বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত বছর নভেম্বরে ডেঙ্গুর সহজ চিকিৎসা উদ্ভাবনের খবর এসেছিল। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু চিকিৎসায় এলট্রোম্বোপ্যাগ ওষুধ ভালো কাজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের একদল বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক এ গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন। ঢাকায় ১০১ জন রোগীর ওপর চলে এ গবেষণা। এলট্রোম্বোপ্যাগ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম বলে দাবি করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।

চিকিৎসা প্রটোকল গাইডলাইন প্রয়োজন রোগ সারানোর জন্য। কিন্তু রোগটা যাতে না ফিরে আসে, সে জন্য আমরা কী করেছি? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, করোনা নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে ভাবার সময় ছিল কই? তাই বুঝি শুধু ডেঙ্গু নিয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য এখন একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত বিধিনিষেধের আগে নাকি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এখন বিধিনিষেধ কেটে গেছে। শিগগির তাঁরা সভায় মিলিত হবেন। মন্ত্রণালয়ের ছয়জন প্রতিনিধি ছাড়া বাকি তিনজন ঢাকা উত্তর আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি। প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। নতুন এই উপদেষ্টামূলক কমিটির কাজ হবে মশা মারার কার্যকর ওষুধের (কীটনাশক) বিষয়ে মতামত দেওয়া, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পথ বাতলানো আর গবেষণায় সাহায্য করা।

নতুন দপ্তর, অধিদপ্তর, সেল বা কমিটি যা-ই গঠন করা হোক না কেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ওষুধ বা কীটনাশক ছিটানোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান। যদিও ২০ বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মশার আবাসস্থল ধ্বংসের এবং সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মতো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। সারা বছর ঘুমিয়ে থেকে মশার প্রজনন মৌসুমে এসে ওষুধ ছিটিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে তা কাজে আসবে না। একটা সংবাৎসরিক সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ছাড়া এডিসকে বাগে আনা সম্ভব নয়। নয়তো আমরা কীটনাশক কেনাবেচা, ধরপাকড় ও জরিমানার চক্রেই পড়ে থাকব। মশা যাবে না, ডেঙ্গুও ছড়াবে।

যা থাকতে হবে এই সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনায়

কমপক্ষে পাঁচ ধরনের কাজ একসঙ্গে সারা বছর ধরে করতে হবে। এডিস যেহেতু মূলত গৃহবাসী মশা, তাই নাগরিকদের সবার আগে পুরো অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই সম্পৃক্ততা থাকবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন, নজরদারি, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়নসহ সব স্তরে। ডেঙ্গু এখন আর ঢাকার চৌহদ্দির মধ্যে আটকে নেই, ছড়িয়ে গেছে সারা দেশে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা অন্যান্য সিটি করপোরেশনের এডিস নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রস্তুতিই নেই। তারা এডিস-সংক্রান্ত সমস্যার ফাঁদে আগে কখনো পড়েনি। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া শুধু সরকারি কর্মকাণ্ড দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। দ্বিতীয় কাজটা হবে একটা সর্বসম্মত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হবে এডিস মশা জন্মানোর সব উৎসের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা এবং উৎসগুলো ধ্বংস করা। মনে রাখতে হবে, উপযুক্ত স্থান পেলে এডিসের ডিম দুই থেকে তিন বছর ঘুমিয়ে থাকতে পারে। তৃতীয় উপায় হচ্ছে জৈবিক ব্যবস্থাপনা বা বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল। এর জন্য অনেকগুলো উপাদান রয়েছে। যেমন সাইক্লক্স, ব্যাকটেরিয়া, উলভাকিয়াজাতীয় মশা—এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিল গেটস ফাউন্ডেশন ইন্দোনেশিয়ায় এ বিষয়ে প্রাথমিক গবেষণায় ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

চার নম্বর পথ হবে কেমিক্যাল কন্ট্রোল বা কীটনাশক প্রয়োগ। তবে এই কাজে বুঝেসুঝে এগোতে হবে। উড়ন্ত মশার জন্য যে কীটনাশক, তা দিয়ে বাচ্চা মশা বা লার্ভা মারা যাবে না। লার্ভা মারার জন্য ওষুধ দিতে হয় পানিতে আর উড়ন্ত মশা মারার জন্য দিতে হয় বাইরে। আবার এডিস আর কিউলেক্সের ‘ফাঁসি এক দড়িতে’ হয় না। কীটনাশক যেটাই হোক, সেটা সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নজরদারি।

শেষ কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হচ্ছে নিরাময় ও প্রতিরোধ উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক গবেষণা চালু রাখা, আর তার ফলাফলকে আমলে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। চিকিৎসা প্রটোকল বা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা, ওষুধের কার্যকারিতা নিরীক্ষা আর শিশুদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা ছাড়া এগোনোর কোনো পথ নেই। পৃথিবীর নানা দেশে ডেঙ্গুমুক্তির উপায় নিয়ে নানা গবেষণা হচ্ছে। আমাদের সেসব গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন টিম থাকা দরকার। স্বতন্ত্র কোনো টিম না হলে যেকোনো মনিটরিং পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট হতে পারে। নিয়ত ঠিক থাকলে এর কোনোটাই অসম্ভব নয়, আর তার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকারও দরকার নেই।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

nayeem 5508 @gmail.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন