আনা হলো সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াড
ভারতের ভেতর একটা বেশ বড়সড় দেশের মতোই উত্তর প্রদেশ। প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এ রাজ্যে। তুলনায় বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের চেয়েও বেশি। এখানকার নির্বাচন ভারতজুড়ে জাতীয় নির্বাচনের মতো উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। কিন্তু দেওবন্দ নগরের ভোটের হিস্যা নগণ্য। এমনকি দেওবন্দ যে জেলায়, সেই সাহানারপুরেও বিধানসভায় আসন মাত্র ৭টি। পুরো জেলায় মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুই বেশি। সংগতকারণে ৪০৩ আসনের নির্বাচনে দেওবন্দ বা সাহারানপুর সামান্যই প্রভাব রাখতে সক্ষম। কিন্তু ধর্মীয় বিবেচনায় দেওবন্দের গুরুত্ব রয়েছে ইউপিজুড়ে, এমনকি ইউপি ছাড়িয়ে পুরো ভারতে। সেই গুরুত্বকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি প্রশাসন কিছুদিন আগে ‘সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াড’-এর কেন্দ্র গড়েছে দারুল উলুম মাদ্রাসার কাছাকাছি জায়গায়। দুই হাজার বর্গমিটার জায়গায় গড়ে তোলা এই কেন্দ্রে এক শর মতো ‘কমান্ডো’ এবং ১৫ আইপিএস কর্মকর্তা মোতায়েন হয়েছে। এ নিয়ে অনেকে আপত্তি তুলে বলেছেন, যোগীর সরকার দারুল উলুম ও সন্ত্রাসকে সমার্থক দেখাতে চাইছে।

দেওবন্দ মাদ্রাসার ওয়েবসাইট বন্ধে নোটিশ
উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম এবং ভারত ভাগের সময় দেওবন্দের দারুল উলুম মাদ্রাসার অনেক আলেম পক্ষে-বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা রাখলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই মাদ্রাসা রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকেই বেশি মনোযোগী এই প্রতিষ্ঠান। এর খরচাপাতিও চলে জনসাধারণের অর্থে। তারপরও হামেশা রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনা হয় দেওবন্দের দারুল উলুমকে নানান তরফ থেকে। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই বিজেপি প্রশাসন প্রদেশের সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের কার্যালয় দেওবন্দে স্থাপনের মাধ্যমে দেশবাসীকে উদ্দেশ্যমূলক বোঝাতে চাইছে, এ জায়গার সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগ আছে। দেওবন্দকে ঘিরে সন্দেহের আবহ তৈরির চেষ্টা আছে আরও বহুভাবে। সম্প্রতি এই বিদ্যাপীঠের ওয়েবসাইট বন্ধ করতে ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘনে’ এর অভিযোগ তোলা হয়েছে!

যে কারণে ভীতি ছড়ানো
আর ২৪ ঘন্টা পর ইউপিতে সাত পর্যায়ের নির্বাচন শুরু হবে। এই নির্বাচনের প্রচার চলছে এক বছর ধরে। এর ফলের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো ভারত। বিশেষ করে সদ্য শেষ হওয়া কৃষক আন্দোলনের কী প্রভাব পড়ে, ইউপির কৃষিজীবী ভোটারদের আচরণে সেটা বুঝতে চাইছে অনেকে। যোগী আদিত্যনাথের শিবিরও কৃষকদের ক্ষুব্ধ চৈতন্য নিয়ে শঙ্কায় আছে। ফলে তারা পুরোনো অস্ত্রটি ব্যবহার করছে এবারও। সেটা হলো হিন্দু ভোটকে এক জায়গায় আনা।

default-image
দারুল উলুম মাদ্রাসাকে ঘিরে সন্ত্রাসের ইঙ্গিত একধরনের ট্র্যাজেডির মতোও বটে। কারণ, এই দেওবন্দিরা উপনিবেশবিরোধী ভারতীয় সংগ্রামে অন্যতম শক্তি ছিল। এমনকি এই প্রতিষ্ঠানের অনেক প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম লীগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বিরোধী ছিলেন। অথচ এখন তাঁদের ভারত রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।

সমস্ত হিন্দু ভোট জড়ো করার মোক্ষম উপায় হলো মুসলমানবিরোধী রাজনীতি সামনে আনা। যেহেতু বাবরি মসজিদ ইস্যু নেই, কাশ্মীরও শান্ত, তাই এখন ইস্যু হিসেবে আনা হয়েছে তালেবানদের কাবুল দখলকে। যোগী বলছেন, উত্তর প্রদেশকে তালেবানদের থেকে বাঁচাতেই দেওবন্দে সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াড (এটিএস) হচ্ছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অনেক তালেবান কর্মী-সংগঠক নামের শেষে দেওবন্দি শব্দ ব্যবহার করায় দারুল উলুম মাদ্রাসার বিরুদ্ধে যোগীর প্রচার গতি পেয়েছে।

বিজেপির নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলছে, উত্তর প্রদেশকে আফগান আদলের বর্বরতা থেকে বাঁচাতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার যেসব রাজনৈতিক সাহিত্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলো দেওবন্দি হিসেবে উল্লেখ আছে, সেগুলো বিজেপির প্রচার সেলগুলো ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করছে।

ভীতি ছড়ানোর এই রাজনীতি মূলত দেওবন্দকে রাজনীতিতে টেনে আনার লক্ষ্যে। বিজেপি জানে পুরো রাজ্যের ভোটে এর কমবেশি প্রভাব থাকবে। তাতে ভোটের রাজনীতিতে আড়ালে পড়ে যাবে রাজ্যের রুটি-রুজির জরুরি প্রশ্নগুলো। ৭০ ভাগ মুসলমান–অধ্যুষিত দেওবন্দে দারুল উলুম মাদ্রাসার কাছাকাছি জায়গায় সন্ত্রাসবিরোধী দপ্তর স্থাপনের মানে এই দাঁড়ায় যে আশপাশে সন্ত্রাসের প্রকোপ আছে। আরও সরাসরি ভাবলে, মুসলমানরাই সন্ত্রাস করে বা দেওবন্দ সন্ত্রাসী তৈরি করে; তারা রাষ্ট্রবিরোধী। যদিও বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে যারা ‘দেওবন্দি’ পরিচয় দেয়, তারা অধিকাংশ স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ে ওই পরিচয় দিচ্ছে।

দারুল উলুম মাদ্রাসাকে ঘিরে সন্ত্রাসের ইঙ্গিত একধরনের ট্র্যাজেডির মতোও বটে। কারণ, এই দেওবন্দিরা উপনিবেশবিরোধী ভারতীয় সংগ্রামে অন্যতম শক্তি ছিল। এমনকি এই প্রতিষ্ঠানের অনেক প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম লীগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বিরোধী ছিলেন। অথচ এখন তাঁদের ভারত রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।

যোগীর কৌশল কেন ‘সঠিক’
উত্তর প্রদেশ আকারে ও জনসংখ্যায় যেমন বৃহৎ, তেমনি দারিদ্র্যের ভারতীয় রাজ্যগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে। নির্বাচনে এখানে দারিদ্র্য বিমোচন, চাকরি, কৃষির সমস্যা আলোচনায় আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিজেপি শিবির সেসব বিতর্ক এড়াতে চাইছে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের নায়কোচিত ভূমিকা সামনে এনে।১৯৯০ থেকে ভারতজুড়ে ‘সন্ত্রাস’ ভালো রাজনৈতিক পণ্য। দেশজুড়ে এটিএস স্থাপনেরও ধুম পড়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সচরাচর ‘সন্ত্রাস’ এবং ‘নাগরিক অধিকার’ উভয়ের বিরুদ্ধেই কাজ করে। যোগী সরকার আরেক ধাপ এগিয়ে এটিএসকে কাজে লাগাচ্ছে ইসলামোফোবিয়ার জ্বালানি হিসেবেও।

ভারতে সচরাচর হিন্দু নামের কোনো সন্ত্রাসী ধরা পড়লে সে সন্ত্রাসী হিসেবেই প্রচার পায়; কিন্তু মুসলমান নামের কেউ ও রকম অপরাধ করে আটক হলে সেই সংবাদ আসে ‘পাকিস্তানি সন্ত্রাসী আটক’ হিসেবে। উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে এটিএসের উদ্বোধন এ রকম আরও প্রচার সামনে আনবে বলে মনে হচ্ছে। প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে এ রকম প্রচার বিজেপির জন্য বিশেষভাবে দরকার। এই পুরো অঞ্চলে ভোটের হিসাবে মুসলমানরা ২৫ ভাগ। রাজ্যের অন্যত্র যেটা ১৫ ভাগের মতো। পশ্চিমের জেলাগুলোতে মুসলমানদের ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখিয়ে বাকি ৭৫ ভাগকে ধর্মের ভিত্তিতে একত্রে রাখতে চাইছেন আদিত্যনাথ। এটা না করা গেলে ওই ৭৫ ভাগ নানান বর্ণ ও গোত্রে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দলকে ভোট দিলে বিজেপির সমস্যা। ২০১৭ সালের নির্বাচনের আগে এই সমস্যা ঠেকানো হয় দাঙ্গা লাগিয়ে। দেওবন্দে বিজেপির প্রার্থী ব্রিজেশ শিং রাওয়াত জেতেন তাতে।

‘দাঙ্গা’ এবং ধর্মের ভিত্তিতে ভোট ভাগ করা গেলে বিজেপির কী সুবিধা হয়, তার নজির ২০১৭ সালের দেওবন্দ। ১৫ বছরে বিজেপি প্রথম ওই আসন পায়। ওখানে বিজেপির বিজয় ওই নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদের বিশেষ উল্লাসের বিষয় ছিল। নির্বাচনে জিতেই ব্রিজেশ দাবি করেন, দেওবন্দের নাম পাল্টে রাখতে হবে ‘দেওবৃন্দ’ বা ‘দেববৃন্দ’। তবে এরই মধ্যে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দেওবন্দ ঘিরে থাকা সাহারানপুরের আসনটি নিয়ে নেয় বিজেপিবিরোধীরা। যোগীর দল তাই এবার নতুন আদলে পুরোনো কৌশলে ফিরছে। দারুল উলুম সে কারণেই হিন্দুত্ববাদের নতুন নিশানা।

আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন