দুর্নীতির ধারণাসূচকে হতাশাব্যঞ্জক ফল

বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২৮ জানুয়ারি ২০২১ তাদের বার্ষিক দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০২০ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ১০০–এর মধ্যে ২৬ স্কোর পেয়েছে, যা ২০১৯–এর সমান। স্কোর মোটেও বাড়ল না তা–ই নয়, বরং সর্বনিম্ন অবস্থান থকে হিসাব করলে র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৯–এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে, অর্থাৎ দ্বাদশ স্থানে, যা হতাশাব্যঞ্জক।

সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্তের অবস্থান থেকে গণনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান গতবারের মতো ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম, কিন্তু সূচকের নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান শুধু দুই ধাপ নিচে নেমেছে, তা-ই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান বরাবরের মতো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, কেবল আফগানিস্তানের ওপর। আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্নে। অন্যদিকে আমাদের স্কোর বৈশ্বিক গড় ৪৩–এর অনেক পেছনেই রয়ে গেছে।

কোনো দেশই শতভাগ স্কোর পায়নি, অর্থাৎ বিশ্বের কোনো দেশই দুর্নীতিমুক্ত নয়। ১৫১টি দেশ (৭৩ শতাংশ) ৫০–এর কম স্কোর পেয়েছে; ১০৫টি (৫৮ শতাংশ) দেশের স্কোর বৈশ্বিক গড় ৪৩–এর নিচে; ২০১৯–এর তুলনায় স্কোর কমেছে ৪৮টি (২৭ শতাংশ) দেশের; বেড়েছে ৬২ (৩৮ শতাংশ) দেশের; আর স্কোর একই পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশসহ ৭০ (৩৯ শতাংশ) দেশের ক্ষেত্রে।

বিজ্ঞাপন

৮৮ শতাংশ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে ভালো ফল পেয়েছে যৌথভাবে ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ড। অন্য যেসব দেশ ৭০ শতাংশের বেশি স্কোর পেয়ে ভালো ফল করেছে, তারা হচ্ছে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, হংকং, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, আইসল্যান্ড, এস্তোনিয়া, জাপান, আয়ারল্যান্ড, ইউএই ও উরুগুয়ে।

তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যারা দুর্বল ফল পেয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স (৬৯), যুক্তরাষ্ট্র (৬৭), রাশিয়া (৪২) ও চীন (৩২)। মাত্র ১২ স্কোর পেয়ে সর্বনিম্ন অবস্থানে সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদান। এদের পাশাপাশি অন্যান্য যারা তালিকার প্রায় সর্বনিম্নে, তারা হলো সিরিয়া, ইয়েমেন, ভেনেজুয়েলা, সুদান, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া, হাইতি ডিআর কঙ্গো ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশ, যারা অনেকেই হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত অথবা ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বরাবরের মতো ভুটানের স্কোর ৬৮ ও ওপর থেকে ২৪তম অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে ভালো ফল পেয়েছে। অন্যদিকে মালদ্বীপ গতবারের ২৪ স্কোরের তুলনায় ৪৩ স্কোর পেয়ে এবং ৫৫ ধাপ ওপরে ৭৫তম অবস্থান পেয়ে অভূতপূর্ব ভালো ফল করেছে। এর পেছনে সে দেশে সম্প্রতি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির অবদান রয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। বিশেষ করে বাক্‌স্বাধীনতা, ভিন্নমত ও সংগঠনের স্বাধীনতা এবং তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক বেশ কিছু আইনি সংস্কার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

২০০১-২০০৫ মেয়াদে সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকার গ্লানি কাটিয়ে বাংলাদেশ সম্প্রতি কিছুটা উন্নতি করলেও আমাদের স্কোর এখনো বিব্রতকরভাবে ২০–এর কোঠায়। তদুপরি ২০১৯–এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে নেমে দ্বাদশ অবস্থান পাওয়া অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। যে মেয়াদের (সেপ্টেম্বর ২০১৮-অক্টোবর ২০২০) তথ্যের ওপর নির্ভর করে এবারের সূচকটি প্রণীত, সেটি বাংলাদেশের জন্য হওয়ার কথা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার মেয়াদ। যেমনটি প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জোরালোভাবে ঘোষণা দিয়েছেন। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কোনো প্রকার দুর্নীতি সহ্য করা হবে না, এমন ঘোষণা বলিষ্ঠ কণ্ঠে দিয়েছিলেন।

বাস্তবে যা ঘটেছে তা হচ্ছে এ ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষ করে ২০২০ সালে মূলত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন এমন একশ্রেণির মানুষ করোনার মতো দুর্যোগকে সম্পদ বানানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা রূপান্তরিত হলো দুর্নীতির মহোৎসবে।

স্থানীয় পর্যায়ে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অসাধু কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অনেকেই লিপ্ত হয়েছেন বিব্রতকর অনিয়ম-দুর্নীতিতে। এমনকি হতদরিদ্রদের জন্য বিশেষ সহায়তা হিসেবে সরকার যে আর্থিক অনুদান দিয়েছে, সেই কার্যক্রমও বাদ পড়েনি তাদের লোভাতুর দুর্নীতির থাবা থেকে। উচ্চতর পর্যায়ে ক্রয় ও সরবরাহ খাতে দেখা গেল দুর্নীতির মহামারি, যাতে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী-ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত থেকেছেন বরাবরের মতোই সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাবান রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

বিজ্ঞাপন

একের পর এক দেখা গেল স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে যথাযথ প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের হতবুদ্ধিকর কেলেঙ্কারি। অর্থ পাচারসহ আর্থিক খাতে বিভিন্ন প্রকার জালিয়াতির ঘটনা ঘন ঘন শিরোনাম হয়েছে। এ কর্মকাণ্ডে বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী মহলের একাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছিলেন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ ও রাজনৈতিক নেতা। এঁদের কেউ কেউ অর্থ পাচারের পাশাপাশি মানব পাচারের অভিযোগেও তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা তথা দুর্নীতির ধারণা সূচকে বিব্রতকর ফলের পেছনে অন্যতম অবদান রয়েছে রাজনীতির সঙ্গে অর্থ, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির ক্রমবর্ধমান ওতপ্রোত সম্পর্ক, যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উপাদান তথা রাজনৈতিক চর্চাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

কাঠামোগত দুর্বলতার অপর ক্ষেত্রটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মৌলিক সব প্রতিষ্ঠানগুলোর বেদনাদায়ক অকার্যকর পরিস্থিতি। দলীয়করণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করা হয়েছে। যার ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার অঙ্গীকারের বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের ওপর প্রথাগতভাবে অর্পিত, তাদের মধ্যেই বিচরণ করে দুর্নীতির অনুঘটক, অংশগ্রহণকারী, সুবিধাভোগী ও সুরক্ষাকারী। এর ফলে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার প্রকট দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। এ খাতে ঋণখেলাপি থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব ধরনের জালিয়াতি ও লুটপাটের অভিযোগের কথা সর্বজনবিদিত। এ–ও জানা যে এ খাতে নীতি-সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা দেশের আইন নির্ধারণ করে দেয় না, নির্ধারণ করে দেন ঋণখেলাপি আর জালিয়াতিতে নিমজ্জিতদেরই একাংশ।

যাঁরা দুর্নীতি করেন বা যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বিশেষ করে রুই-কাতলার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত বিরল। বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁরা কার্যত বিচারহীনতা উপভোগ করেন মূলত রাজনৈতিক, আর্থিক বা প্রশাসনিক সম্পৃক্ততা বা ছত্রচ্ছায়ার কারণে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতিকে যেমন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তেমনি সূচকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অসম্ভব। অর্থ ও দুর্বৃত্তায়ন থেকে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। সরকারি কার্যক্রমে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাপ্রসূত স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেনামি মালিকানাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, রাজনৈতিক হোক বা প্রশাসনিক হোক, রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করার অবাধ চলমান চর্চা বন্ধ করতে হবে।

২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের শতাধিক দেশে প্রবর্তিত ব্যাংকিং খাতে সব লেনদেনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার এখনই সময়। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের পাশাপাশি এ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর ও শুল্ক ফাঁকি থেকে শুরু করে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা এবং পাচার অর্থ ফিরিয়ে আনা সহজতর হবে।

দুর্নীতির দায় থাকা সত্ত্বেও বিচারহীনতা উপভোগের যে সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পরিবর্তন করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে তার স্ব-আরোপিত সীমারেখা থেকে বের হতে হবে, যে সীমারেখার কারণে তার পক্ষে রুই-কাতলার দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

তথ্য প্রকাশ ও তথ্যপ্রবাহের প্রতি সহনশীলতার সংস্কৃতি একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে জন অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। সুশীল সমাজ, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম তথা সাধারণ নাগরিকেরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে কোনো ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারে, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের দায়িত্ব। সমালোচককে সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে না ভেবে যত বেশি শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তত বেশি দুর্নীতির ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ক্ষমতা বাড়বে।


ইফতেখারুজ্জামান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক

মন্তব্য করুন