বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ আবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করতে হবে তিনটি কারণে। প্রথমত, যে আইন নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, সেটির বিভিন্ন দিক এবং প্রয়োগ। এ আইনে যেভাবে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটি নাগরিকের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনে এমনকি সংক্ষুব্ধ নয়—এমন ব্যক্তিকেও মামলা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ‘ভিজিল্যান্টি জাস্টিস’-এর সমার্থক। তা ছাড়া দেশের ভাবমূর্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো বিষয় রাখা হয়েছে, যেগুলো ব্যাখ্যার ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। ২০১৮ সালে চালু করা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে গত কয়েক বছরে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। সম্পাদক পরিষদ থেকে শুরু করে দেশের ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলে আসছে যে এ আইনের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের দেওয়া অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণার কাজে আমি এবং আমার গবেষণা সহযোগীরা যুক্ত। এ সময় আমরা লক্ষ করেছি, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তির উপায় সীমিত। এ গবেষণা প্রকল্পের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনে আমরা সেটা উল্লেখ করেছিলাম, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্বচ্ছ এবং সুস্পষ্ট তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অনীহা আছে (‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে’, সিজিএস, অক্টোবর ২০২১)। সিজিএসের প্রকল্পের আওতায় আমরা ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৫৪টি মামলার তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি।

এ আইনের প্রয়োগের বিষয়ে আমরা সবাই জানি, এটি বেশুমারভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যে কারণে দেশের আটটি বিভাগে সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেও সব মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি লেখক মুশতাক আহমেদ কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। আর কত লোক আটক আছেন, কে কত দিন ধরে আটক আছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কী, তাঁরা বিচারের আগেই শাস্তি ভোগ করছেন কি না— তথ্য না থাকায় এসব কিছুই জানা যাচ্ছে না। সাদ হাম্মাদি যে হিসাব চেয়েছেন, সেটা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

এ আইন কীভাবে কেবল ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে আমাদের গবেষণায়। যে অভিযোগকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় সংগ্রহ করা গেছে, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলোর সদস্য। এটি হচ্ছে ১৬৯ জনের বিষয়ে পাওয়া তথ্য। স্বচ্ছতা থাকলে এবং পরিপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে এ আইনের অপব্যবহার ও কীভাবে তা কেবল ভিন্নমত দমনে একটি দলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, সে ব্যাপারে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত।

সাংবাদিকদের ওপরে এ আইন নিয়ন্ত্রণের খড়্গ ঝুলিয়ে দিয়েছে। এটি সরকার যে বোঝে তা সম্প্রতি আবার প্রমাণিত হয়েছে; আইনমন্ত্রী বলেছেন, এ আইনে অভিযুক্ত সাংবাদিকদের ব্যাপারে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে করে তাঁরা আটক না হন। কোনো দেশে একই আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যে ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারেন না, সেটা আইনমন্ত্রীর ভালো বোঝার কথা। এ বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এটা স্পষ্ট যে এ আইন এবং আইনের প্রয়োগ দুই-ই রাজনীতি দিয়ে নির্ধারিত, ফলে পুলিশ যখন তথ্য দিতে অনীহ, তখনো বুঝতে হবে যে এর পেছনেও রাজনীতিই মুখ্য। তথ্য কমিশন সেটা বিবেচনায় নেবে কি না, এখন সেটা দেখার বিষয়।

দ্বিতীয় যে কারণে এ শুনানি এবং তথ্য কমিশনের সম্ভাব্য আদেশ আমাদের মনোযোগ দাবি করে, তা হলো তথ্য কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে কি না, সেটা দেখার সুযোগ। স্মরণ করা দরকার, এ কমিশনের কাজ কী? উইকিপিডিয়ায় দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, কমিশনের প্রধান কাজ হচ্ছে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান এবং তথ্য সহজলভ্য করার পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ সম্পর্কে নাগরিকগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা। [এর মাধ্যমে] কর্তৃপক্ষগুলোর দুর্নীতি হ্রাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, জনগণের কাছে জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা।’ এ বক্তব্য বাস্তবে কতটা কার্যকর, তার খুব বেশি প্রমাণ ২০০৯ সাল থেকে তথ্য কমিশনের কাজে দেখা যায়নি।

তৃতীয় যে কারণে এ মামলা আমাদের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে পুলিশ এবং পুলিশের পক্ষের আইনজীবী তাইফুল সিরাজের বক্তব্য। পুলিশ তথ্য দেয়নি এ যুক্তিতে যে তাতে করে আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। সবার জ্ঞাত একটি আইনের ব্যবহার বিষয়ে তথ্য বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য এবং আইন যে যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়েছে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য দরকার। পুলিশের যুক্তি তার বিপরীতে। আইনের শাসন মানে কেবল আইনের মাধ্যমে বিচার নয়, আইনটি যথাযথ কি না এবং তা যথাযথভাবে প্রযুক্ত হচ্ছে কি না, সেটা নাগরিকদের জানা আইনের শাসনের অবিভাজ্য অংশ। এ আইনের অপপ্রয়োগ না হয়ে থাকলে পুলিশ এ তথ্য দিতে অস্বীকার করছে কেন? পুলিশের পক্ষে আইনজীবী বলছেন, যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা ‘সংবেদনশীল’। তিনি তাঁর ব্যাখ্যা দেননি। প্রশ্ন হচ্ছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় এমন কী বিষয় থাকতে পারে, যা জানার অধিকার মানবাধিকারকর্মীদের থাকতে পারে না? প্রকাশ্য আদালতে যে বিচার সম্পাদিত হবে, সেখানেও কি এসব তথ্য বলা হবে না? তাহলে এসব বিচার কি ক্যামেরা ট্রায়াল?

আইনজীবী তাইফুল সিরাজ আবেদনকারী কোথায় আছেন, সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন (প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি ২০২১)। সাদ হাম্মাদি কর্মসূত্রে শ্রীলঙ্কায় আছেন। তিনি অন্যত্রও থাকতে পারতেন। বাংলাদেশের একজন নাগরিক দেশের বাইরে থেকে তাঁর অধিকার হিসেবে তথ্য চাইলে, তা কেন একজন আইনজীবীর কাছে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে মনে হবে, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। দেশের বাইরে থাকার কারণে তাঁর অধিকার কি হ্রাস পায়?

আশা করি, তথ্য কমিশন এভাবে বিবেচনা করবে না। এটাও ঠিক যে নির্বাচন কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের আচরণ থেকে এসব বিষয়ে আশার জায়গা কম। যেখানে সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নেই, সেখানে বিশেষ কোনো কমিশনের কাছ থেকে আশা করা কঠিন। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ দায়িত্ব এ কমিশনের। সে কারণেই আমরা ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তথ্য কমিশন এ পরীক্ষায় কী ফল করে তা দেখতে।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন