তালেবানের বিজয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা

তালেবানের বিজয়ের পরের পরিস্থিতির একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে আফগানিস্তানের মানুষ তাদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে বেছে নিয়েছে, তারা বিদেশি শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তালেবানের একধরনের জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা এর মধ্যে আছে। এ ব্যাখ্যা একার্থে সঠিক; তালেবানের প্রতি আফগান জনগণের সমর্থনের একটি ভিত্তি অবশ্যই জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদ আফগানিস্তানের সমাজের জাতিগোষ্ঠীগত বিভেদকে অতিক্রম করতে পেরেছে কি না, সেটা স্পষ্ট নয়। তারপরও তালেবানের বিজয়ের অন্যান্য কারণও আছে (আলী রীয়াজ, ‘আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় যেভাবে অনিবার্য হয়ে উঠল’, প্রথম আলো অনলাইন, ১৫ আগস্ট ২০২১)।

জাতীয়তাবাদী এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ নয় এ কারণেও যে এতে তালেবানের রাজনৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন অনুপস্থিত। তালেবান পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল এবং যে শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তার প্রকৃতি কী ছিল, সেটাও অনুপস্থিত। তালেবানের বিজয়কে ‘বিদেশি শক্তির’ বিরুদ্ধে ‘আফগান জনগণের বিজয়’ হিসেবে যাঁরা বিবেচনা করেছেন, তাঁদের যা জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে তালেবান অবশ্যই আফগান জনগণের অংশ, কিন্তু একমাত্র তালেবানই আফগানিস্তান নয়। তালেবানের অনুসারীদের বাদ দিয়ে যেমন আফগানিস্তান নয়, তেমনি যারা তালেবানের বাইরে, তাদের বাদ দিয়েও আফগানিস্তান নয়। কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা যে অসম্ভব, তার উদাহরণ হিসেবে কাবুলে গত ২০ বছরের সরকারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তালেবান এখন যে শক্তি প্রয়োগ করে, যুদ্ধ করেই কাবুলে উপনীত হয়েছে, সেটাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।

অন্যদিকে যাঁরা আদর্শিক বিবেচনা থেকে তালেবানের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন এবং আনন্দ প্রকাশ করছেন, তালেবানের বিজয়কে ইসলামের বিজয় বলছেন, তাঁদের অবস্থানও একইভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। তালেবানের শাসন আর ইসলামি বিধান এক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে তালেবানের প্রতিষ্ঠিত আমিরাতের পার্থক্য সুস্পষ্ট। ইসলামের নামে করলেই যেকোনো কাজ ইসলামি বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবেই, তা নয়।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ এবং তালেবানের সম্ভাব্য ভূমিকা বিষয়ে যেসব উদ্বেগ-আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তাকে কেবল পশ্চিমা সমালোচনা, ইসলামবিরোধিতা বা ইসলামপন্থী রাজনীতিকে ভুলভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা বলে নাকচ করা ঠিক হবে না। এসব উদ্বেগের কোনো দিক যদি ভুল বা অতিরঞ্জন হয়, তবে সেটাও চিহ্নিত করা দরকার। বিপরীত দিকে আফগানিস্তানে এবং এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিবেচনায় এ উদ্বেগগুলো বোঝা, আলোচনা করা এবং এগুলো মোকাবিলার প্রস্তুতি খুবই জরুরি। আফগানিস্তানের বাইরে যাঁরা এখন তালেবানের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, তাঁদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শোনা দরকার, কেননা তালেবানের ক্ষমতাসীন হওয়ায় এ অঞ্চলে তার কী প্রভাব পড়বে, এর মধ্যেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ এবং তালেবানের সম্ভাব্য ভূমিকা বিষয়ে যেসব উদ্বেগ-আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তাকে কেবল পশ্চিমা সমালোচনা, ইসলামবিরোধিতা বা ইসলামপন্থী রাজনীতিকে ভুলভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা বলে নাকচ করা ঠিক হবে না। এসব উদ্বেগের কোনো দিক যদি ভুল বা অতিরঞ্জন হয়, তবে সেটাও চিহ্নিত করা দরকার।

তিন ধরনের উদ্বেগ

তালেবানের শাসনাধীন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগগুলোকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরে কী ধরনের শাসনব্যবস্থা চালু করা হবে। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে কি না। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আফগানিস্তান হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে কি না।

তালেবান ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় যে শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল, তাতে জনগণের অংশগ্রহণের কোনো পথ ছিল না। নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারগুলো অনুপস্থিত ছিল। বল প্রয়োগ করে কথিত আচরণবিধি বাস্তবায়িত হয়েছিল, নারীদের মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়েছিল, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, শিক্ষাব্যবস্থাকে সীমিত করা হয়েছিল, একমাত্র ধর্মভিত্তিক শিক্ষাকেই শিক্ষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। এসব পদক্ষেপকে ইসলাম এবং আফগান সমাজের বৈশিষ্ট্য—এসব অজুহাত দেখিয়ে জারি করা হয়। ইসলামের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে তারা চূড়ান্ত বলে চাপিয়ে দেয়। ইসলামি চিন্তায়ও যে বৈচিত্র্য আছে, বহুমাত্রিকতা বা প্লুরালিটি আছে, তা তালেবান স্বীকার করেনি। আফগানিস্তানে তালেবান সেগুলো আবার চালু করবে না, এমন কোনো ইঙ্গিত তালেবান দেয়নি। তালেবান নেতৃত্ব এ বিষয়ে কতটা আন্তরিক বা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তাদের অনুসারীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে এ ধরনের শাসন চালাবে না, এমন নিশ্চয়তা কি আছে?

আফগানিস্তান একসময় আল-কায়েদার ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছিল। সুদান থেকে ১৯৯৬ সালের দিকে ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে পাড়ি জমান এবং তাঁর নেতৃত্বেই আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে হামলা চালিয়েছে। তালেবান যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াকে আশ্বস্ত করেছে যে ভবিষ্যতে তারা এ ধরনের সংগঠনকে জায়গা দেবে না, কিন্তু আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আল-কায়েদার সঙ্গে তালেবানের যোগাযোগ ‘অটুট’। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক এবং আফগান রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আসিম ইউসুফজাই বিবিসিকে বলেন, ‘তালেবান মুখে যতই প্রতিশ্রুতি দিক না কেন, আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনো অটুট এবং আফগান বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে আল-কায়েদাও তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে’ (শাকিল আনোয়ার, ‘আফগানিস্তান: তালেবান অবিশ্বাস্য গতিতে দখল করছে পুরো দেশ, তাদের শক্তির উৎস কী’, বিবিসি, ১৩ আগস্ট ২০২১)।

রাষ্ট্রীয় মদদ ছাড়াও এ ধরনের সংগঠন বিকশিত হতে পারে। তালেবান যদি সারা দেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সুযোগে ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদা যে তাদের ঘাঁটি গড়ে তুলবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই; অন্যত্রও তা-ই হয়েছে। এ ধরনের সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সক্ষমতা তালেবানের থাকবে কি না, না থাকলে এ ধরনের সংগঠনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোনো উদ্যোগে সহযোগিতা করবে কি না, সেটা মোটেই স্পষ্ট নয়। অনুমান করা হচ্ছে, আগের মতোই তারা এ ধরনের কাজে সহযোগিতা করতে অনীহ হবে। ফলে তালেবানের সমর্থন না থাকলেও আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে পারে। তালেবানের ভেতরে তুলনামূলকভাবে যাঁরা কট্টরপন্থী, তাঁরা যদি এ প্রতিশ্রুতি রাখতে রাজি না হন, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। এগুলো হচ্ছে দ্বিতীয় উদ্বেগের বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তালেবান শাসনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের বিরোধীদের ওপরে নিপীড়ন চালাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা সহিংস উগ্রবাদী সংগঠনের উপস্থিতিকে তাঁদের ক্ষমতা সংহত করার কাজে ব্যবহার করে আসছেন, নিপীড়নের নতুন নতুন ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তৃতীয় উদ্বেগের দিক হচ্ছে আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবানের আদর্শিক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ায় কতটা পড়বে, কীভাবে পড়বে। এ কথা কেউ ভুলে যাননি যে সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদদের সমর্থনেই গড়ে উঠেছিল পাকিস্তানভিত্তিক সহিংস উগ্রবাদী সংগঠন হরকাতুল মুজাহিদীন (হুজি)। ১৯৮৮ সালে এ নামে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হলেও সাংগঠনিকভাবে এর সূচনা আগেই। ১৯৯২ সালের মধ্যেই এর বিস্তার ঘটে, হয়ে ওঠে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন। বাংলাদেশে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল—কাবুলের পতনের পর। তালেবানের বিজয় এ আদর্শে বিশ্বাসীদের উজ্জীবিত করবে। গত ২০ বছরে তালেবান ক্ষমতায় না থেকেই এ আদর্শের পক্ষে সদস্য সংগ্রহ করতে পেরেছে, এখন সাফল্যের কারণে আকর্ষণ বেশি হবে। পাকিস্তানের তালেবান, যারা এত দিন আফগানিস্তানের তালেবানকে সাহায্য করেছে, তারা এখন আরও বেশি শক্তিশালী হবে, এত দিনের সহযোগিতার প্রতিদান চাইবে।

এর পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগের কথা বলা দরকার, যা আন্তর্জাতিক কুশীলবেরা বলছেন না। তা হলো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ একে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের বিরোধীদের ওপরে নিপীড়ন চালাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা সহিংস উগ্রবাদী সংগঠনের উপস্থিতিকে তাঁদের ক্ষমতা সংহত করার কাজে ব্যবহার করে আসছেন, নিপীড়নের নতুন নতুন ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। আফগানিস্তানে তালেবান কী করছে, সেদিকে যেমন নজর থাকতে হবে, তেমনি তাদের আদর্শের অনুসারীরা দেশে দেশে কী করছে এবং তালেবানের অজুহাত দেখিয়ে সেসব দেশের সরকারগুলো কী করছে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

অনিশ্চিত আগামী

আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়কে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত বড় আকারের সংঘাত ঘটেনি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আগামী দিনগুলো নিরাপদে যাবে। শুধু তা-ই নয়, আগামীর পথরেখাও অস্পষ্ট। আফগানিস্তানের ইতিহাসে এ রকম অনিশ্চিত যাত্রা এই প্রথম নয়, কিন্তু তা না আফগানিস্তানের জনগণকে, না আন্তর্জাতিক সমাজকে কোনো রকম স্বস্তি দিতে পারে। তালেবানের আচরণই কেবল বলতে পারে আফগানিস্তান কোন পথে এগোবে।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন