প্রায় এক দশক আগে নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত শেষ করার জন্য দেশের সবচেয়ে চৌকস বলে কথিত বাহিনীও গত ২৬ এপ্রিল ৮৮তম বারের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় নিয়েছে। সময় নেওয়ার শতক পূর্ণ হলেও ওই তদন্ত শেষ হবে, এমন আশা কেউ করেন কি না, জানি না।

ভারতের জাতীয় বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) একটি প্রতিবেদন ছেপেছে দেশটির প্রধান বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদপত্র বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। তাতে লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকার সুজানা স্যাভেজ নামের এক সাংবাদিকের একটি টুইট উদ্ধৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন প্রযুক্তি আইন সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে লেখা প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সুজানার টুইটে বলা হচ্ছে, তাঁকে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং পরে দেশ থেকে বের করে দিয়েছেন। ‘বাংলাদেশি টেক ল উড গ্যাগ জার্নালিস্ট, এম্বেড অথরিটারিয়ানিজম’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার যে ধরনের নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হয়েছে, তা এক ভয়ের সংস্কৃতি, আতঙ্ক ও ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের জন্ম দেবে।

সুজানার আলোচিত টুইটটিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি হাসপাতালে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর বাসায় ফেরার ছবি দিয়ে বলেছেন, ঢাকা থেকে ফেরার পর দৈহিক-মানসিক আঘাতের কারণে তাঁর মস্তিষ্কে একধরনের সমস্যা (ব্রেন অ্যানিউরিজম) দেখা দেয়, যাতে হঠাৎ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি অবশ্য এর আগেও গত বছরের ২৩ আগস্ট ইকোনমিস্ট–এর এক পডকাস্টে ঢাকায় তাঁর হেনস্তা হওয়ার কথা বলেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁর এই অভিযোগের কোনো জবাব বা ব্যাখ্যা দিয়েছে বলে শুনিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিষয়টির উল্লেখ একেবারে উপেক্ষণীয় বিষয় নয়।

পিটিআইয়ের ভাষ্যমতে, কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চেয়েও নতুন আইন কঠোরতর এবং বাংলাদেশকে তা কার্যত একটি নজরদারিমূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করবে। ভিন্নমত, বাক্‌স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার শেষ সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গণমাধ্যমশিল্পের উল্লেখযোগ্য বিকাশ হলেও অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম বর্তমান সরকারের সমর্থক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের মালিকানার মধ্যে এক অসৎ যোগসাজশের প্রতিফলন মেলে। দলীয়ভাবে লাইসেন্স দেওয়া, তাদের আয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিবর্তনমূলক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সীমারেখা সরকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থাটি লিখেছে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র (অ্যাপারেটাস) ব্যবহার করে ‘অদৃশ্য ভীতি’ তৈরি করা হচ্ছে। নিবর্তনমূলক নিয়ন্ত্রণের আইনি ব্যবস্থা ছাড়াও গণমাধ্যমের রাজনৈতিক মালিকানার দ্রুত বিস্তারের কারণে গণমাধ্যমে যে ধরনের নীতিমালা দাঁড়িয়েছে, তা অবাধ তথ্যপ্রবাহে বাধা তৈরি করছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। টেলিভিশন এবং সংবাদপত্র সাংবাদিকতার প্রশ্নে অব্যাহতভাবে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা স্বনিয়ন্ত্রণ ও সরকারের সমালোচনামূলক কণ্ঠ ও মতামত এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে টিকে আছে।

বিশ্বজুড়ে জনতুষ্টিবাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতাদের উত্থান ও গণতন্ত্র দুর্বল হতে থাকার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধও রণাঙ্গনের বাইরের স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য নতুন হুমকি যোগ করেছে। ঢাকায় রুশ দূতাবাসের সাম্প্রতিক বিবৃতির কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যায়। যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল মাধ্যমেও চলছে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং ভুয়া খবর ও অপপ্রচার।

‘আর মাইরেন না, নিউজ করব না’—বলে প্রলাপ বকা অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন চট্টগ্রামের যে সাংবাদিক, সেই গোলাম সারোয়ারের কথা আমরা সবাই হয়তো বিস্মৃত হয়েছি। আজকের সূর্যোদয় নামের একটি পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর এই সাংবাদিক একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাইয়ের অনিয়ম-অন্যায়ের খবর প্রকাশ করার কারণে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অপহরণকারীরা তিন দিন ধরে অকথ্য নির্যাতন চালানোর পর ২০২০ সালের পয়লা নভেম্বর তাঁকে সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরার এক খালপাড়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল। গত বছরেও মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসে তাঁর দুর্ভোগের কথা লিখেছিলাম। এবার লিখতে হচ্ছে তাঁকে নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতার কথা। পুলিশ তদন্ত করে তাঁকে অপহরণের কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। তারপর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো সেই মন্ত্রীর ভাইয়ের উল্টো দায়ের করা কথিত মানহানির মামলা তদন্ত করেছে পুলিশের বিশেষায়িত শাখা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের কারণে অনেক দিন গৃহবন্দী থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি এলাকাছাড়া হয়েছেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যে ভিন্নমত প্রকাশ ও সমালোচকদের ‘শিক্ষা’ দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, তা সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতেও স্পষ্ট। এই আইনে জামিন পাওয়া একটু কঠিন। আদালতের জামিন দেওয়ার ক্ষমতা যতটুকু আছে এবং জামিন পাওয়ার অধিকার আইনে স্বীকৃত হলেও ডিজিটাল আইনের মামলায় জামিন না দেওয়াই রীতি হয়ে গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তিন বছর পূর্তিতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ওই আইনে তাঁরা ৬৬৮টি মামলার সন্ধান পেয়েছেন (সরকারিভাবে এর কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি)। এসব মামলার ৮৫ শতাংশই করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি চারজনে একজন হলেন সাংবাদিক। যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সাংবাদিকের সংখ্যাও অসমভাবে বেশি। গ্রেপ্তারকৃত ৪৯৯ জনের মধ্যে ৪২ জনই সাংবাদিক।

বিশ্বজুড়ে জনতুষ্টিবাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতাদের উত্থান ও গণতন্ত্র দুর্বল হতে থাকার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধও রণাঙ্গনের বাইরের স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য নতুন হুমকি যোগ করেছে। ঢাকায় রুশ দূতাবাসের সাম্প্রতিক বিবৃতির কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যায়। যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল মাধ্যমেও চলছে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং ভুয়া খবর ও অপপ্রচার।

মুক্ত সাংবাদিকতায় কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণের নতুন ক্ষেত্র হচ্ছে ডিজিটাল জগৎ। এই পটভূমিতে ইউনেসকো এবারের মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে ‘ডিজিটাল অবরোধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা’ (জার্নালিজম আন্ডার ডিজিটাল সিজ)। এই ডিজিটাল অবরোধ ঠেকানো বা ভাঙাই এখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রধান করণীয়। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে ওই সব দেশ যেন স্বদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে; আইন তৈরি ও প্রয়োগের বেলায় এমন কিছু না করে, যার অনুকরণে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এই স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে; সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণের আইন যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মান অনুযায়ী হয়; গুজব মোকাবিলার লড়াই যেন এমন না হয়, যা নিবর্তনমূলক সরকারগুলোকে আরও খারাপ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ করে দেয়; সাংবাদিক এবং নাগরিক গোষ্ঠীর ওপর বেআইনি নজরদারি থেকে নিবৃত্ত থাকা; সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার প্রতি শূন্য সহনশীলতা; সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর হামলার জন্য সরকারগুলোর জবাবদিহির বিষয়টিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থান দেওয়া।

সাংবাদিক ও ভিন্নমতের ওপর হামলার জন্য জবাবদিহির বিষয়টিকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে না হলেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে নেওয়ার কাজটি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র করেছে বছরখানেক আগেই। আমাদের মতো দেশগুলোতে তা অবশ্য খুব একটা আলোচিত হয়নি, যেমনটি হয়েছে মানবাধিকারের বিষয়টিতে। ম্যাগনেটস্কি আইনে র‍্যাবের সাতজন কর্মকর্তা ও পুরো বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণেই আমরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এই উপাদানের কথা জানি। সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা এবং দেশে-বিদেশে হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য অনুরূপ আরেকটি নিষেধাজ্ঞার আইন হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট–এর সাংবাদিক সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডের পর। ওই নিষেধাজ্ঞা ‘খাসোগি নিষেধাজ্ঞা’ নামে পরিচিত এবং এই আইন প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছে সৌদি আরবের ওপর, যখন দেশটির ৭৬ জন কর্মকর্তা ও নাগরিকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বেলারুশের অজ্ঞাতসংখ্যক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, কার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, তারা তা আগাম না–ও প্রকাশ করতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষায় যৌথভাবে বেশ কিছু কার্যক্রম নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় এখন সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ডিজিটাল অবরোধ কতটা অলঙ্ঘনীয় হতে চলেছে, তার ইঙ্গিত সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওটিটি আইন ও উপাত্ত সুরক্ষা আইনের খসড়ায় বোঝা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলো মোকাবিলায় আমরা কি আমাদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হব, নাকি রাজনীতি ও স্বার্থের ভেলায় ভেসে যাব?

কামাল আহমেদ সাংবাদিক