বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এগুলোর মধ্যে সানিয়াজান ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তিস্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নীলফামারীর বুড়িতিস্তা আন্তসীমান্তীয় নদী। এটি উজানে কয়েকটি নদীর পানি গ্রহণ করে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় তিস্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে উৎপন্ন হয়ে কালীবাড়ি নদী গঙ্গাচড়ার শেখ হাসিনা সেতুর কাছে মিলিত হয়েছে। লালমনিরহাটের সতী নদীটি স্বর্ণামতী ও ভেটেশ্বরের পানি গ্রহণ করে সদর উপজেলার রেলসেতুর প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে তিস্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আউলিয়াখান নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৈলমারী ইউনিয়নে তিস্তা নদীতে মিলিত হতো। এটিকে নদী রক্ষা বাঁধের নামে তিস্তায় মিলিত হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উপনদী হিসেবে বুড়াইল রংপুর সদর থেকে প্রবাহিত হয়ে পীরগাছায় তিস্তায় মিলিত হয়েছে। মাঝপথে এর ওপরও অবৈধ দখলের অত্যাচার আছে। কোটেশ্বর কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় সরিষাবাড়ীতে তিস্তা নদীর সঙ্গে মিলেছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় বুড়িতিস্তা নামের একটি নদী থেতরাইয়ে তিস্তার সঙ্গে সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটি উজান থেকে মরাতিস্তা, চাকিরপশার ও ঘড়িয়ালডাঙ্গার পানি বহন করে তিস্তায় মিলিত হয়েছে।

তিস্তার শাখানদীগুলো মেরে ফেলার কাজ করেছে পাউবো। জলঢাকা উপজেলার শৈলমারীতে ঘাঘটের মুখ বন্ধ করেছে পাউবো। যার কারণে এর শাখানদী শ্যামাসুন্দরী, শালমারা ও আলাইয়ের আজ মৃত্যুদশা। মানাসের মুখ বন্ধ করা হয়েছে গঙ্গাচড়ায়। এ কারণে এর অবস্থাও এখন করুণ। বাইশাডারা পীরগাছায় তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে আবারও তিস্তাতেই মিলিত হয়েছে। বাইশাডারা উৎসমুখও বন্ধ করা হয়েছে। উলিপুর উপজেলার থেতরাই নামের স্থানে রাজারহাট থেকে আসা বুড়িতিস্তা মিলিত হয়েছে; আবার তার পাশ থেকেই বুড়িতিস্তা তিস্তার শাখানদী হিসেবে বের হয়ে গেছে। ওই স্থানেও পাউবো শাখানদীটিকে মেরে ফেলেছে।

আপাতদৃষ্টে তিস্তা নদীকে একটি নদীমাত্র ভাবা হলেও দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সানিয়াজান, পানাকুড়া, নাউতারা, কুমলাল, ধুম, বুড়িতিস্তা (নীলফামারী), আউলিয়াখান, কালীবাড়ি, সতী, স্বর্ণামতী, ভেটেশ্বর, কোটেশ্বর, মরাতিস্তা, চাকিরপশার, বুড়িতিস্তা (রাজারহাট), ঘাঘট, শ্যামাসুন্দরী, শালমারা, আলাই, মানাস, বুড়াইল, বাইশাডারা, বুড়িতিস্তা (উলিপুর) নদী। এ ছাড়া আর দু-চারটি নদী তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকা অসম্ভব কিছু নয়। উল্লিখিত সব নদীই আমি সরেজমিন বহুবার দেখেছি।

আমরা কখনোই শাখা-উপনদীকে বাদ রেখে তিস্তাকে রক্ষা করার কথা বলি না। তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের ছয় দফা দাবির মধ্যেও শাখা-উপনদীর কথা বলা হয়েছে। তিস্তা নদী সুরক্ষার সঙ্গে এ নদীগুলোরও সম্পর্ক রয়েছে। তিস্তাকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই শাখা-উপনদীর কথাও ভাবতে হবে। পাউবো যেসব নদীকে গলাটিপে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছে, সেগুলোকেও পুরোনো প্রবাহে ফেরাতে হবে। তিস্তা নদী উপনদীগুলোর পানি না পেলে স্বাভাবিক পানি পাবে না। আবার শাখানদীগুলোর পানিপ্রবাহ বজায় থাকলে এর ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া নদীগুলোর প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। বর্তমানে তিস্তা নদীর সব শাখার উৎসমুখ বন্ধ করা হয়েছে। উপশাখার ওপরও পাউবোর নজর পড়েছে। এই সরকারি প্রতিষ্ঠান কি অবশিষ্টগুলোকেও মেরে ফেলবে?

তিস্তা নদীকে ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করার আগে নদীতীরবর্তী মানুষের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। দীর্ঘ এক যুগ ধরে আমরা সক্রিয় আন্দোলন করছি তিস্তার জন্য। মহাপরিকল্পনা গ্রহণকারীরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও কোনো আলাপ করেছে কি না জানি না। আলাপ না করেও সরকার যদি একটি বিজ্ঞানসম্মত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে, আমাদের তাতে কোনো বিরোধ নেই।

তিস্তা নদীর কোনো পরিচর্যা না থাকার কারণে এবং উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার করার কারণে তিস্তাতীরবর্তী মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অভিশাপ। সারা দেশের গরিব ১০টি জেলার মধ্যে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলা এই নদীতীরবর্তী। এ চার জেলার সবচেয়ে গরিব থাকার প্রধান কারণই তিস্তার ভাঙন, তিস্তার বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যার অভাব। মহাপরিকল্পনায় কী আছে, আমরা এখনো জানি না। আদৌ এ মহাপরিকল্পনা আলোর মুখ দেখবে কি না, তা–ও অজানা। কিন্তু তিস্তাকে বাঁচাতে এর শাখা-উপনদীগুলো বাঁচাতেই হবে। এর জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা লাগবে। তিস্তাপারের লাখ লাখ মানুষকে রক্ষা করতে হলে শাখা-উপনদীসহ তিস্তার পরিচর্যার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বজুড়ে নদীকেন্দ্রিক অনেক প্রযুক্তি এসেছে। সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে নদীবান্ধব কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন