মতামত

জ্ঞানের রাজ্যে চৌর্যবৃত্তি

জ্ঞানের রাজ্যে চৌর্যবৃত্তি
বিজ্ঞাপন

১০-১২ বছর আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের গবেষণা জার্নালের সম্পাদনা পরিষদে মাত্র কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। রিভিউয়ারদের কাছ থেকে বেশ কিছু গবেষণা নিবন্ধ অনুমোদিত হয়ে এসেছে। কিছু নিবন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের, কয়েকটি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বা আইনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের। শেষোক্ত নিবন্ধগুলো চূড়ান্তভাবে আমাকে দেখে দিতে বলা হলো।

মন দিয়ে একটা নিবন্ধ পড়তে গিয়ে হোঁচট খেলাম। নিম্নমানের কয়েকটা প্যারাগ্রাফের পর চোস্ত ইংরেজির অসাধারণ একটা বিশ্লেষণমূলক প্যারাগ্রাফ। সন্দেহবশত গুগলে সেখানকার একটা বাক্য টাইপ করামাত্র মূল লেখা বের হয়ে এল। হুবহু তা একজন গবেষক মেরে দিয়েছেন কোনো রকম উদ্ধৃতি বা রেফারেন্স ছাড়াই। একে একে এমন তিনটি লেখায় এই চৌর্যবৃত্তি বা প্ল্যাজিয়ারিজম খুঁজে পেলাম। আশ্চর্যের বিষয়, এর মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের। আরও আশ্চর্যের বিষয়, রিভিউয়ারদের চোখে পড়েনি এসব অসংলগ্নতা।

প্ল্যাজিয়ারিজম তাই বলে শুধু অন্যরা নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কেউও করেন। এখানকার শিক্ষকদের চৌর্যবৃত্তির যে ভয়াবহ সংবাদ গত এক বছরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষকের (যথাক্রমে সাংবাদিকতা ও অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের) পাঁচ থেকে ছয়টি লেখায় চৌর্যবৃত্তি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে। চুরি তাঁরা করেছেন মিশেল ফুকো আর এডওয়ার্ড সাঈদের মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের লেখা থেকে, সেটাও পাতার পর পাতা হুবহু মেরে দিয়ে। এর আগে ফার্মাসি অনুষদের একজন শিক্ষকের পিএইচডি থিসিসের ৯৮ শতাংশ জাল প্রমাণিত হয়েছে প্ল্যাজিয়ারিজম ধরার সফটওয়্যারে। এই শিক্ষক চুরিটা করেছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের থিসিস মেরে দিয়ে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এসব প্রকাশিত ঘটনা। বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা বা এ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক কী পরিমাণ গবেষণা চুরি হচ্ছে, তা বের করার কোনো নিশ্ছিদ্র পদ্ধতি নেই। বিভিন্ন থিসিস ও গবেষণা নিবন্ধে চৌর্যবৃত্তি উদ্‌ঘাটনের সফটওয়্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করেছে মাত্র বছর তিনেক আগে। সেখানে প্রতিটি গবেষণাকর্ম পরীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা নেই। তা ছাড়া যাঁদের বিষয়ে অভিযোগ আসে, তাঁদের সবারটা সৎভাবে পরীক্ষা করা হয় কি না, কত শতাংশ চৌর্যবৃত্তি আমলে নেওয়ার মতো, আমলে নেওয়া হলেও তদন্ত কত দিনে হবে বা শাস্তির মাত্রা ঠিক কতটুকু, তার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়গুলো থাকে রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন রাজনৈতিক বিবেচনার খবর পত্রিকায় আমরা পাই কখনো কখনো। কিন্তু এখানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (মতামত প্রকাশ, যৌন হয়রানি বা চৌর্যবৃত্তি বিষয়ে) করা, তা আমলে নেওয়া, তদন্ত করা ও শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সে কারণে এটি বলা সম্ভব নয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির মাত্রা আসলে কতটুকু। পত্রিকায় যতটুকু খবর আসে, তাতে অন্তত আন্দাজ করা যায়, এটি মোটেও অনুল্লেখ্য নয়; বরং লজ্জাকর ও শোচনীয়।

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির মানে হচ্ছে অন্যের লেখা, বিশ্লেষণ বা চিন্তাকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া। চৌর্যবৃত্তি হয় সাধারণত তিন ধরনের:

এক. সরাসরি চৌর্যবৃত্তি। এখানে অন্যের লেখা বা তার অংশবিশেষকে হুবহু নিজের লেখায় ব্যবহার করা হয় কোনো সূত্র উল্লেখ না করে। উদ্দেশ্য থাকে পাঠককে এমন ধারণা দেওয়া যে লেখাটি তাঁর নিজের।

দুই. পরোক্ষ বা মোজাইক চৌর্যবৃত্তি। এতে অন্যের লেখা একটু এদিক–সেদিক করে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

তিন. অনিচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাবশত। এটি হয় অসাবধানতাবশত লেখার সূত্র ঠিকমতো টুকে নিতে ভুল করলে বা অনভিজ্ঞতার কারণে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উন্নত বিশ্বে এসব সমস্যা থাকে সাধারণত ছাত্রদের নিয়ে। সেখানে ছাত্ররা কখনো কখনো পরোক্ষ চুরি বা অনিচ্ছাকৃত ভুল করলেও হুবহু কারও লেখা মেরে দিয়েছেন, এমন ঘটনা ঘটে খুব কম। আর পেশাদার গবেষক বা শিক্ষকদের ক্ষেত্রে হুবহু চুরির কথা চিন্তাই করা যায় না। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে চৌর্যবৃত্তি শুধু নয়, সরাসরি বা হুবহু চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ মাঝেমধ্যেই ওঠে শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও।

বাংলাদেশের শিক্ষকেরা সাধারণত ছাত্রদের প্ল্যাজিয়ারিজম ধরতে আগ্রহী বা সচেষ্ট নন, এমন অভিযোগও আছে। ফলে ব্যতিক্রমেরা পড়েন নানা ঝামেলায়।

চৌর্যবৃত্তি তাই বলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলধারা নয়। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিভাগ ও ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে কেউ অন্যের লেখা মেরে দিয়েছেন, এমন অভিযোগ ওঠেনি। অনেক বিভাগে (যেমন আমাদের আইন বিভাগ) প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষক পিএইচডি বা উচ্চতর গবেষণা করেছেন, পাশ্চাত্যের এমন সব খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে এসব করার সুযোগই নেই। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার–পাঁচ বছর গবেষণা করে আসার পর কারও মধ্যে পরে এসব করার মনোবৃত্তি বা অযোগ্যতা থাকারও কথা নয়।

কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু বিভাগ আছে, যেখানে বেশির ভাগ শিক্ষক উচ্চতর গবেষণা করেন দেশে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজ বিভাগেই। তুলনামূলকভাবে এখানে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি উদ্‌ঘাটন করার প্রক্রিয়া, তাগিদ, উদ্দীপনা ও ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি দুর্বল। যেমন এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্ল্যাজিয়ারিজম কী, এটি উদ্‌ঘাটন কোন পদ্ধতিতে হবে, বিচারে শাস্তি কীভাবে নিরূপিত হবে; তার লিখিত ও সুনির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ডই নেই। ফার্মাসির যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৯৮ শতাংশ নকলের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁর পিএইচডি থিসিস এক বর্ণও না পড়ে স্বাক্ষর দিয়েছেন একজন সুপারভাইজার! তাঁর এত বড় অসততা ধরা পড়েনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো তদারকি পর্যায়েই। পাশ্চাত্যে এমন ঘটনা কোনোভাবেই ঘটতে পারে না তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিকে আরামদায়ক ও উৎসাহব্যঞ্জক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোও। আগে নিয়ম ছিল পিএইচডি করার সময় শিক্ষাছুটি নিতেই হবে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করা অবস্থায় কর্মরত থাকার সব সুবিধা (যেমন বিভিন্ন ভাতা ও সিনিয়রিটি) পান শিক্ষকেরা। ঘরসংসার, চাকরি করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কেউ পিএইচডি সম্পন্ন করে ফেলছেন মাত্র এক থেকে দেড় বছরে!

এ দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকে পাবলিকেশন করেন মূলত প্রমোশন পাওয়ার শর্ত পূরণের জন্য। কিন্তু সেখানে মান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা খুব দুর্বল। প্রমোশনের ক্ষেত্রে প্রকাশনার জন্য গৃহীত সনদকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, অনলাইনে ছাপা লেখা বিবেচ্য হচ্ছে মান পরীক্ষা না করে, অবাধে যেনতেন লেখা ছাপানোর জন্য অনুষদের জার্নাল বাদ দিয়ে কিছু বিভাগ নিজস্ব জার্নাল বের করছে, এক সামান্য লেখায় লেখক হিসেবে নাম দিচ্ছেন তিন–চারজন করে শিক্ষক। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, এত অনায়াসী ব্যবস্থার পরও কিছু শিক্ষক গবেষণার জন্য সামান্য কষ্টটুকু না করে করছেন প্ল্যাজিয়ারিজম।

জ্ঞানের রাজ্যে এই নৈরাজ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের সম্মানহানিই করে না; এটি বিশ্ববিদ্যালয়, তার শিক্ষক ও ছাত্রদের বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান ও গবেষণাবিমুখ একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সুনাগরিক সৃষ্টির সম্ভাবনাকে ব্যাহত করে।

প্ল্যাজিয়ারিজম বন্ধ করতে হলে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ইউজিসিকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্ল্যাজিয়ারিজম ও অন্যান্য একাডেমিক অসততা বন্ধের জন্য একাডেমিক ইন্টিগ্রিটি মডিউল প্রণয়ন করতে হবে, এ বিষয়ে নিয়মিত ওয়ার্কশপ বাধ্যতামূলক করতে হবে, সব গবেষণাকর্মের সততা ঘোষণা সংশ্লিষ্ট গবেষককে দিতে হবে, প্ল্যাজিয়ারিজম সফটওয়্যারের ব্যবহার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে, একাডেমিক অসততার ঘটনায় গবেষকের সঙ্গে সঙ্গে তদারকির সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষক–রাজনীতি শিক্ষকদের নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থাকে অনেকাংশে ধ্বংস করেছে। এ ব্যবস্থাকে কিছুটা পুনরুদ্ধার করার জন্য হলেও অন্তত ডিনের মতো একাডেমিক লিডার পদে নির্বাচন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একাডেমিক লিডারকে শিক্ষকদের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে না হলে প্ল্যাজিয়ারিজম বন্ধে তাঁর তাগিদটা বেশি থাকবে।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন