বিজ্ঞাপন
পেশা হিসেবে পুরুষ কিংবা নারীবাচক শব্দগুলোর বিভাজন এখন আর আদৌ প্রয়োজন আছে কি না ভেবে দেখা প্রয়োজন। পেশার ক্ষেত্রে নারীর যোগ্যতাই মুখ্য হওয়া উচিত; লিঙ্গগত পরিচয় নয়। তাই বৈষম্য সৃষ্টিকারী এসব শব্দ শেখানোর মাধ্যমে শিশুমনকে জর্জরিত না করাই শ্রেয়

সম্প্রতি হাতে নিয়েছিলাম জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রণীত নবম ও দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ বইটি। বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদের শিরোনাম, ‘শব্দ প্রকরণ: পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ’। লিঙ্গ শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে সম্ভবত অধ্যায়টির নাম পরিবর্তন করে ‘পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ’ লেখা হয়েছে। বইয়ে প্রণীত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘বাংলা ভাষায় বহু বিশেষ্য পদ রয়েছে, যাদের কোনোটিতে পুরুষ ও কোনোটিতে স্ত্রী বোঝায়। যে শব্দে পুরুষ বোঝায়, তাকে পুরুষবাচক শব্দ আর যে শব্দে স্ত্রী বোঝায়, তাকে স্ত্রীবাচক শব্দ বলে।’ উভলিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গের উপস্থিতি এই বইয়ে চোখে পড়েনি। কিন্তু এই সংজ্ঞাও যথেষ্ট সংকীর্ণ এবং অসম্পূর্ণ। ব্যাকরণের লিঙ্গে আজ পর্যন্ত কখনোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি নারী কিংবা পুরুষ পরিচয়ের বাইরে থাকা বৈচিত্র্যময় লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষগুলোকে। নেই জেন্ডার-নিরপেক্ষ ধারণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানোর কোনো চেষ্টা। শুধু তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষবাচক শব্দের অর্থগত পার্থক্য বাড়িয়ে দিচ্ছে বৈষম্য।

‘পুরুষ’ শব্দের অর্থ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ না থাকলেও স্বয়ং ‘স্ত্রী’ শব্দটির অর্থ নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। ‘স্ত্রী’ শব্দটি যেমন মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তেমনি তা ব্যবহৃত হয় পশুপাখি, কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রেও। যেমন স্ত্রী হাতি, স্ত্রী পাখি, স্ত্রী মশা ইত্যাদি। বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধান ‘স্ত্রী’ শব্দটির অর্থ হিসেবে একদিকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করেছে জায়া, পত্নী, বেগম, বিবি, বধূ ইত্যাদিকে, তেমনি তা অন্তর্ভুক্ত করেছে নারী, রমণী, আওরত, কামিনী ইত্যাদিকেও। মনুষ্য সমাজে ‘স্ত্রী’ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি পুরুষের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ নারীকে। ফলে, ‘স্ত্রীবাচক’ শব্দটি নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। একই বইয়ে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষায় পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। ১. পতি ও পত্নীবাচক অর্থে এবং ২. পুরুষ ও মেয়ে বা স্ত্রীজাতীয় অর্থে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো পত্নী, মেয়ে বা স্ত্রীর মতো শব্দগুলো নারীর স্বকীয় অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয় না। নারী যেন পুরুষের স্ত্রী, পত্নী, জায়া অথবা কন্যা হিসেবেই স্বীকৃত। তাই বইপুস্তকে ‘স্ত্রীবাচক’ শব্দটির পরিবর্তে ‘নারীবাচক’ শব্দটি প্রচলনের ব্যাপারটি ভাবা যেতে পারে। ‘নারীবাচক’ শব্দটির ব্যবহার ‘স্ত্রীবাচক’ শব্দটির ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক এবং কাঙ্ক্ষিত।

বাংলা ভাষায় পুরুষ কিংবা নারীকে নির্দেশকারী শব্দের সংখ্যা অগুনতি। অনেক ক্ষেত্রেই এই শব্দগুলো পুরুষ কিংবা নারীর পৃথক অস্তিত্ব বোঝানোর জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটিও সত্য যে অনেক ক্ষেত্রেই এ শব্দগুলো তাদের উপযোগিতা হারিয়েছে। আবার অনেক পুরুষবাচক শব্দের বিপরীতে নারীবাচক যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রত্যাশিত নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই তা নারীর অস্তিত্ব ও অবদানকে ছোট করছে এবং নারীর সক্ষমতা ও গুণাবলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেখা গেছে, অনেক পুরুষবাচক শব্দের বিপরীতে নারীবাচক কোনো শব্দের অস্তিত্বই নেই। আবার সতিন, সৎমা, এয়ো, দাই, সধবার মতো শব্দের বিপরীতে পুরুষবাচক শব্দ না থাকার বিষয়টিতে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ অনুধাবন করা যায়। এর মাধ্যমে এ ধরনের সম্পর্ক কিংবা পেশায় শুধু নারীকেই কল্পনা করা হয়। বিষয়টি পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

পেশা হিসেবে পুরুষ কিংবা নারীবাচক শব্দগুলোর বিভাজন এখন আর আদৌ প্রয়োজন আছে কি না ভেবে দেখা প্রয়োজন। পেশার ক্ষেত্রে নারীর যোগ্যতাই মুখ্য হওয়া উচিত; লিঙ্গগত পরিচয় নয়। তাই বৈষম্য সৃষ্টিকারী এসব শব্দ শেখানোর মাধ্যমে শিশুমনকে জর্জরিত না করাই শ্রেয়। আবার কিছু পদবি আছে, যার বিপরীতে স্ত্রীবাচক কোনো শব্দের উপস্থিতি নেই। যেমন বিচারপতি, মন্ত্রী, সচিব, কমিশনার ইত্যাদি। এই শব্দগুলোকে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং বিতর্কের অবসান ঘটবে।

নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন