই।

ভাষা নিয়ে সারা বছর বাক্য ব্যয় আমাদের মতো কোনো জাতি করে না। আর এক দিন পরই আসছে ফেব্রুয়ারি মাস, যাকে আমরা নাম দিয়েছি ‘ভাষার মাস’। আমাদেরই আছে শুধু ‘ভাষার মাস’, পৃথিবীর আর কোনো জাতির নেই। তাদের সব মাসই ভাষার মাস, সব দিনই ভাষার দিন। ভারতের ভাষার মাস নেই; থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়া, ফরাসি দেশ, জার্মানি, স্পেন, সুইডেনের ভাষার মাস নেই। কিন্তু নিজেদের ভাষা তাদের এতই প্রিয় যে প্রতিটি দেশই তাদের জাতীয় ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করে না। সরকারের বাইরে সাধারণ নাগরিকেরাও নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলতে চায় না। জার্মানি বা ফরাসি দেশের কোথাও সে দেশের কোনো নাগরিকের ওপর বোমা মারলেও তাদের মুখ দিয়ে ইংরেজি বাক্য বেরোবে না। অথচ উচ্চশিক্ষিত জার্মান ও ফরাসিরা খুব ভালো ইংরেজি জানেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিখ্যাত ফরাসি লেখক ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আঁদ্রে মালরোঁ বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন। ইংরেজি জানা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফরাসিতেই কথা বলেছেন। তার ইংরেজিতে ও বাংলায় তরজমা করেছেন দোভাষী। স্বাজাত্যবোধ এক বিরাট ব্যাপার। মুখ দিয়ে ফটর ফটর করলেই জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটে না। তাতে ভাষার ও জাতির লেশমাত্র উপকার হয় না। ভারতের অহিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর সব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড হিন্দি বা ইংরেজিতে দেখিনি, সবই সেখানকার আঞ্চলিক ভাষায়। ঢাকার রাস্তায় চোখ বুলিয়ে দেখুন!

আমরা যদি সত্যি সত্যি ভাষাপ্রেমিক হয়ে থাকি এবং যথার্থই বাংলা ভাষার উন্নতি চাই তাহলে জাতিসংঘ পর্যন্ত না গিয়ে দেশের ভৌগোলিক চৌহদ্দির মধ্যেই জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। যখন বড় বড় প্রাসাদোপম বাড়িগুলোর ফটকে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে বাড়ির নাম ও বাড়ির মালিকের নাম লেখা দেখি তখন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের কথা মনে পড়ে। স্বাধীনতার পর ব্যাংক, বিমা প্রভৃতির নাম বাংলায় করা হয়েছিল-সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, উত্তরা, জনতা প্রভৃতি। আজ বাংলার কৃষককেও আমরা ফারমার্স বলে ডাকতে ভালোবাসি।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগে ইংরেজি আমাদের ব্যবহার করতে হবে। ইংরেজি জানা এক কথা আর তা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা এবং জাতীয় ভাষাকে অবহেলা করা আরেক কথা। কিছু কিছু জিনিস একেবারে ওপর থেকে শুরু হলেই ভালো। তখন নিচের দিক বাধ্য হয় তার অনুশীলনে। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এসেছিলেন বাংলাদেশে সংক্ষিপ্ত সফরে। তিনি ইংরেজি জানেন না তা মনে করার কারণ নেই। চীন সরকারের কর্মকর্তারা তো জানেনই। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে চীনা ভাষাতেই কথা বলেছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দিলেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত অভিপ্রায়কে মর্যাদা দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডের নেতারা যদি থাই ভাষা, তুরস্কের নেতারা যদি তুর্কি ভাষা, ইরানের নেতারা যদি ফারসি ভাষা দিয়ে দেশ-বিদেশে যাবতীয় কাজ চালাতে পারেন, সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা আমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে না কেন?

বিজাতীয় ভাষা মিশিয়ে মধুর ভাষা বাংলাকে যেভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিকৃত করা হচ্ছে, তা ফৌজদারি অপরাধ না দেওয়ানি অপরাধ, আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন। তবে তা যে অপরাধ একজন বাঙালি হিসেবে তাতে আমার সন্দেহ নেই। সব ব্যাপারে ফান্ডামেন্টাল রাইটের দোহাই চলে না। জাতিরাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব জাতীয় ভাষার সঙ্গে কম উন্নত আঞ্চলিক ভাষাগুলোর প্রতিও যত্নবান হওয়া। জাতীয় ভাষাকে যদি শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলেই অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সার্থক হবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন