ঠিক একইভাবে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইমরান খানের অপসারণ তাঁর দল পিটিআই (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ)-কে অগণতান্ত্রিক, আপত্তিকর এবং হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়ার দিকে পরিচালিত করেছে। পিটিআই যেসব প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাকে অবশ্যই ‘উগ্র-রক্ষণশীলতা’ বলা যায়।

পাকিস্তানের সহনশীল, শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমান্বয়ে নিন্দনীয় এবং বিশৃঙ্খল অস্থিরতায় পরিণত হচ্ছে। এটি সমগ্র রাজনৈতিক গোলার্ধকে ব্যক্তিগত শত্রুতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে; প্রতিশোধপরায়ণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্রটিকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।

পিটিআই-এর নেতৃত্বের, বিশেষ করে ইমরান খানের উসকানিমূলক বক্তব্য তাঁর দলের কর্মীদের বিদ্রোহমূলক আচরণ করতে উসকানি দিচ্ছে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সমানে ‘চোর’ এবং আসিফ আলী জারদারিকে ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ ইত্যাদি বলে যাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়। ইমরান পুরো পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট) জোটকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। পার্লামেন্টে ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবকে পিটিআই ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছিল। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি সেই অভিযোগ বাতিল করে বলেছে, এই ধরনের ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অনেক একাডেমিক এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধ্বংসাত্মক এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে। আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকি তৈরি করে।

পাকিস্তানের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে ইমরান খানকে অপসারণ করার জন্য জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোট পেশ করা হলে তাঁর দলের কর্মীরা অত্যন্ত অশালীন আচরণ শুরু করেন। ইসলামাবাদে সিন্ধুর প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বাসভবন সিন্ধু হাউসে হামলা চালানো হয়। সিন্ধু হাউসের প্রধান ফটক পিটিআই কর্মীরা ভেঙে ফেলেন। তাঁরা ভিন্নমতাবলম্বী সদস্যদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেন।

পেশোয়ারে জাতীয় পরিষদে পিটিআই-এর প্রতিপক্ষ দলের সদস্য নূর আলম খানের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন পিটিআই-এর সদস্যরা। পুলিশ সময়মতো আসায় হামলাকারীদের হাত থেকে পরিবারটি বেঁচে গেছে।

রাজনীতিতে এটা দুঃখজনক। পিটিআই নেতৃত্ব যদি এই ধরনের ঘৃণামূলক এবং উসকানিমূলক ভাষা অব্যাহত রাখে, বিরোধীদের ষড়যন্ত্রকারী ও সরকারকে ‘আমদানি করা সরকার’ বলে এবং বিরোধী সদস্যদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে তা পারস্পরিক রাজনৈতিক হিংসার সৃষ্টি করবে।

অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, পার্লামেন্ট সদস্যদের বাড়িতে হামলা করা, তাঁদের হুমকিমূলক টেক্সট পাঠানো কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কাজ নয়। এ কারণে পিটিআই নেতৃত্বকে, বিশেষ করে ইমরান খানকে তাঁর বক্তৃতায় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তাঁর বিচার বিবেচনাহীন উসকানিমূলক বক্তব্য গোটা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নষ্ট করতে পারে।

সাধারণত, নেতাদের উসকানিমূলক বক্তৃতা চরমপন্থাকে বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনীতিতে সহিংসতাকে অনেকাংশে তীব্র করে তোলে। এসব বক্তৃতা নেতা-কর্মীদের প্রভাবিত করে।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি স্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করার সময় আক্রমণাত্মক ভাষার প্রয়োগ এখানে প্রাথমিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই পরিস্থিতিতে ইমরান খানের সাধারণ নির্বাচনের দাবি স্পষ্টতই ভুল। পাকিস্তানে নির্বাচনী সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিবেশ এমনিতেই চারদিকে থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে অকাল নির্বাচন হলে তা বিপর্যয়কর এবং রক্তাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

দুর্ভাগ্যবশত, পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা সম্ভবত বিশ্বাস করেন, তাঁদের বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের মন্তব্য উবে যায়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বিরোধী পক্ষের বা কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেতাদের স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা অনুগামীদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় প্রবল প্রভাব ফেলে এবং নেতারা যদি অবিবেচনাপ্রসূত বক্তৃতা দেন তাহলে তা তাঁদের অনুগামীদের সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।

এ ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া উভয়ই রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোকে চিত্রিত করে। বেশি দর্শক টানা এবং রেটিং এর জন্য অনেক মিডিয়া হিংসাত্মক বক্তৃতা এবং ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেয়। এটি অনৈতিক এবং ভয়ংকর। গণমাধ্যমের সজাগ ভূমিকা ও পেশাদারি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা এবং শত্রুতা এড়াতে বক্তৃতার সম্ভাব্য প্রভাবগুলো আন্দাজ করা এবং মেপে দেখা সর্বোত্তম উপায়। যেহেতু ইমরান খানের দিকে এখন অনেকেই উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন, সেহেতু এ ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব অনেক বেশি।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
রহিম নাসের ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন