বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেই কুনজর কাটানোর জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার তাবিজ-কবচ যেহেতু তিনি নেবেন না, তাই চাকরি খুঁজতে হচ্ছিল তাঁর প্রিয় পেশা শিক্ষকতার বাইরে।

অপুকে ভালো করে জানতেন তাঁর সরাসরি শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ফাহমিদুল হক। নিজ ছাত্রের শোকে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অপুকে ধারণ করার যোগ্যতা সিস্টেমের নেই...মেধাবী ছাত্র ছিল, সত্যিকারের মেধাবী। ফল ভালোও করত। তবে গতানুগতিক ভালো ফল করাদের মতো সে ক্লাসে খুব নিয়মিত ছিল না। সে প্রশ্ন করত, প্রতিবাদ করত। ষাটের দশক কিংবা নিদেনপক্ষে আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শিক্ষার্থী নিয়ে গর্ব করত, যাদের কারণে ছাত্র আন্দোলন বিষয়টা একটা স্বর্ণালি এক রোমান্টিসিজম এখন, অপু ছিল সে ধরনের শিক্ষার্থী।

অনার্সে সে থার্ড হয়েছিল। অনার্সের রেজাল্টের পর একদিন অপুকে বললাম, মাস্টার্সের এক বছর বাড়তি একটু মনোযোগ দিলেই তুমি প্রথম হতে পারবা। সে বলল, আমি তো প্রথমই হতাম অনার্সে। হিসাব করে দেখেছি, একজন মাত্র শিক্ষক সেই প্রথম বর্ষ থেকে যে পরিমাণ কম নম্বর দিয়ে আসছেন, ওনার কোর্সে অ্যাভারেজ নম্বর পেলেই প্রথম হতাম। অপু আত্মহত্যা করেছে শুনছি। সিস্টেম কীভাবে প্রখর এক তরুণকে এদিকে ঠেলে দিতে পারে, তার একটি মাত্র উদাহরণ দিলাম।’

দুর্ভাগ্যের হাওয়া আপনা থেকে বয় না। পেছনে কারও কুবাতাসের ঝাপটা দেওয়া থাকে। ফাহমিদুল হক আরও লিখেছেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করত, প্রশ্ন করত, ওই শিক্ষক সাধারণত তাদের অপছন্দ করেন এবং বেছে বেছে ভিকটিমাইজ করেন। তিনি আবার সব ধরনের ভিসির প্রিয়পাত্র থাকেন, ফলে তিনি এসব করে পারও পেয়ে যান...অবশ্য বিভাগের সেই সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই তেমন ছিল না যে একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে টার্গেট করে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার তদন্ত করার বা ব্যবস্থা নেওয়ার। আমাদের সিস্টেম অপুদের হতাশ হতে বাধ্য করে। সেই সিস্টেম, সেই শিক্ষককে আরও বেশি ক্ষমতাবান করেছে পরে।’

এরপর আর বলার কী থাকতে পারে? যে ছেলে হতো একজন ভালো শিক্ষক, যে আরও জোরের সঙ্গে দাঁড়াতে পারত অধিকারের পক্ষে, যাকে দেখে একই সঙ্গে পড়ালেখা ও প্রতিবাদে আগ্রহী হতো তরুণ-তরুণীরা, যে হয়তো পরিণত বয়সে একজন উজ্জ্বল ও দায়বান বিদ্বান হিসেবে দেশকে সেবা করত, সে এখন ঘুমিয়ে আছে ছয় ফুট মাটির নিচে? প্রতিভার কী অপূরণীয় ধ্বংস করে যায় আমাদের সিস্টেম!

সিস্টেম তো ব্যক্তিরাই চালান। এ রকম একজন ব্যক্তি হলেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন। তিনি আবার সেখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা প্রথম বর্ষের পরীক্ষা পেছানোর দাবি তুলেছিলেন। এর শোধ তিনি নেন পরীক্ষার হলে। ধরে ধরে ১৪ জন ছাত্রের চুল কাঁচি দিয়ে এমনভাবে কেটে দেন যে পরে তাঁদের প্রত্যেককেই মাথা ন্যাড়া করতে হয়। তাঁদের মধ্যে একজন আবার লাঞ্ছনার দংশনে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খান। শেষ খবর অনুযায়ী তাঁর অবস্থা ছিল গুরুতর।

আমরা শিখেছিলাম, শিশুকালে শিক্ষকেরা আদর করে শেখান, মাঝেমধ্যে শাসনও করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর শিক্ষকেরা হয়ে যান বন্ধু। কিন্তু এই শিক্ষক দেখছি সামরিক আইন প্রশাসকের মতো, তালেবানদের মতো। তাঁর জন্যই বোধ হয় কবি শহীদ কাদরী লিখেছিলেন এই কবিতা—

‘চুলের চটুল অহংকার সহনীয় নয় কোনো সুধীমণ্ডলীর কাছে
অতএব বেঁটে হ’তে হবে তাকে,
এক মাপে ছাঁটা সুন্দর মসৃণ শান্ত শীতলপাটির মতো
নিঃশব্দে থাকবে হবে শুয়ে
মাথার মণ্ডপে।
তবু সে আমার চুল
অন্ধ মূক ও বধির চুল মাস না যেতেই
আহত অশ্বের মতো আবার লাফিয়ে উঠছে অবিরাম।’
(শহীদ কাদরী/সেলুনে যাওয়ার আগে)

এ কেমন দেশ হলো যেখানে জীবন জিয়ে না, তরুণ জিয়ে না? আমরা কি জানি, আমরা কী হারাচ্ছি? রাষ্ট্রপক্ষ না বুঝুক, আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজপক্ষকে বুঝতে হবে, ছোট প্রাণে বড় ব্যথা দিয়ে দিয়ে আসলে হত্যা করা হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎকে। সেই ভবিষ্যৎ অনেক তরুণ-তরুণীর বুকে বাঁচানোর এসওএস বার্তা হয়ে বাজছে। আমরা কি শুনতে পারছি?

কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন স্বাধীনতার পরপর। সে সময়ও তরুণদের চুল কেটে দেওয়া হতো। এরশাদশাহিও যুবকদের বড় চুলে ভয় পেত। তরুণেরা তো অশ্বের মতোই হবে, শামুকের মতো গুটিয়ে থাকা হবে না। কিন্তু তাদের আত্মসম্মান গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের কথা পছন্দ না হলে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে আটক করা হচ্ছে। প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলনকারীদের জেলে নেওয়া হচ্ছে।

কিশোর আন্দোলনের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, কিশোর-তরুণদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় ধরে ধরে চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের তরবারি মাথার ওপর ঝুলছে। তার মধ্যেও কেউ কথা বললে আটক হচ্ছে। চাটুকার নয়, এমন তরুণ-তরুণীদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে হতাশা, নেশা ও আত্মহত্যার দিকে। গত ১০ বছরে প্রবল সক্রিয় আন্দোলনকারীদের বেশ কজনের আত্মহত্যা গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

করোনার মহামারি ছিল সার্বিক দুরবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। গত দুই বছর প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বা ছাত্রীর আত্মহত্যার খবর আসে পত্রিকায়। গত এক বছরে সারা দেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। তাঁদের মধ্যে নারীরাই বেশি।

আত্মহত্যার ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী রয়েছেন ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকই তরুণ। ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৩৫ ও ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১১ শতাংশ। সবচেয়ে কম আত্মহননকারী হচ্ছেন ৪৬ থেকে ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা, ৫ শতাংশ। হিসাব বলে, ৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিরাই বেশি ঝুঁকিতে। (প্রথম আলো, ১৩ মার্চ ২০২১)

এ কেমন দেশ হলো যেখানে জীবন জিয়ে না, তরুণ জিয়ে না? আমরা কি জানি, আমরা কী হারাচ্ছি? বাটারফ্লাই ইফেক্ট নামে একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা আছে। এক ব্যক্তি টাইম মেশিনে লাখো বছর আগে ফিরে গিয়ে ভুলবশত জুতার চাপায় একটা প্রজাপতি হত্যা করে। পরে বর্তমান সময়ে ফিরে এসে দেখে, ওই ঘটনার চেইন রি-অ্যাকশনে মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে! রাষ্ট্রপক্ষ না বুঝুক, আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজপক্ষকে বুঝতে হবে, ছোট প্রাণে বড় ব্যথা দিয়ে দিয়ে আসলে হত্যা করা হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎকে। সেই ভবিষ্যৎ অনেক তরুণ-তরুণীর বুকে বাঁচানোর এসওএস বার্তা হয়ে বাজছে। আমরা কি শুনতে পারছি?

পুনশ্চ: আত্মহত্যা যে করে, নিরুপায় হয়ে করে। কিন্তু যার কাছে বেঁচে থাকা অসহনীয়, তাকেও বলি, বন্ধু তুমি তো ভবিষ্যৎ জানো না। তাহলে কেন আগামীকালের ভয়ে আজকের প্রাণটা বিসর্জন দিচ্ছ? কেন জিতিয়ে দিচ্ছ সিস্টেমের প্রাণখেকোদের?

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন