বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগকারীদের ওপর নতুনভাবে চালু মুনাফার হারের প্রভাব কী হতে পারে, এটা বহুল আলোচিত। এ দেশে বিনিয়োগের বিশ্বাসযোগ্য তেমন কোনো ক্ষেত্র নেই। এমএলএম কোম্পানি বা এ ধরনের বিভিন্ন নামে অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে কত লোককে পথে বসতে দেখলাম নিকট অতীতে। শেয়ারবাজারের রমরমা অবস্থার হাতছানিতে অনেকে ঢুকে পড়েছিল। এমনকি ভেঙে ফেলেছিল সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানত। তাঁদের একটি অংশ ফতুর হয়ে গেছেন। কারও আত্মহত্যা বা পাগল হয়ে যাওয়ার কথাও শুনেছি। তাই নিরাপদ বিনিয়োগের স্থান হিসেবে সরকারের সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নেন বিনিয়োগকারীরা। এঁদের বিরাটসংখ্যক অবসরজীবী, বিধবা, গৃহবধূ কিংবা এ ধরনের কেউ। এই সঞ্চিত টাকার মুনাফা থেকেই চলে তাঁদের নিত্যদিনের খাওয়া–পরা, চিকিৎসা, কারও সন্তানের লেখাপড়া। এমনিতেই পণ্য ও সেবার মূল্য ক্রম ঊর্ধ্বমুখী। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোকে এ ব্যবস্থা নিয়ে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা সংঘবদ্ধ কোনো জনগোষ্ঠী নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করার কোনো ক্ষমতা নেই তাঁদের। সুতরাং বরাবর দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রে আমানতকারীদের মুনাফা কমানো বা এতে করের হার বাড়ানোর দিকে প্রবল ঝোঁক থাকে কর্তৃপক্ষের। সফলও হয়। এ বিষয় নিয়ে আগে সংসদে কিছুটা বাদানুবাদ চললেও ইদানীং সে বালাই উঠে গেছে।

সরকারকে তার আয়–ব্যয় নিয়ে সাবধানী হতে হয়, এ বিষয়ে ভিন্নমত নেই। তবে কোথায় ব্যয় কমানো হবে বা আয় বাড়ানো হবে—এ নিয়ে বিতর্ক থাকে সব সময়ই। তবে বরাবর লক্ষ করা গেছে, দুর্বল শ্রেণিকেই বেছে নেওয়া হয় আয় বৃদ্ধি কিংবা ব্যয় কমানোর ক্ষেত্র হিসেবে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা সংঘবদ্ধ কোনো জনগোষ্ঠী নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করার কোনো ক্ষমতা নেই তাঁদের। সুতরাং বরাবর দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রে আমানতকারীদের মুনাফা কমানো বা এতে করের হার বাড়ানোর দিকে প্রবল ঝোঁক থাকে কর্তৃপক্ষের। সফলও হয়। এ বিষয় নিয়ে আগে সংসদে কিছুটা বাদানুবাদ চললেও ইদানীং সে বালাই উঠে গেছে।

সাংসদেরা বর্তমানে সাধারণত ধনিক শ্রেণিভুক্ত অথবা তাঁদের দ্বারা সমর্থনপুষ্ট। এ কয়টি টাকা বিনিয়োগকারীদের লাভ–ক্ষতি হয়, তা বোঝার ক্ষমতা তাঁদের নেই। এমনকি নেই প্রয়োজন। জনগণের কাছে তাঁদের ভোটের জন্য যেতে হয় না ২০০৮ সালের পর থেকে। সুতরাং নেই কোনো দায়ভারও। অথচ সমাজের বিত্তশালী অংশের জন্য উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির নামে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রণোদনা ও রেয়াত।

সরকারি তথ্যেই জানা গেছে, কোভিড চলাকালে কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ঠিক তেমনি বেড়েছে দারিদ্র্যের হার। সরকারি কর্মচারীদের যাঁরা ছোট চাকরি করতেন, অবসর নিয়েছেন ২০০৯ সালের জুলাইয়ের আগে, হলফ করে বলা যায়, তাঁরা আজ পেনশনের টাকার হিসাবেও দরিদ্রশ্রেণিতে চলে গেছেন। সে পেনশন সঞ্চয়পত্রও মুনাফা হ্রাসের উদ্যোগ থেকে রেহাই পেল না। আমরা প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে গর্ব করি। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা নিয়েও গর্ব আছে আমাদের। এগুলো একদম অমূলক, এমনটা বলা যাবে না। তবে এ বিষয়ে ড. আকবর আলি খান অতিসম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমাদের দারিদ্র্যের সংজ্ঞাটি ১৯৭১ সালের পরিস্থিতিতে করা। নতুনভাবে করা হলে সেটা অনেক বেশি হবে। বিষয়টির আলোচনা প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে সঞ্চয়পত্রনির্ভর মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকে ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এটা দেখাতে। এখনো লাখ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ আদায়ের তেমন প্রচেষ্টা নজরে আসে না। বরং বারবার খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করে তাঁদের নতুন নতুন সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে দেওয়া হচ্ছে করদাতার টাকা।

সঞ্চয়পত্রনির্ভর মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকে ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এটা দেখাতে। এখনো লাখ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ আদায়ের তেমন প্রচেষ্টা নজরে আসে না। বরং বারবার খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করে তাঁদের নতুন নতুন সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে দেওয়া হচ্ছে করদাতার টাকা।

সঞ্চয়পত্রে এ ধরনের মুনাফা দেওয়া একটি ভর্তুকি। এ ভর্তুকিকে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের অংশ হিসেবে কি বিবেচনা করা যায় না? নিশ্চয়ই যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের কথা বাদ দিলাম। বাকি সঞ্চয়পত্রের জন্য এমনটা অবশ্যই বিবেচনা করা চলে। আরও উল্লেখ করতে হয়, সরকারব্যবস্থায় এর চেয়ে অধিক হারে আমানতে মুনাফা দেওয়ার নজির চলমান রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে মুনাফা দেওয়া হয় শতকরা ১৩ টাকা। তাঁরা বেতনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডে রাখতে পারেন। এখানে সুদ ব্যয়ের হিসাবটা ননফান্ডেড বলা হলেও অবসর গ্রহণকালে কড়ায় গন্ডায় পরিশোধ করে দিতে হয় চক্রবৃদ্ধি হারে। এর জন্য তাঁদের দিতে হয় না কোনো আয়কর। সেটা চলুক। দরকার হলে আরও বাড়ানো হোক। সে বিবেচনায় চলমান মুনাফা দিয়ে চলতে থাকুক সরকারি সঞ্চয়পত্রগুলো। এগুলো থেকে আয়করও নেওয়া হয়। এমনটা চলতে থাকলে রাজকোষে টান পড়ার কোনো ঝুঁকি তেমন নেই। অবশ্য আমাদের দেশে আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ঘরানার কিছু অর্থনীতিবিদ বরাবরই এ ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিরুদ্ধে। এ সংস্থা দুটি কৃষিতে ভর্তুকির বিরুদ্ধেও অনমনীয় অবস্থানে ছিল। ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে শেখ হাসিনা সেসব আপত্তিকে কোনো আমলে না নিয়ে কৃষিতে উদারভাবে চালু করেন ভর্তুকি। এর সুফল দেশ আজ ভোগ করছে। হতে পারে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তেমন কোনো উৎপাদনশীল খাত নয়। তবে এ আয়টাও বাজারেই যায় এবং যুক্ত হয় অর্থনীতিতে।

সঞ্চয়পত্রের জন্য সরকারের সুদ ব্যয় বৃদ্ধি ভাবনার ব্যাপার নয়, এমনটা বলব না। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিদু্যৎ থেকে শুরু করে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বহু টাকা ভর্তুকি দেয়। নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয় রপ্তানিকারকদের। এমনকি রেমিট্যান্স প্রেরকদেরও। আর সেটা দেওয়া হয় ভাবনাচিন্তা করেই। অর্থনীতির স্বার্থ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঠিক তেমনি সঞ্চয়পত্রে নতুন স্থিরিকৃত মুনাফার হারেও রয়ে যাবে ভর্তুকি। এটা কমিয়ে খুব বেশি টাকা বাঁচানো যাবে না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হাজার হাজার আমানতকারী।

এ কথা ঠিক, সরকারের অগ্রাধিকারে আছে ধনিক শ্রেণি। শিল্প–বাণিজ্যের প্রসারে এঁদের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। তবে ভোক্তা ও করদাতা জনগণ দেশের অর্থনীতির মৌল ভিত্তি। সঞ্চয়পত্রের মুনাফানির্ভর জনগণও করদাতা। তাঁরা নিম্ন¤ বা মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও ভোক্তা। তাঁদের চাওয়া–পাওয়ার দিকে সরকারের নজর আরও জোরদার হওয়া দরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র বাদে অন্য সঞ্চয়পত্রগুলোর মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখুন।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন