অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, ‘মোট ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার আওতায় আনার জন্য ভাগ ভাগ করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে টিকা দেওয়া হবে এবং প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হবে।’ কিন্তু এ গতিতে টিকা দিলে চার বছর সময় লাগবে। চার বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হবে!

টিকা দিলে বাঁচবে জীবন ও জীবিকা
পরিকল্পিতভাবে টিকার ব্যবস্থা করতে পারা দেশগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠছে। মূলত, এ কাতারে রয়েছে উন্নত-ধনী দেশগুলোই। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ইত্যাদি দেশ সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে দ্রুত টিকার আওতায় নিয়ে আসায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক কমাতে পেরেছে। এ দেশগুলোয় অভিঘাতের প্রথম কয়েক সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দ্রুততার সঙ্গে টিকা কার্যক্রম শুরু করলে এ হার কমে আসে।

তবে দরিদ্র দেশগুলো এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। টিকাসংক্রান্ত বৈশ্বিক সহযোগিতা চুক্তি (কোভ্যাক্স) এখনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। করোনার টিকা একটি গণদ্রব্য। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানিনিষেধাজ্ঞা এবং ধনী দেশগুলোর টিকা মজুতের কারণে কোভ্যাক্স টিকা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আবার টিকার মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত নয় বলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেরা উৎপাদনে যেতে পারছে না। নিজেরা উৎপাদনে না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেও সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না। গবেষণা বলছে, মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত করা গেলে এ বছরের মধ্যেই বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষ এবং ২০২২ সালের মধ্যে যারা চায়, তাদের সবাইকে এই টিকা দেওয়া সম্ভব।

টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্ন অবস্থান
টিকার ব্যবস্থাপনায় অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। কার্যক্রম শুরু থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র ৫৮ লাখের মতো মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। যাঁরা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন, সরবরাহ নেই বিধায় তাঁরাও পাচ্ছেন না। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে এশিয়ায় অবস্থান তলানিতে। এশিয়া অঞ্চলে গড়ে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ২৬ জনের ওপরে টিকা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ৬ জুন পর্যন্ত প্রতি ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ১ জনের জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে পেরেছে। বৈশ্বিক গড় (২৭ দশমিক ৬) থেকেও এ অবস্থান অনেক নিচে।

করোনা মহামারিতে ভারতের অবস্থা নাজুক। সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে আবার কবে নাগাদ টিকা আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে প্রয়োজন ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশল। এ পরিকল্পনায় টিকা বহুমাত্রিক উৎস থেকে সংগ্রহ এবং নিজস্ব উৎপাদন—দুই ব্যবস্থাই রাখা দরকার ছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তা না করে টিকা সংগ্রহে একক নির্ভরতার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতে সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন এবং চুক্তি অনুযায়ী টিকা রপ্তানির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সমর্থ হচ্ছে না।

নিজস্ব উৎপাদনের বিকল্প নেই
নিজস্ব উৎপাদন ছাড়া ব্যাপক ভিত্তিতে সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা অনিশ্চিত। আবার কেবল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ধরনের গণনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অথচ ১০ বছর আগেও মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জলাতঙ্ক রোগের টিকা উৎপাদনে সক্ষম ছিল। কিন্তু বিদেশ থেকে টিকা এনে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ওপর জোর দেওয়া হলে সে সক্ষমতা কমতে থাকে। অবহেলা, অদূরদর্শিতা, অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির টিকা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

এখন বিদেশ থেকে কোভিড-১৯ টিকা ক্রয় এবং কোভ্যাক্স থেকে পর্যাপ্ত টিকা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় নিজস্ব উৎপাদনের কথা ভাবা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী ভারত নিজেদের টিকা নিজেরাই উৎপাদন করছে। চীনের সহায়তায় পাকিস্তানেও নিজস্ব টিকা উৎপাদন শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি দেশে আন্তর্জাতিক মানের টিকা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যৌথভাবে টিকা তৈরির জন্য চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে করোনার টিকা উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের একমাত্র ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ করোনার অভিঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাশিত ছিল। দেরিতে নিজস্ব উৎপাদনের চিন্তা শুরু হলেও এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত এ ব্যবস্থা করা না গেলে সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে যাবে।

বহুপাক্ষিকতা ও সঠিক নীতি-কৌশল
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) করোনা অভিঘাতে সৃষ্ট সংকটকে মারাত্মক বিভাজন বলে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির মতে, সংকটের টেকসই মোকাবিলা করা না গেলে বড় ধরনের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে যেকোনো মহামারি শেষে দেশে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেড়েছে। সংকট থেকে উত্তরণে সঠিক নীতি-কৌশল নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। যেমন ১৯২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হারবার্ট হুবার ৪৪৪টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়ে বিরাট বিজয় পেয়েছিলেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বিভিন্ন কমিশন করেছিলেন; জনগণ পছন্দ করেছিল। কিন্তু তিরিশের দশকের মহামন্দাকালে পরামর্শকদের ‘সবকিছু আপনা-আপনি বাজার ঠিক করে দেবে’ নীতির ভ্রান্তিজালে জড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সক্রিয়তা না দেখানোয় চার বছর পরেই, ১৯৩৬ সালে, হুবার মাত্র ৫৯ ভোট পেয়েছিলেন। বিপরীতে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ৪৭২টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়ে ‘নিউ ডিল’ বাস্তবায়ন করে চারবার প্রেসিডেন্ট হয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন।
সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করাই নীতি-কৌশলের মূল অগ্রাধিকার হতে হবে। টিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, জীবন, জীবিকা—কিছুই নিশ্চিত করা যাবে না। এ জন্য বহুপক্ষীয় উৎস থেকে টিকা সরবরাহের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে নিজস্ব উৎপাদনে যেতে হবে; তবেই জীবন ও জীবিকা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর চেয়ারপারসন
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন