default-image

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোয়ান গত বছর জাতিসংঘে আফ্রিকান বিজনেস ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ইজ গ্রেটার দ্যান ফাইভ’। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্যকেই বুঝিয়েছেন। স্থায়ী সদস্যদের হাতে আটকে আছে সারা বিশ্বের ভাগ্য। কোথায় হামলা হবে, কোন দেশ দখল হবে, কে দেশান্তরি হয়ে উদ্বাস্তুশিবিরে আশ্রয় নেবে, কারা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেবে—সবই পাঁচ মোড়ল ঠিক করে দেয়। অন্যরা জাতিসংঘে গিয়ে মোড়লদের কাছে অনুনয়-বিনয় করেন। দু-একজন হুমকি–ধমকিও দেন। কেউ কেউ আবার প্রলাপ বকে থাকেন জাতিসংঘের অধিবেশনে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তির হাতেই বিশ্ববাসীর খারাপ ভালো নির্ভর করে।

মাঝেমধ্যেই অনেক দেশ নাড়াচাড়া দিয়ে এই অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা করে। তবে কেউই এ পর্যন্ত সফল হয়নি। সম্প্রতি এরদোয়ান জাতিসংঘের সংস্কার কথা বলছেন বেশে জোরেশোরেই। এক দশক ধরেই তুরস্ক একাধিকবার নিরাপত্তা পরিষদ পুনর্গঠনের পক্ষে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছে। তুরস্ক মনে করে, নিরাপত্তা পরিষদে মুসলিম বিশ্বকে একটি স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ভারত, ইসরায়েল ও জাপানকে স্থায়ী সদস্য করার প্রসঙ্গ আলোচনায় উঠলে তুরস্ক নিজের প্রার্থিতার বিষয়টিও পরোক্ষে জানিয়ে দেয়।

গত দুই দশকে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বাঁক বেশ লক্ষণীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে রিপাবলিক গঠিত হওয়ার পর পশ্চিমাদেরই অনুসরণ করেছে তুরস্ক। এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপক পরিবর্তন করেন। তুরস্ক এখন আর পুরোপুরি পশ্চিমা বা ন্যাটোনির্ভর নীতি অবলম্বন করছে না। মার্কিন প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করছে।

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করছে। কিছুদিন আগে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করেছে। সম্প্রতি গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তি করেছে। গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমে তুরস্কের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ইউক্রেন দিয়ে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করে। তুরস্ক রাশিয়ার জন্য বিকল্প পথ বের করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের দর-কষাকষির সুযোগ বেড়ে যাবে নতুন এই চুক্তির কারণে।

তুরস্ককে নিজস্ব সীমানার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মুক্তাঞ্চলের নামে সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলের পাঁয়তারা করছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নির্মমভাবে কুর্দিদের দমন করছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। সিরিয়া ছাড়াও লিবিয়ায় তুরস্কের সৈন্য রয়েছে। লিবিয়ায় সৈন্য পাঠিয়ে আফ্রিকায় প্রভাব বৃদ্ধি করতে চাইছে তুরস্ক। সাইপ্রাসেও খনিজ সম্পদ আহরণের নামে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিসের প্রভাব হ্রাস করতে লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে তুরস্ক।

এসব সামরিক তৎপরতা ও চুক্তির বাইরেও তুরস্ক আফ্রিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগী হয়েছে। ২০০৮ সালে তুর্কি-আফ্রিকা সহযোগিতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আফ্রিকার ৫০টি দেশ অংশ নেয়। ২০১৩ সালে গ্যাবনে গিয়ে এরদোয়ান বলেছিলেন, ‘আফ্রিকা আফ্রিকানদেরই থাকবে; আমরা এখানে সোনার জন্য আসিনি।’ গত মাসে এরদোয়ান আলজেরিয়া, সেনেগাল ও গাম্বিয়া সফর করেন। লিবিয়াতে সৈন্য পাঠালেও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই আফ্রিকার দেশগুলোকে আস্থায় আনতে চাইছে তুরস্ক। গত বছর তুরস্ক ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৩ সালে আফ্রিকার দেশগুলোয় তুরস্কের বিনিয়োগ ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সাল নাগাদ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তুরস্ক ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। তুরস্কের বিনিয়োগ মহাদেশজুড়ে ৭৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। গত ১০ বছরে এরদোয়ান ৩০টি আফ্রিকান দেশে ২৮টি সফর করেছেন। এমনকি ২০১১ সালে দুর্ভিক্ষ, খরা ও যুদ্ধাক্রান্ত সোমালিয়া সফর করে আলোচনায় আসেন তিনি।

আফ্রিকাকে ঘিরে তুরস্কের এসব উদ্যোগকে অনেকেই মহানুভব বললেও উপসাগরীয় দেশগুলো এর বিরোধিতা করছে। সৌদি আরবসহ অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করে, ‘নব্য অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা দখল করতে চাইছে তুরস্ক। সোমালিয়ায় মানবিক সহায়তার নামে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে তুরস্ক; যদিও তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সোমালিয়ার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এই ঘাঁটি স্থাপন করা হয়।

মূলত, ২০০০ সালে এরদোয়ানের নেতৃত্বে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিরও বদল ঘটতে থাকে। আরব বসন্তের ধাক্কায় আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে মিসর হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে ইরানের উত্থান ঘটতে থাকে। পাশাপাশি তুরস্কও বিভিন্ন সংকটে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ পায়। বিভিন্ন দিক থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তুরস্ক ঘিরে ফেলছে। এর পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বকে সৌদির প্রভাববলয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় ৫০টির অধিক মুসলিম দেশ নিয়ে তুরস্ক ও মালয়েশিয়া সম্মেলনও করেছে।

সন্দেহ নেই, তুরস্কের যাবতীয় নীতি ও পরিকল্পনা এরদোয়ানের মস্তিষ্কপ্রসূত। নতুন সুলতান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এরদোয়ান। একদিকে আফ্রিকাকে হাত করে জাতিসংঘের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইছেন, অন্যদিকে সিরিয়ার কিছু অংশ পরোক্ষে দখল করে সৌদিকে চাপে রাখছেন। ওআইসির বিকল্প বৈঠক করে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখাতে চাইছেন। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে ইউরোপের সঙ্গে দর-কষাকষির পথ তৈরি করছেন এরদোয়ান। তুরস্কের নতুন অবস্থান নিয়ে দেশের বাইরে যেমন সক্রিয় এরদোয়ান, দেশের ভেতরে ততটাই কঠোর তিনি। বিরোধী মতকে শক্ত হাতে দমন করছেন। বিরোধীদের গণহারে জেলে ঢোকাচ্ছেন। দেশ থেকে বের করে দিচ্ছেন। এরদোয়ানের কঠোরতা থেকে লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা রক্ষা পাচ্ছেন না। তুরস্কের রাজনীতিতে এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা হ্রাসও লক্ষণীয়। বসফরাসের বিকল্প চ্যানেলের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কের মুখে আছেন। শাসকদল একেপিতে ভাঙন ধরেছে। দল থেকে বের হয়ে নতুন দুটি দল গঠন করেছে এরদোয়ানের দুই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর আহমেদ দাউভতুগলু ও আবদুল্লাহ গুল।

ক্রমে জনপ্রিয়তা খোয়ানো এরদোয়ান কি নতুন অটোমান সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সফল হবেন? তুরস্ক সরাসরি কোনো দেশকে দখল করছে না। তবে কৌশলে বিভিন্ন দেশকে কবজা করে ফেলছে। কখনো সামরিক পদক্ষেপে। কিছু কিছু দেশে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নামে। সফট পাওয়ার ও হার্ড পাওয়ারের সমন্বয়ে নিও অটোমান নীতির সফল প্রয়োগ করছেন এরদোয়ান। ঘরের রাজনীতিতেও দক্ষতার সঙ্গে একটি অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে দিয়েছেন। ভারসাম্য ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছেন। সিরিয়া ও লিবিয়া সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছে তুরস্ক। কিন্তু জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে এরদোয়ানকে নিও পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োগ করতে হবে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল হতে হবে। এরদোয়ান তুরস্কে ধর্মীয় অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করেছেন। জনপরিসরকে অবাধ ও উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় তাঁর জন্য খুব ভালো কিছু হয়তো অপেক্ষা নাও করতে পারে। পরবর্তী নির্বাচনেই এর প্রভাব দেখা যেতে পারে। দেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে খেপিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এরদোয়ানের জন্য সহজ হবে না।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0