বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে, বাড়ছে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন। বৈশ্বিক সংযুক্তিও বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে লেনদেন ও বাণিজ্য এখন রিয়েল টাইমে করতে হচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে সময়ের ব্যবধানের কারণে ২৪ ঘণ্টাই এখন আর্থিক সেবা চালু রাখতে হচ্ছে। সেটি করতে গিয়ে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে লেনদেন ব্যবস্থা ব্যাহত হলে অর্থনীতিতে তার প্রতিঘাত পড়ে বহুগুণ। করোনায় আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন গতি লাভ করেছে। চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির গ্লোবাল সিইও সার্ভেতে উঠে এসেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তবে যেভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নজরদারি বাড়েনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। প্রতিষ্ঠানগুলো হার্ডওয়্যার কেনায় যত আগ্রহী, সফটওয়্যারে বিনিয়োগে তার সিকিভাগও না। ফলে সিকিউরিটি ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক ত্রুটি রয়ে যাচ্ছে। এ ত্রুটি যেকোনো সময় ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করতে পারে। লেনদেনে সাম্প্রতিক বিঘ্নকে তাই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

সাইবার প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকি এড়াতে তাই এ খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বিষয় দেখভালের জন্য শক্তিশালী বিশেষ উইং বা শাখা রয়েছে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সাম্প্রতিক পেমেন্ট বিপর্যয়ের পর নিজেই বলেছেন, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অধিকাংশ সময় ভেন্ডরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কাও থেকে যায়। এটি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজেরই দক্ষ প্রযুক্তি টিম থাকা অত্যাবশ্যক।

পেমেন্ট ব্যবস্থায় সৃষ্ট সমস্যার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বিটিসিএলের ইন্টারনেট লাইনের ত্রুটির কথা বলেছে। পেমেন্টের চাপ বেড়ে যাওয়ায় আকস্মিক এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও জানানো হয়। কিন্তু এ সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকে সংঘটিত রিজার্ভ কেলেঙ্কারিও কিন্তু এ ধরনের কারণেই ঘটেছে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে আবার কোনো কেলেঙ্কারি ঘটুক, তা নিশ্চয়ই কারও কাম্য নয়। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই তারানিজেদের কর্মকর্তাদের নিয়ে ২২ সদস্যের একটি পর্যালোচনা টিম গঠন করেছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুতই অভিজ্ঞ ও দক্ষদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন প্রয়োজন। দরকার হলে বিদেশ থেকে দক্ষ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আইটি অডিট করানো জরুরি বলেও অনেকে বলেছেন। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে লেনদেনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে, যার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘাড়েই বর্তাবে।

বর্তমানের আলোচিত কিছু প্রযুক্তি, যেমন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিটকয়েন, ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যাপক প্রসার লাভ করছে। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ব্যাংক ব্যবস্থার বেশির ভাগ সেবাই হবে অনলাইনভিত্তিক ২৪/৭ এবং তাৎক্ষণিক। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো প্রতিটি গ্রাহককে চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড বা বিশেষায়িত সেবা দিতে সক্ষম হবে। এ সবকিছু বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ভবিষ্যতে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় এবং ঝুঁকি হ্রাসে ব্যাংককে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।

সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের প্রযুক্তি খাতে বর্তমানে চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, সঠিক জায়গায় সঠিক লোকের অভাব; দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দের অভাব; তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নিরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সর্বশেষটি হলো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও নজরদারির ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংককে এসব বিষয় আমলে নিয়ে তার প্রযুক্তিগত রূপান্তরের রূপরেখা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের ক্রমাগত সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটালেই চলবে না, একই সঙ্গে তার ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। শক্তিশালী ব্যাকআপ সিস্টেম থাকাও আবশ্যক যাতে একটিতে ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প পথে সেবা চালু রাখা যায়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নজরদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, দুর্বল নিরাপত্তা অবকাঠামোগত কারণে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। সব ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম জোরদার করা হলেও এর জন্য যে নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন প্রয়োজন, সে বিষয়ে উদাসীন। এ জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোনো প্রযুক্তি রয়ে যাচ্ছে, আইটি গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এ সুযোগে হালনাগাদ প্রযুক্তির সার্বক্ষণিক যুক্ত থাকা হ্যাকারসহ অন্যান্য অসাধু চক্র সহজেই বাংলাদেশে সাইবার আক্রমণ চালাতে পারছে বা পারবে।

ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) অনেক কর্তৃপক্ষই সাইবার নিরাপত্তার হুমকি নিয়ে ব্যাংকগুলোকে অনেকবার সাবধান করেছে। আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়নের এ যুগে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সাইবার হামলা মোকাবিলায় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তিগত মজবুত নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এ জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর যেসব যন্ত্রপাতি ও ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অপারেটিং সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

মামুন রশীদ ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন