তেল দিতে দিতে নিজেদের জিব ও মস্তিষ্ককে তৈলাক্ত করে ফেলেছি, যা বানরের তৈলাক্ত বাঁশের চেয়েও এগিয়ে। তেল দিতে দিতে আমরা রাজনীতিবিদ, নেতা-খেতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী—সুধীজন সবাইকে করে ফেলেছি ফুলপিঠা। তাঁদের যতই তেলে ভাজবেন, তাঁরা ততটাই খুশি। কিন্তু এই খুশিতে তখনই বিপত্তি বাধে যখন ওই রিকশাওয়ালা মামাদের অতিরিক্ত তৈলমর্দনের কারণে রিকশার চাকার বিয়ারিং থেকে ‘বল’ বের হয়ে যায়। অপ্রয়োজনে বেশি বেশি তেল মারায় ‘ঢিলা হ্যান্ডেল’ চালকের নিয়ন্ত্রণ হারায়। ঘটনা যা-ই হোক সবচেয়ে বেশি সর্বনাশ হয় যাত্রীদের। কারণ, রিকশা উল্টে গেলে বা ‘পল্টি’ মারলে সিটবেল্টহীন যাত্রীরা সবার আগে মুখ থুবড়ে সড়কে পড়ে আহত হয়, নিহত হয়। রাজনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রের এ তেলবাজি তো রীতিমতো আত্মঘাতী ও ভয়ংকর।

২.

বাজারে একলাফে দামবৃদ্ধির সেঞ্চুরি করেছেন সয়াবিন সাহেব। ভোক্তাদের কপালে ভাঁজ, এই কমে যাবে বুঝি তেল খাওয়ার ঝাঁজ। বাহারি পদের রান্না, আহ! চোখে কান্না। এত তেল কিনতে লাগবে অনেক টাকা, কিন্তু পকেট যে ফাঁকা। দাম কি আর তেলেই থাকবে ঠেকে? তেলের দৌরাত্ম্য রসগোল্লাও দেখবে চেখে। এরপরে যোগ হবে গাড়িভাড়া, বাড়িভাড়া আরও কত কী। ব্রয়লার মুরগি, তেলাপিয়া-পাঙ্গাশ বলতে শুরু করেছে কাল খাস, কাল খাস।

অথচ আমরা কয়েক দিনের ছোট উদ্যোগে কমিয়ে দিতে পারি তেলের দৌরাত্ম্য। শুনেছি, একবার নাকি মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ চিনির মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ও চাহিদার জোগান বাড়াতে এক দিনের জন্য নাগরিকদের চা না খেতে বা কম চিনিতে খেতে অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর এই অনুরোধ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। অনেকে তাঁদের দোকানই খোলেননি। এতে নাকি এত পরিমাণ চিনি উদ্বৃত্ত হয়ে গিয়েছিল, যা তাদের সংকট খুব সহজেই সামাল দিতে পেরেছে। যদি এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কয়েক দিন তেলে ভাজা ভর্তা বাদ দিয়ে শুধু সেদ্ধ ভর্তা খাই, দশ পদ রান্না না করে এক পদে নিয়ে আসি, তা–ও আবার কম তেলের ব্যবহারে, দেখবেন আরামসে তেলের দাম কমে আসছে। কারণ, এই তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি রয়েছে আমাদের দেশীয় মজুতদারদের অসৎ ক্রিয়াকলাপ। বাজারে তেলের চাহিদা কমে গেলে কতকাল তাঁরা তেল জমিয়ে রাখতে পারবেন? আর কম তেলে খাবার খাওয়ার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সবার জানা। চলুন, একটু অনুশীলন করি, জিব ঠিকই মানিয়ে নেবে।

যেকোনো সংকটই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলে। এটাকে চিরন্তন সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের এই সংকট আমাদের দেশের শর্ষে ও ভেন্নার (রিসিনাস) মতো অন্যান্য তেলবীজের ইতিহাস অধ্যায়ন ও অনুশীলনের দিকে নিতে পারে। যেমনটা এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী।

মোদ্দা কথা, যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংকট বিশ্বের যে প্রান্তে যে রূপেই হোক না কেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। করোনা মহামারির মধ্যেও সামরিক ব্যয়ে পরিবর্তন আসেনি। বরং ২০২০ সালে বিশ্বে সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অথচ ওই বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। মোড়ল মানুষের ফানুস বড়ই অদ্ভুত। তাঁদের মন ও মুখোশ বোঝা দুষ্কর।

মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী লিখেছেন, ‘যেকোনো চ্যালেঞ্জ কিছু সম্ভাবনা নিয়ে আসে। সয়াবিন তেলের (অস্বাস্থ্যকর) সিন্ডিকেট ও বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের (অস্বাস্থ্যকর) সংকটের মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের সরিষার সম্ভাবনা, যেখান থেকে আমরা মুখ ফিরিয়ে রেখেছি! সরিষা উৎপাদনে কৃষকদের প্রণোদনা দিন। সরিষার বাজার থেকে বেনিয়াদের প্রতিহত করুন। বিশ্বাস করুন, এ দেশের কৃষক ২–৪ বছরে মধ্যে স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেলে দেশটাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে দিবে। তত দিন, ধৈর্য ধরে ভাজাপোড়া কম খান। তেলের চাহিদা শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বা তারও বেশি কমিয়ে ফেলুন। আপনার টাকা আছে বলেই কয়েক গুণ দাম দিয়ে নিজের জন্য গ্যালন-গ্যালন সয়াবিন কিনে নিজের গুদাম ভরায়েন না, প্লিজ। নিম্ন আয়ের মানুষের কথা একটু ভাইবেন। বরং নিজ নিজ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাম থেকে সরিষার তেল সংগ্রহ করুন। সরিষার তেল স্বাস্থ্যকর।’

৩.

পাটা-পুতার ঘষাঘষি, মইচ্চের (মরিচ) দফা শ্যাষ। অথবা শিল-পাটায় ঘষাঘষি মরিচের যায় প্রাণ। শব্দের ভিন্নতাভেদে একটি প্রচলিত কথা। মজার বিষয় হলো এই শিল-পাটা যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁরা থাকেন ধরাছোঁয়ার অনেক ঊর্ধ্বে।

বিশ্ববাজারে পাম তেলের দাম গত দুই বছরে ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। গত ২৮ এপ্রিল বিশ্বে পাম তেলের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া ঘোষণা দিয়েছে যে তারা নিজ দেশে দাম স্থিতিশীল রাখতে এর রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। দেশটি জানিয়েছে, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ আর করোনা মহামারিসংশ্লিষ্ট কারণে তাদের এ সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের বাজারে পামের পাশাপাশি বাড়তি দামের ঘোষণা এসেছে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে, যা পাম তেলের ক্ষেত্রে ২৪, খোলা সয়াবিনে ২৮ ও বোতলজাত সয়াবিনের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, টাকার অঙ্কে বোতলজাত সয়াবিনের ক্ষেত্রে যা একলাফে ৩৮ টাকা বেড়ে ১৯৮ টাকায় লিটার দাঁড়িয়েছে। পাড়া–মহল্লার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দাম সোজাসুজি ২০০ টাকা রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ভোজ্যতেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সয়াবিন তেল। এ তেল মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু সেখানে খরার কারণে উৎপাদন কম হয়েছে বলে বেড়েছে দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। আগে টনপ্রতি ৭৫০ ডলার করে খরচ পড়লেও এখন সর্বশেষ সেটি ১ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে যে তেলগুলো রান্নায় ব্যবহার হয়ে থাকে, তার মধ্যে সূর্যমুখীও রয়েছে। আর সূর্যমুখী তেলের অন্যতম উৎস রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় উন্নত দেশগুলোয় এ তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

৪.

ধরা হচ্ছে বিশ্ববাজার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় বেসামাল অবস্থা। কিন্তু এর জন্য যে সরকার–সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দায়ী করা যাবে না, তা–ও কিন্তু নয়। কারণ, আমাদের বাজারব্যবস্থায় ১ টাকার বিপরীতে ১০ টাকা বৃদ্ধির প্রবণতা বরাবরই দেখা যায়। আর যে দেশের সংসদ ভরা ‘বণিক শ্রেণি’ দ্বারা সেখানে এর চেয়ে বেশি কীই–বা আশা করা যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমান সাংসদদের ১৮২ জন ব্যবসায়ী। সাধারণত আইন বিভাগের সদস্যদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে দেশের নির্বাহী বিভাগ। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশেষ স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সুশাসনের অভাব থাকলে সেখানে সবকিছু জনবান্ধব হবে, এটা আশা করা যায় না। সুযোগ পেলেই মুনাফাখোর মজুতদারেরা উইন উইন বা জয়ী জয়ী খেলা খেলে থাকে। আর এতে পকেট কেটে মারা যাওয়ার অবস্থা হয় জনগণের। এখানে স্বার্থবাদী এ গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক সখ্যের শিল-পাটার। আর জনগণের অবস্থান হয় মরিচের স্থানে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, ২০১০-১১ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত মজুরিসূচক বেড়েছে প্রায় ৮১ শতাংশ। বিপরীতে মূল্যসূচক বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বৈশ্বিক মজুরি প্রতিবেদন: ২০২০-২০২১’ বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশে মাসিক নিম্নতম মজুরি ছিল ৪৮ ডলার, তথা চার হাজার টাকার মতো।

মোদ্দা কথা, যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংকট বিশ্বের যে প্রান্তে যে রূপেই হোক না কেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। করোনা মহামারির মধ্যেও সামরিক ব্যয়ে পরিবর্তন আসেনি। বরং ২০২০ সালে বিশ্বে সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অথচ ওই বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। মোড়ল মানুষের ফানুস বড়ই অদ্ভুত। তাঁদের মন ও মুখোশ বোঝা দুষ্কর। করোনা মহামারি আসার পর একটি সাধারণ আশার জন্ম হয়—বিশ্ব বুঝি কামান-গোলাকে বিদায় জানাবে, মানুষগুলো মানবিক হবে। কিন্তু তা হয়নি। চলছে হাঙ্গামা, চলছে শোষণ। সৃষ্টি হচ্ছে মনুষ্যত্বহীন তেপান্তর। আর অট্টহাসি দিচ্ছে রক্ত-মাংসে মানুষের অবয়বে গড়া ‘ভূত-প্রেতেরা’।

মো. ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন