default-image

জাতীয় দৈনিকে পিএইচডি ও গবেষণায় জালিয়াতিসংক্রান্ত একটি খবর বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয় ১৩ মার্চ, পরে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই, বিশেষ করে যাঁদের পিএইচডি কষ্টার্জিত, খবরটিতে হতাশা ও ক্রোধ ব্যক্ত করেছেন বা করছেন। খবরটি দেখে আমার কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’-এর কয়েকটা লাইন মনে পড়েছে: ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরিহয়ার, নর অ্যানি ড্রপ টু ড্রিংক।’ আমাদেরও হয়েছে সেই দশা। শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আর অসংখ্য পিএইচডিধারী অথচ বৈশ্বিক জ্ঞানসূচক ২০২০-এ বাংলাদেশের অবস্থান ভুটানেরও নিচে!
গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, বর্তমানে ভুয়া পিএইচডি রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি। অবস্থাভেদে একটি ডিগ্রি কিনতে দেড় থেকে চার লাখ টাকা লাগে। যাঁরা পয়সা দিয়ে ডিগ্রিটা নিচ্ছেন, তাঁরা কি কখনো অনুধাবন করতে পারবেন, একটা ডিগ্রি অর্জনের জন্য কাটাতে হয় কত নির্ঘুম রাত, সইতে হয় কতটা মেহনত ও মানসিক যন্ত্রণা?

বিজ্ঞাপন

বহির্বিশ্বে উচ্চতর গবেষণায় কালেভদ্রে দু-একটি এমন ঘটনা যে ঘটে না, তা না। এমন কিছু ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয় তারা। যেমন ২০১৩ সালে উন্নত দেশে এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে পিএইচডিতে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনা হলে তৎক্ষণাৎ তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ চ্যালেঞ্জ করে তিনি বলেন, ‘দেশ প্রথম, দল তারপর ও শেষে আমি।’ আর আমরা কী করি? চেষ্টা করি কালক্ষেপণের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষার। আর অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি হন নিজ ‘দলীয়’, তাহলে অভিযোগকারীকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক হেনস্তা থেকে বাঁচায়—এমন সাধ্যি কার।
উন্নত দেশে পিএইচডি গবেষণার গুণগত মান বজায় রাখতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যাবশ্যক। গবেষককে প্রথমেই ন্যূনতম ছয় মাস সময় দেওয়া হয় গবেষণাটি সম্পর্কে বিস্তর অনুসন্ধানের। প্রস্তাবিত বিষয়ে আগে কী করা হয়েছে, কী হয়নি এবং গবেষণার পদ্ধতিগুলো গবেষক খুঁজে বের করেন। মাসে বা পক্ষে অন্তত একবার তত্ত্বাবধায়ক প্যানেলের সঙ্গে বসে গবেষণার দিগ্‌দর্শন ঠিক করা বাঞ্ছনীয়। প্যানেল যদি মনে করে, প্রস্তাবিত বিষয়টি গবেষণার উপযুক্ত তবে প্রার্থী বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে জনসমক্ষে গবেষণাটি উপস্থাপন করেন।

উপস্থাপন শেষে যেকেউ প্রশ্ন করতে পারেন বা গবেষণার উন্নতিকল্পে প্রার্থীকে উপদেশ দিতে পারেন। মোদ্দাকথা, প্রার্থীকে গবেষণাটির সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনীয়তা বা উপযুক্ততা প্রমাণ করতে হবে। পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে তল্পিতল্পাসহ বাড়ি বা আরও সময় দিয়ে পূর্ব–প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আবার যেতে হয়। উত্তীর্ণ হলে শুরু হয় মূল কাজ। মাসে অন্তত একবার তথ্য-উপাত্তসহ প্যানেলকে গবেষণার অগ্রগতি অবহিত করতে হয়। একটা মিডটার্ম উপস্থাপনাও থাকে দেড় থেকে দুই বছরের মাথায়। যদিও পিএইচডির সময় অবস্থাভেদে ভিন্ন, তবে তিন বছরের আগে শেষ করার সুযোগ কম। সবকিছু সুচারুভাবে শেষ হলে বহিঃপরীক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক। নিয়ম হচ্ছে স্বনামধন্য পরীক্ষক নিয়োগ। দুজনের মধ্যে অন্তত একজন দেশের বাইরের হতে হবে, অন্যজন দেশের ভেতরের হলেও প্রতিষ্ঠান ভিন্ন হতেই হবে।

বিজ্ঞাপন

বলা বাহুল্য, গ্র্যাজুয়েট স্কুলের নিয়মকানুন মেনে (যেমন প্যানেলের কারও সঙ্গে প্রস্তাবিত পরীক্ষকের স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে কি না প্রভৃতি) তত্ত্বাবধায়ক প্যানেল পরীক্ষকদের নাম প্রস্তাব করে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে গ্র্যাজুয়েট স্কুল নতুন পরীক্ষক নিয়োগ করতে বলে। এরপর চৌর্যবৃত্তি যাচাই করে প্রধান তত্ত্বাবধায়কের স্বাক্ষরসহ গ্র্যাজুয়েট স্কুলে অভিসন্দর্ভ জমা দিতে হয়। পরীক্ষক দুজনকে দু-তিন মাসের মধ্যে অভিসন্দর্ভটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত দিতে বলা হয়। বলা দরকার, অভিসন্দর্ভ পরীক্ষাধীন অবস্থায় পরীক্ষকদের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্যানেলের কারও কোনো রকম যোগাযোগ দণ্ডনীয়। ফলাফল নেতিবাচক হলে প্রার্থী আপিল করতে পারেন বা প্যানেল নতুন কাউকে বিচারের সুপারিশ করতে পারে, তবে তা হতে হবে লিখিত নিয়মকানুনের মধ্যে।

সবশেষে বহিঃপরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ ধর্তব্যে নিয়ে সংশোধিত অভিসন্দর্ভ গ্র্যাজুয়েট কমিটিকে দাখিল করলে তারা পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডিগ্রির জন্য সুপারিশ করে। দেশে পিএইচডির নিয়মকানুন মোটাদাগে বিদেশের মতো হলেও প্রধান তত্ত্বাবধায়কের মতামতই এখানে শিরোধার্য। আর তত্ত্বাবধায়ক যদি ‘রাজনৈতিক’ভাবে পরাক্রমশালী হন, তবে পথ খুবই ‘মসৃণ’। বহিঃপরীক্ষকের মানে এখন ‘সমগোত্রীয়’ পছন্দের লোকজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিকালে একজনের বিষয় উপস্থাপনায় গিয়ে দেখি, গবেষণার উদ্দেশ্য মোট ১৭টি, যার প্রতিটা দিয়ে একটা পিএইচডি সম্ভব! উপস্থাপন শেষে প্রশ্ন করতেই শুরু হয় ব্যক্তিগত আক্রমণ, কেননা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তৎকালীন সময়ে অসীম ‘ক্ষমতাধর’। আর চৌর্যবৃত্তির কথা না-ই বললাম।

উন্নত দেশে পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক অনেকটাই পরামর্শক আর দেশে বিধায়ক বা যেকোনো রকমে পিএইচডি–বৈতরণি পার করে দেওয়ার কান্ডারি। উদ্দেশ্য দুটি: ১. তত্ত্বাবধানের সংখ্যা বাড়লে আর্থিক লাভ; ২. (পরবর্তী সময়ে) নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার সুযোগ। ফলে, সাম্প্রতিক কালে দেশে পিএইচডির সংখ্যা বাড়ছে ব্যাঙের ছাতার মতো, সেই সঙ্গে বাড়ছে জালিয়াতির সংখ্যা। অথচ গবেষণা সাময়িকী নেচার ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৬ হাজার ৩২০ জন পিএইচডি গবেষকের ওপর জরিপ করে জানাচ্ছে, ‘চ্যালেঞ্জিং হলেও পিএইচডির মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখার সুযোগ বিস্তর, যা মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। কিন্তু আমরা তার উল্টো, ইন্টারনেটের কল্যাণে শিখছি শুধু কাটপিস আর মোটাতাজা করছি সনদের ঝুলি।’
নিয়ম থাকলেও মানি কম, আর প্রচলিত নিয়মের অস্পষ্টতা এতটাই যে বলে শেষ করা যাবে না। তাই ব্যক্তি নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করেন। যাঁরা অল্প বা বিনা শ্রমে ডিগ্রি পেতে চান, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নিয়মের অস্পষ্টতা ‘রাজনীতির রং’ দিয়ে কাজে লাগান। আর যেখানে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান সবকিছুর নির্ণায়ক, সেখানে গবেষণায় জালিয়াতির ঘটনা রোধ করা কি সম্ভব?

বিজ্ঞাপন

খেলাধুলায় ভালো ফল একটা দেশকে বহির্বিশ্বে যেমন দ্রুত পরিচিতি দেয়, তেমনি গুণগত গবেষণা ও নিত্যনতুন উদ্ভাবনে রাষ্ট্রসহ প্রতিষ্ঠানের সুনাম রাতারাতি বাড়ে। অথচ আমরা করছি আত্মঘাতী কাজ, বাড়াচ্ছি জালিয়াতি পিএইচডি। আগাছা কিন্তু বাগানের সৌন্দর্য ও উদ্ভিদের স্বাভাবিকতাকে দ্রুত বিনাশ করে। জালিয়াতি ও চৌর্যবৃত্তির লাগাম না টানলে অবস্থা কিন্তু ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’-এর মতো হতে সময় লাগবে না। ‘তেজারতি বা খয়রাতি’ পিএইচডি দেশের ভরাডুবিকেই ত্বরান্বিত করবে।
সুতরাং, উচ্চতর গবেষণায় সুস্পষ্ট নিয়মকানুন আর সুশাসনের বিকল্প অন্য আর কি হতে পারে?


আশরাফ দেওয়ান স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন