default-image

বহু লোকই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের আমলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ট্রাম্প নিজেও ওভাল অফিসে জ্যাকসনের একটা প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে ছিলেন। যদিও ট্রাম্পকে কোনোভাবেই জ্যাকসনের মতো সামরিক নায়ক বলা যাবে না, তবে যে যুগে তাঁরা প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আশ্চর্য মিল। আমাদের কালের মতো জ্যাকসন যুগও ছিল অভিজাতবিরোধী আর চরম গণতন্ত্রায়ণের কাল।

জ্যাকসনীয়রা জোর দিয়ে বলত, যে কেউ (এ দ্বারা তারা অবশ্য পূর্ণবয়স্ক যেকোনো শ্বেত পুরুষকেই বোঝাত) যেকোনো রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। শিক্ষা, সামাজিক পদমর্যাদা বা মান্যিগণ্যিতা কোনো ব্যাপার না। এহেন সাম্যতার দাবি ১৮২০ আর ১৮৩০-এর হার্ভার্ড ও ইয়েল শিক্ষিত অভিজাতদের ত্রস্ত করে তুলেছিল, যেমনটা আজও তাঁরা হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

আমরাও এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে কমজোরি সনাতনী কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এক ডেমোক্র্যাট জরিপ বিশ্লেষকের মূল্যায়ন হলো, ট্রাম্প সমর্থকেরা ‘সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাস করে না। অভিজাতদের বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস করে না। পণ্ডিতদের বিশ্বাস করে না। বিশেষজ্ঞদেরও তারা বিশ্বাস করে না।’ গৃহযুদ্ধ-পূর্ব আমেরিকাতে জ্যাকসন সমর্থকেরাও কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে একই রকম সন্দিহান ও অবিশ্বাসী ছিল।

জ্যাকসনীয়রা আমজনতাকেই সব কর্তৃত্বের চরম উৎস বিবেচনা করত, তবে সামাজিক মাধ্যম সাধারণ মানুষকে এখন যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেটা তারা শুধু স্বপ্নেই ভাবতে পারত। ১৮৩০-এর দশকের সস্তা পত্রিকার সঙ্গে টুইটার, ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের কোনো তুলনাই চলে না, সবাইকে এগুলো জনপ্রিয় মত গঠনে ভূমিকা রাখার ক্ষমতা দিয়েছে।

তারপরও জ্যাকসনীয় যুগ থেকে এমন কিছু শিক্ষা আমরা নিতে পারি, আমাদের সময়কে যা বুঝতে সাহায্য করবে। ইতিহাসবিদ জর্জ ব্যানক্রফটের পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তি দুর্বল আর অন্ধ কিন্তু গণ শক্তিশালী ও প্রাজ্ঞ। অভিজাত মতামতের ওপর গণ মতের ধ্বজাধারীদের এই আক্রমণে কর্তৃপক্ষ এবং পরিণতিতে সত্য নিজেই ছত্রখান হয়ে পড়ল। সবাই যখন বলতে থাকেন চিকিৎসা, শিল্পকলা এবং সরকার বিষয়ে তাঁদের ধারণা তথাকথিত ‘রসবেত্তা’ ও কলেজ–শিক্ষিত ‘ভাবুক’দের ধারণার মতোই সিদ্ধ, তখন সত্য ও জ্ঞান হয়ে ওঠে ফেরারি ও অধরা। আম আমেরিকানরা নিজেরাই যখন সত্য নির্ণয়ে সক্ষম হয়ে ওঠে, তখন ‘নিজেদের সংকীর্ণ পর্যবেক্ষণে’র বাইরের সবকিছুর প্রতিই তারা অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এ কারণে ফেরিঅলা, ঠগ, চালিয়াতের সহজ শিকারে পরিণত হয় তারা। এডগার অ্যালেন পো তাঁর সময়কে ‘ধাপ্পাবাজির যুগ’ নামে অভিহিত করেছেন। এই বর্ণনা ভুয়া সংবাদ আর বিকল্প তথ্যের আমাদের এই সময়কেও প্রতিফলিত করে।

পত্রিকায় ধাপ্পা আর জালিয়াতি—তাদের কয়েকটি আবার রীতিমতো বিশদ ও বিশ্বাসযোগ্য—সৃষ্টি করে বড় আনন্দ পেতেন পো। একইভাবে নিজের বিচারক্ষমতার ওপর জনগণের যে আস্থা, তাকে পর্যন্ত পুঁজি করতেন পি টি বারনাম। তাঁর জাদুঘরের মেয়েটি সত্যিই মৎস্যকুমারী কি না, পত্রিকার বিজ্ঞাপনে এই প্রশ্ন তুলে পাঠকদের প্রস্তাব করতেন, তারা নিজেরাই বরং এসে ব্যাপারটা যাচাই করে দেখুক।

আজকের অভিজাত ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের মতো উনিশ শতকের কলেজ-শিক্ষিত এবং সনাতনী মনের ভদ্রলোকেরা সত্যের এই গণতন্ত্রায়ণের বিরুদ্ধে নিষ্ফল প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু জ্যাকসনীয় আমেরিকার অধিকাংশ সাধারণ লোকই একদা তাদের কর্তা ছিল, এমন কারও জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির কাছে নিজেদেরটাকে তুলে দিতে ইচ্ছুক ছিল না।

অভিজাত প্রতিবেশীর মতো শিক্ষা, ভ্রমণ বা আদবকেতা হয়তো সাধারণ লোকের নেই, কিন্তু চোখকান তো তাদের আছে, ফলে যেকোনো ‘নির্দেশদাতা প্রতিভাবান’ ও ‘প্রাজ্ঞ ঋষি’র চেয়ে নিজেদের সত্য তাঁরা ভালো জানেন। তাহলে এই ভদ্রলোকের যা বলে, তা কেন তাঁরা বিশ্বাস করবেন?

বিজ্ঞাপন

যেমনটা আবার আমরা আবিষ্কার করছি, গণতন্ত্র আর বিশেষজ্ঞজ্ঞান সব সময় একসঙ্গে যায় না। এখনো জ্ঞান ও সত্যের গণতন্ত্রায়ণ অনেক সাধারণ মার্কিনের মধ্যে জন্ম দিতে পারে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস প্রবণতার এক অদ্ভুত মিশ্রণের। সবকিছুই যেখানে বিশ্বাসযোগ্য, সবকিছুই সেখানে সন্দেহযোগ্য। আর সব বিশেষজ্ঞ জ্ঞানই যেখানে সন্দেহভাজন হয়ে ওঠে; সেখানে নিজে দেখেনি, শোনেনি, স্বাদ নেয়নি, গন্ধ পায়নি, এমন সবকিছুকেই লোকে অবিশ্বাস করবে।

সমস্যা হচ্ছে লোকে নিজেকে যখন সর্বজ্ঞ ভাবা শুরু করে, তখন প্রত্যক্ষগোচর কিন্তু বুঝতে পারছে না, এমন সব বিষয় খুব সহজেই তাদের অভিভূত করে। কোনো সাধু বা অজ্ঞাত কোনো ইন্টারনেট ব্যক্তিত্বের বলা অল্প কিছু অদ্ভুত কথা তাদের কাছে দারুণ বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।

জ্যাকসনের আমেরিকায় এই ছিল জনপ্রিয় সংস্কৃতি, দূরবর্তী সেই গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সঙ্গে আমাদেরটার কী ভীতিকর মিল।

ইংরেজি থেকে অনুদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ২০২১

গর্ডন এস. উড ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন