তুরস্কে কী ঘটেছে?

১৫ জুলাই তুরস্কের সেনাবাহিনীর একদল সেনাসদস্য চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তুরস্কের বিভিন্ন শহরে টহল শুরু করেন। বিশেষ করে আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুল শহরে তাঁরা তাঁদের টহল জোরদার করেন। পরবর্তী সময়ে বোঝা যায়, সেনাবাহিনীর এই অংশের মুভমেন্ট আর কিছুই নয়, এটা একটা ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা। এই মুভমেন্টটি পরিচালিত হয় আর্মড ফোর্সের বিভিন্ন স্তরের বিপথগামী একদল সেনাসদস্য দ্বারা, যাঁরা ফেতুল্লা গুলেনের জঙ্গি সংগঠনের (এফইটিও বা ফেতুল্লা গুলেন টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন) সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা চালান।
এই বিপথগামী সেনাসদস্যরা তুরস্কের জনগণের ওপর গুলি চালান। নিজেদের কমান্ডারদের পেছনে ছুরি চালান এবং প্রেসিডেন্ট অফিস ও পুলিশের সদর দপ্তরে বোমাবর্ষণ করেন। তুরস্কের গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলি, যেখানে তুরস্কের প্রধান জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তুরস্কের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে, সেখানেও তাঁরা আক্রমণ করেন; যা তুরস্কের গণতন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম। তাঁরা তুরস্কের জাতীয় টেলিভিশন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাঁদের পক্ষে সংবাদ প্রচার করতে থাকেন এবং প্রাইভেট মিডিয়ার আউটলেটগুলোর ওপরও হামলা চালান।

>আমরা বাংলাদেশি ভাই ও বোনদের ধন্যবাদ জানাই, যাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো বার্তার মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং সমর্থন জানিয়েছেন

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইদিরিমের ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ সড়ক, বিমানবন্দর ও পাবলিক স্কয়ারে সমবেত হয়। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জনগণ অভ্যুত্থানকারীদের ট্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁদের রুখে দেয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে গণতন্ত্রকামী জনগণের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ বিপথগামী সেনাসদস্যদের অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই সময় আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে কমপক্ষে ২৪৬ জন সাধারণ জনগণ ও নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। আহত হন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ।
বিপথগামী সেনাদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তুরস্কের সব রাজনৈতিক দল পার্লামেন্টে এসে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। এরপর তাঁরা সবাই গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় বসেন এবং যুক্ত বিবৃতিতে ঘোষণা করেন যে গণতন্ত্রই বজায় থাকবে।
এই বিপথগামী সেনাসদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফেতুল্লা গুলেনের এফইটিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২১ জুলাই থেকে তুরস্ক সরকার সারা দেশে তিন মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এই এফইটিওর বিপজ্জনক গোপন নেটওয়ার্ক শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রের আরও অন্যান্য সংস্থার মধ্যেও বিস্তৃত। তদন্ত করে যাঁরা এফইটিওর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করে যথাযথ বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এই বিচারকাজ পরিচালনা করতে হবে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে।
অন্যান্য সমর্থনকারী দেশের মতো বাংলাদেশও তুরস্কের গণতন্ত্র রক্ষার পক্ষে তুরস্কের জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীদের কাছ থেকে টেলিফোন কল ও বার্তা পান। তাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কাছে পাঠানো লিখিত বার্তায় তিনি গণতন্ত্রের জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ এবং শক্ত হাতে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য অভিনন্দন জানান।
আমরা বাংলাদেশি ভাই ও বোনদের ধন্যবাদ জানাই, যাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো বার্তার মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং সমর্থন জানিয়েছেন।
আহমেদ গুরবাজ: বাংলাদেশে তুরস্ক দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স।