বিজ্ঞাপন

অপর দিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষায় দ্রুতগতিতে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে বেসরকারি অংশীদারি ও নিয়ন্ত্রণ। তাই পণ্যে পরিণত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয় কমার বদলে বেড়ে ২০১৭ সালে ৬৭ শতাংশে আর ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে, ২০১৭ সালের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তির পকেট খরচ মালদ্বীপে ১৮, ভুটানে ২৫, শ্রীলঙ্কায় ৪২, নেপালে ৪৭, পাকিস্তানে ৫৬ আর ভারতে ৬২ শতাংশ অর্থাৎ বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে (প্রথম আলো, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ও ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)।

জাতিসংঘের মতে, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা, বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বছরে মাথাপিছু ব্যয় হয় মাত্র ৩২ ডলার। একই সময়ে এই খাতে পাকিস্তানে ব্যয় হয় ৩৮, নেপালে ৪৫, ভারতে ৫৯, ভুটানে ৯১, শ্রীলঙ্কায় ১৫১ ডলার। বিগত প্রায় দেড় যুগের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাত বরাবরই অবহেলার শিকার। এ দীর্ঘ সময়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৮ (গড়ে ৫ দশমিক ৫) শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং জিডিপির ক্ষেত্রে সব সময়ই ১ শতাংশের নিচে থেকেছে। অর্থাৎ সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতকে সঠিক গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

২০১৫ সালের স্বাস্থ্য খাতের খরচে জিডিপির অংশ বাংলাদেশে ২ দশমিক ৩৭, ভুটানে ৩ দশমিক ৪৫, ভারতে ৩ দশমিক ৬৬, নেপালে ৬ দশমিক ২৯ ও মালদ্বীপে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে বৈশ্বিক গড় ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ (সূত্র: বিশ্বব্যাংক ডেটা ২০১৯)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ হওয়া উচিত। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। একে তো স্বল্প বরাদ্দ, তার ওপর রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ ব্যয়ে অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা।

স্বাস্থ্যের সরকারি বরাদ্দকে খরচ হিসেবে মনে না করে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে; এর মাধ্যমেই দারিদ্র্য কমে, চাকরি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, বাড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তৈরি হয় সুস্থ, সবল ও নীতিনিষ্ঠ সমাজ।

এবার জনবলের দিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে জনবলসংকটও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এক বড় অন্তরায়। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য আছেন ৩ দশমিক ৮ জন চিকিৎসক এবং ১ দশমিক ০৭ জন নার্স। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আমাদের মতো দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের মোটামুটি মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী মিলে থাকতে হবে ২৩ জন। কিন্তু আমাদের আছে মাত্র ৮ দশমিক ৩ জন। পাশের দেশ ভারতে ১৮ দশমিক ৫, ভুটানে ১৯ দশমিক ৩, থাইল্যান্ডে ২৮, নেপালে ৩৩ দশমিক ৫, শ্রীলঙ্কায় ৩৬ দশমিক ৮ আর মালদ্বীপে ১১৮ জন। অপর দিকে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে ৩ জন নার্স ও ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা। কিন্তু আমাদের আছে দশমিক ৩ জন নার্স আর দশমিক ৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী। এই স্বল্প জনবলের মধ্যেও আবার ২০১৯ সালে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ পদই শূন্য ছিল (এইচআরএইচ ডেটা শিট ২০১৯; এইচআরএম ইউনিট, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়)। অর্থাৎ স্বল্প জনবল নিয়েই খুঁড়িয়ে চলতে হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্য বিভাগকে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, জনবল বৃদ্ধির সঙ্গে রয়েছে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক। অবশ্য শুধু বাজেট বৃদ্ধি করলেই যে স্বাস্থ্যসেবার সব সংকট সমাধান হয়ে যাবে, তা বলছি না। তবে এটাই মূল সমস্যা। জনমত জরিপেও দেখা যায়, বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে জনগণের চাহিদার প্রথমে শিক্ষা ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। কিন্তু স্বাস্থ্যের অবস্থান আমাদের দেশে সব সময়ই সপ্তম থেকে নবম স্থানে রয়েছে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও উপস্থাপনায় এ বিষয়গুলো বলে এলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখছি না। তাই আমরা আবারও স্বাস্থ্য খাতের প্রতি সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের আরও মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে একটি সুপরিকল্পিত রোগপ্রতিরোধ ও নিরাময় ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব সমাজ গড়ে তোলার জন্য স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির জোর দাবি জানাচ্ছি। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যের সংগ্রাম শুধু চিকিৎসকের একার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে জাতীয় অর্থনীতি, জাতীয় বাজেট, বাণিজ্যনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পেশাজীবীদের সংখ্যা ও দক্ষতা, জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার মাত্রা, জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, দলবাজি ও দুর্বৃত্তায়ন। এ ছাড়া আছে খাদ্য, পুষ্টি, পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের স্বাস্থ্য। সুতরাং স্বাস্থ্যের অধিকার আদায় ও পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ‘সার্বিক স্বাস্থ্য আন্দোলন’ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক, ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন