default-image

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব অনুমোদনের মধ্য দিয়ে গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের বছর শুরুর অধিবেশন শেষ হয়েছে। রেওয়াজ অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন এবং এর ওপর সদস্যরা বক্তব্য দেন। চলতি অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের ১৩২ জন সাংসদ কথা বলেছেন। এ সময় দুজন সাংসদের কাণ্ড নানা মহলে তুমুল সমালোচনা হয়েছে। এ দুই সাংসদ হলেন শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল (লক্ষ্মীপুর-৩) ও অন্যজন আওয়ামী লীগের দলীয় সাংসদ শাহীন চাকলাদার (যশোর-৬)। প্রথমজন স্বতন্ত্র, দ্বিতীয়জন আওয়ামী লীগের।

মানব ও অর্থ পাচারের দায়ে কুয়েতের আদালত শহিদ ইসলামকে চার বছর কারাদণ্ড ও বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ কোটি টাকা জরিমানা করেন। বাংলাদেশের কোনো সাংসদের বিদেশের আদালতে দণ্ডিত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন একে দেশের জন্য লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এই সাংসদের লজ্জাজনক কাণ্ড নিয়ে মহান জাতীয় সংসদ আলোচনারই প্রয়োজন বোধ করেনি।

বিজ্ঞাপন

সাংসদ শাহীন চাকলাদার বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক সদস্য শেখ সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজাতে কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) হুকুম দিয়েছিলেন। এ জন্য প্রয়োজনে ওসিকে থানায় বোমা মেরে বা কোনো ইটভাটায় পুলিশ পাঠিয়ে বোমা মেরে ‘ডাকাতির উদ্দেশ্যে বোমা হামলা’ মামলা দিতে বলেছিলেন তিনি। ঘটনাটি গুরুতর। সাংসদ (যশোর-৬) শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে ওসির কথোপকথনের অডিওর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশের সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, শেখ সাইফুল্লাহ কেশবপুরের একটি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে বেলার সহযোগিতায় হাইকোর্টে একটি রিট করেন। আদালত ওই ইটভাটার বিরুদ্ধে আদেশও দেন। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর গত বছরের ডিসেম্বরে তা ভেঙে দিলে সাংসদ সাইফুল্লাহর ওপর ক্ষিপ্ত হন। একজন সাংসদ কীভাবে একজন পরিবেশকর্মীকে ফাঁসাতে থানায় বোমা হামলা চালাতে বলতে পারেন?

গত বছরের ৬ জুন কুয়েতে নিজের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শহিদ ইসলামকে। প্রথম আলোয় এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ডেকে নেওয়া হয়েছিল মাত্র। পরে প্রমাণিত হয় প্রথম আলোর খবর সঠিক ছিল। শহিদ কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নড়েচড়ে বসে। তারা শহিদ ও তাঁর স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ সেলিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং আদালতের নির্দেশে তাঁদের ৬১৭টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।

এ রকম একজন চিহ্নিত মানব পাচারকারী কীভাবে জাতীয় সংসদের সদস্য হলেন, সেই প্রশ্নের জবাব নেই। শহিদ ইসলাম একসময় বিএনপি করতেন, এই দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁর অর্থ পাচারের দায় বিএনপির ওপর চাপাতে চাইছেন। কিন্তু তিনি ও তাঁর স্ত্রী কোন দলের, কোন নেতার সহায়তায় সাংসদ হওয়ার ‘বিরল সম্মান’ অর্জন করলেন, তা বলেন না।

অতীতে কোনো সাংসদ সম্পর্কে গণমাধ্যমে কিছু লেখা বা বলা হলে জাতীয় সংসদে নিন্দার ঝড় বইত। কৈফিয়ত তলব করা হতো। কিন্তু মহান জাতীয় সংসদের একজন সদস্য বিদেশি আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর সাংসদেরা রহস্যজনকভাবে নীরব। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, লিখিত অভিযোগ এলে তিনি আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেখানে সাংসদ দণ্ডিত হয়েছেন, সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নোটিশ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। স্পিকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি সংসদে আনতে পারতেন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২)-এর ঘ উপধারায় আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকেন।’

জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। শহিদ কি এরশাদের চেয়েও ক্ষমতাধর কেউ?

বিজ্ঞাপন

যদিও শাহীন চাকলাদার ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হননি, তিনি ফৌজদারি অপরাধ করার জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে (কেশবপুর থানার ওসি) প্ররোচিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা যখন ইটভাটা চালুর বিষয়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা বলছিলেন, তখন সাংসদ জবাব দেন, ‘আরে, কোথাকার হাইকোর্ট-ফাইকোর্ট। কোর্টফোর্ট যা-ই বলুক বলুইগ্যা। আমাদের খেলা নাই। ওসি হলি কিন্তু ডায়নামিক হতে হয়।’

এই হলেন আমাদের ‘ডায়নামিক’ সাংসদ, যিনি কেবল উচ্চ আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাননি, ওসিকেও তাঁর মতো ‘ডায়নামিক’ হতে বলেছেন।

শাহীন চাকলাদার পরিবেশ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। দেশের কোথাও পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব তাঁর। আর তিনি ইটভাটার দূষণ থেকে ফসলি জমি রক্ষায় আদালতে রিটকারীকে ফাঁসাতে থানায় বোমা হামলা চালাতে বলেছেন।

অতীতে হরতাল-অবরোধের সময় বাসে বোমা হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ পাইকারি হারে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ, তাঁরা নিজেরা বোমা মারেননি বা আগুন দেননি; হুকুম দিয়েছেন। এসব মামলার বেশির ভাগই তদন্তে টেকেনি। কেননা, মামলায় কে হুকুম দিয়েছে, তা বলা হলেও কাকে হুকুম দিয়েছে, তা জানানো হয়নি।

কিন্তু কেশবপুরের ঘটনায় কে হুকুম দিয়েছেন এবং কাকে দিয়েছেন, দুটোই দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ভাগ্যিস, ওসি সাহেব সাংসদের হুকুম তামিল করেননি। করলে কী হতো, ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

sohrabhassan55@gmail.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন